প্রান্তিক মানুষের কুকুর জীবনঃ পাতাল লোকের সমাজতত্ত্ব

আলোকচিত্র কৃতজ্ঞতা স্কুপহুপ

টোপি সিং

ম্যারি লিংডোহ

কবীর এম.

বিশাল ত্যাগী

পাতাল লোকের শুরুতে চারজন দানব দেখা যায়।

শুরুতে মনে হয়, এই চার দানবের এক অশুভ উদ্দেশ্য ছিলো, সেটা হলো দেবতাতুল্য এক সাংবাদিককে খুন করা।

তারপর আস্তে আস্তে দানবদের পরিচয় জানা যায়।

টোপি সিং নিচুজাত হওয়ায় জাতিভেদ প্রথার শিকার, উঁচুজাতদের আহত করায়, যার মাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিলো।

ম্যারি লিংডোহ ট্রান্সজেন্ডার, এশিয়ান ধাঁচের চেহারার জন্য রেসিজমের শিকার হয়েছে, আর ছোট থাকতে শিকার হয়েছে চাইল্ড এবিউজের।

কবীর এম. মুসলমান, যার ভাই গোরক্ষকদের মব লিঞ্চিংয়ের শিকার হয়েছিলো, যে খুন হয়ে গেছে জঙ্গিবাদের মিথ্যা অপবাদে।

এই তিনজনের প্রত্যেকে নৃবিজ্ঞানের ভাষায় Otherizationএর শিকার।

এদের মধ্যে একমাত্র বিশাল ত্যাগীই হয়তো মেইনস্ট্রিম। কিন্তু তার বোনেরাও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়, শোধ নিতে গিয়ে, সে এক রহস্যময় নেতার খপ্পরে পড়ে যায়। এই নেতাই মাস্টারজি।

বিশাল ত্যাগী মাস্টারজির পোষা কুকুরে পরিণত হয়। নিজেও কুকুর ভালোবাসে। তার মতো কুকুর ভালোবাসে আরো একজন মানুষ।

দেবতাতুল্য সেই সাংবাদিক সঞ্জীব মেহরার স্ত্রী ডলি। ডলির কারণেই শেষ পর্যন্ত সঞ্জীব বেঁচে যায়। বা সাবিত্রির কারণে।

সাবিত্রি হচ্ছে ডলির অতি আদরের পোষা কুকুর।

ডলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যঃ

১। হাইপারসেনসিটিভ, এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারে না।

২। নিউ এজ স্পিরিচুয়ালিস্ট, ঈশ্বরে বিশ্বাস করা ঐতিহ্যিক রক্ষণশীল ধার্মিক নয়, ল্যাভিশ লাইফ লিড করার পাশাপাশি পজিটিভ এনার্জি নেগেটিভ এনার্জি জাতীয় জিনিশপাতিতে বিশ্বাস করে।

৩। অবধারিতভাবেই, ‘এনিমেল লভর’। তবে সেই ‘এনিমেল’ অবশ্যই পোষা কিউট কুকুর। স্ট্রে ডগদের ব্যাপারে ডলির দৃষ্টিভঙ্গি ক্লিয়ার না।

পাতাল লোকের শেষ দৃশ্যেও একটা কুকুর দেখি। স্ট্রে ডগ, একেবারেই। সাবিত্রির মতো আদর যাদের কপালে জোটে না।

বিশাল ত্যাগী কি এই কুকুরটার মতো না?

বা কবীর এম.?

বা ম্যারি লিংডোহ?

বা টোপি সিং?

ধর্ম বর্ণ সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের নিরিখে যারা প্রবল নয়, যারা প্রান্তিক, তাদের জীবন কি স্ট্রে ডগের জীবন না?

ডলির ‘এনিমেল লভ’ সাবিত্রিকে সুন্দর পরিবেশে বাচ্চা বিয়োনোর ব্যবস্থা করে দিতে সক্ষম, সক্ষম সঞ্জীব মেহরার জীবন বাঁচাতেও।

কিন্তু সেটা বিশাল-টোপি-ম্যারি-কবীরদের ঠিক কি কাজে আসে?

আবার হাতিরাম চৌধুরীর সাবঅর্ডিনেট ইমরান আনসারীও মুসলমান। কিন্তু কবীর এম.-এর মতো শ্রমজীবী পরিবারের নয়। স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের।

তাই সময় সময় সে কিছু বর্ণবাদী আচরণের শিকার হলেও, কবীর এম.-এর মতো জঙ্গি অপবাদে খুন হয় না। সিভিল সার্ভেন্ট হয়। শ্রেণিগত সুবিধাজনক অবস্থান সংখ্যালঘু পরিচয়ের কারণে তৈরি হওয়া প্রান্তিক অবস্থানকে কিছুটা হলেও মূলধারার নিকটবর্তী হতে সহায়তা করে।

পাতাল লোকে বাজপেয়ী নামের এক নেতাকে দেখি। যে নিজেকে নিচুজাতের মেসিয়াহ হিসেবে হাজির করে। অথচ সে নিজের সাথে গোপনে গঙ্গাজল রাখে, এবং প্রতিবার কোনো দলিত গৃহ থেকে ফেরার পর, গঙ্গাজল দিয়ে স্নান করে নিজেকে শুদ্ধ করে নেয়।

সারাহ ম্যাথিউজ আর অমিতোষ ত্রিপাঠীর মতো দুজন সত্যিকার লিবারাল আর সাহসী সাংবাদিককেও দেখা যায়। যারা সঞ্জীব মেহরার মতো ভণ্ড লিবারাল নয়। এরা গৌরী লঙ্কেশদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

শেষ পর্যন্ত পাতাল লোকের দানবেরা পাতালেই থাকে। কবীর এম. খুন হয়, বিশাল সুইসাইড করে। বাকিরা বিচারের অপেক্ষা।

সঞ্জীব মেহরার সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় না। তার লিবারাল ডিএনএ মিউটেটেড হয়ে গেছে। নতুন ভূমিকায়ও মানানসই সে।

হাতিরাম চৌধুরী দেবতাও নয়, আবার দানবও নয়। সে মাঝখানের মানুষ। সে তার ছেলেকে দেবতা বানানোর স্বপ্ন দেখে।

ভারতবর্ষে সমাজবিকাশ ইওরোপের চেয়ে অনেক ভিন্নভাবে হয়েছে। তাই এখানে রিলায়েন্স আর রামজন্মভূমি সহাবস্থান করে। পরস্পরকে প্রবলতর করে। সেইসাথে প্রান্তিক করতে থাকে কোটি কোটি মানুষ। সেই প্রান্তিক মানুষের জীবন আসলে কুকুরের জীবন। তাদের কেউ বিশালের মতো পোষা কুকুর হয়। অন্যরা হয় স্ট্রে ডগ, মাঝখানের মানুষদের করুণা সম্বল করে বেঁচে থাকে, পাতাল লোকের শেষ দৃশ্যটার কুকুরটির মতো।

আগস্ট ৬ ২০২০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *