বাঁচিতে সে জানে

আলোকচিত্র প্রবর রিপন

শিউলির মতো মেয়ের প্রেমে না পড়াটাই কঠিন। খুব মায়াকাড়া চেহারার মেয়ে থাকে না কিছু, দেখতে আদর লাগে, শিউলি আহমেদ ছিলো ঠিক তেমন একটা মেয়ে। সেক্সি টাইপের সুন্দর না, কিউট টাইপের সুন্দর।

ও ক্লাসে ঢুকলেই সব ছেলে নড়েচড়ে বসতো। যেনো সে মাস্টারনি, এসেছে রোল কল করতে। একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেই ঝাড়ি খেতে হবে। অথচ শিউলি ওদের শিক্ষক না, সহপাঠী ছিলো। পড়াশোনায় ছিলো গড়পরতা। চিত্রাঙ্কণে ঝোঁক ছিলো। আর অন্যমনস্ক হওয়ায়।

সে অনেক লোকের ভিড়ে হঠাৎ হারিয়ে যেতো। স্বভাবে ছিলো জীবনানন্দীয়। এখন মেয়েমানুষের অ্যাবসেন্ট মাইন্ডনেস কি সহ্য হয়? হয় না তো! প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে সাড়া না পাওয়ার যন্ত্রণায় জর্জরিত ছেলেরা তাই আড়ালে দাঁতমুখ খিঁচে বলতো, শালী ভাব নেয়। শিউলির চেয়ে অনেক কম প্রেমের প্রস্তাব পাওয়ার ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে মরা মেয়েরা মুখ বাঁকিয়ে বলতো, ঢং করে হারামজাদি। শুধু একজন ওর ব্যাপারে কিছু বলতো না।

আয়াত অবশ্য কারো ব্যাপারেই কিছু বলতো না। সামিউল আলম আয়াত। সে ছিলো ক্লাসের সবচে মুখচোরা প্রকৃতির ছেলে।

কলেজের দু’বছর সে এতো কম কথা বলেছে যে ওকে একটু কম চেনা ছেলেমেয়েদের ধারণা ছিলো, সে বোবা। আয়াত মেয়েদের দিকে তাকাতে পর্যন্ত লজ্জা পেতো। কখনো কথা বলা একান্তই অপরিহার্য হয়ে উঠলে সে মেয়েটার দিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলতো, যেনো এই অপরিহার্যতার লজ্জায় ওর মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।

শিউলি তার অন্যমনস্কতা আর আয়াত তার লজ্জা নিয়ে, এবং পরস্পরের প্রতি তিলপরিমাণ আগ্রহ না দেখিয়ে, কলেজের পাঠ চুকিয়ে ভার্সিটি জীবনে এসে নিজেদেরকে আবারও সহপাঠী হিসেবে আবিষ্কার করলো।

এবার অপরিচিতের মহাসমুদ্রে। তাই অন্যমনস্কতা আর লজ্জা পেরিয়ে কথা হলো। তখন তরুণদের অভিধানে নতুন একটা শব্দ ঢুকেছে, সেটা হচ্ছে ডিজুস, প্রেমের অর্থ দাঁড়িয়েছে রাত জেগে কথা বলা।

বলতে বলতেই আয়াতের গোপন প্রতিভা আবিষ্কৃত হলো, শিউলি আহমেদের কাছে, মেয়েটার শিল্পী মন এই আবিষ্কারে উচ্ছ্বসিত হলো। কবিতা লেখে ছেলেটা। তবে তাকে ঠিক কবিযশোপ্রার্থী বলা যায় না। সে কোনো পত্রিকায় লেখা ছাপাতে দেয় না। ব্লগেও লেখে না। একসময় অভ্রের কারণে ফেসবুকে বাংলা লেখা যাবে। তখনো সে তার কবিপরিচয় গোপনই রাখবে, শুধু শিউলির জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই পরিচয়।

প্রেমে পড়লে মানুষের সঙ্গীত পিপাসা বেড়ে যায়। তাই মহীনের ঘোড়াগুলি থেকে মৌসুমী ভৌমিক ওদের দিনরাত্রির একটা অংশ দখল করে নিলো। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেলে শিউলি গুনগুন করতে দেখলো নিজেকে, তবুও কিছুই যেনো ভালো যে লাগে না কেনো…। দুপুরে হঠাৎ বৃষ্টি নামতে দেখে নিজমনে গাইতে লাগলো আয়াত, অলি গলি ঘুরে ক্লান্ত শুধু তোমায় পাচ্ছি না…। এই সময় ছায়াছবি দেখার ঝোঁকও বাড়লো ওদের। মিডনাইটস চিলড্রেন দেখে ওদের বুক ব্যথা করলো, লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরায় ওরা নিজেদেরকেই খুঁজে পেলো। সেমিনার লাইব্রেরি থেকে রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, টিএসসি থেকে পলাশী, আর বটতলা থেকে বকুলতলা সর্বত্র একসাথে দেখা গেলো ওদেরকে।

তৃতীয় বর্ষে এসে চাপ বেড়ে গেলো পড়াশোনার। ততোদিনে শিউলি পড়াশোনায় বেশ সিরিয়াস হয়ে উঠেছে। আয়াত অবশ্য সারাজীবনই পড়াশোনার ব্যাপারে সিরিয়াস ছিলো।

দুজনেই ঠিক করলো উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে চলে যাবে।

মাস্টার্স করতে শিউলি ফিনল্যান্ডে গেলো, আয়াত জার্মানিতে। শুরু হলো ঝামেলা। দূরত্ব মানুষের মধ্যে নানাবিধ সংকট তৈরি করে। কথায় আছে না, চোখের আড়াল মনের আড়াল? ওদের ক্ষেত্রেও তাই হলো, ব্রেকআপ হয়ে গেলো। দোষটা কার ছিলো? কারোই না, পরিণতি প্রেমটার কপালে ছিলো না।

ওরা ঠিক করলো, ব্রেকআপ হওয়া সত্ত্বেও, নিজেদের মধ্যকার মানবিক সম্পর্কটা নষ্ট করবে না। গালিগালাজ, পারস্পরিক দোষারোপ, এসব চর্চা করবে না। মানুষ হিসেবে একজন আরেকজনকে শ্রদ্ধা করে যাবে, যোগাযোগ না থাকুক, কেউ কাউকে ছোটো করার চেষ্টা করবে না।

বহুবছর পর ততোদিনে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিউল আলম আয়াত ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে ততোদিনে একটা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর শিউলি আহমেদের বিয়ের ছবি দেখতে পেলো। শিউলি অনেক আগেই তাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছিলো, সেও শিউলির কথা প্রায় ভুলতে বসেছিলো, শিউলির সাথে মিউচুয়াল কেউ শিউলির ছবিতে লাইক দেয়ায় ওর হোম ফীডে চলে এসেছে এলবামটা। ততোদিনে শিউলির রূপ আরো বেড়েছে, কৈশোরের কোমলতাকে প্রতিস্থাপিত করেছে যৌবনের মাদকতা, ওকে দেখে শলোমনের পরমগীতের দয়িতার কথা মনে পড়ে গেলো আয়াতের। অনেকদিন হলো আয়াত কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে। মাঝেমধ্যে দেশকাল নিয়ে ভাবগম্ভীর প্রবন্ধ লেখে পত্রিকায়। সে জানে না, শিউলির শিল্পীসত্ত্বাও মরে গেছে। মাইক্রো ফিন্যান্সের ভারে ডুবে গেছে মার্ক শাগাল।

সেদিন রাতে আয়াতের খুব মন খারাপ হলো। বেসিনের কল ছেড়ে, যাতে কান্নার শব্দ তিথি শুনতে না পায়, সে তার আহত হৃদয়ের অর্গল খুলে দিলো। কান্না করা শেষ হলে ওয়াশরুমের মেঝেতে পিঠ ঠেকিয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে নিঃশব্দে সান্ত্বনা দিতে থাকলো। তিথি দারুণ মেয়ে, ঢাকার খুব পশ একটা বেসরকারি স্কুলে পড়ায়, সংসার আর চাকরি দুটোই শক্ত হাতে সামলায়। মুসিজে নামে একটা তার্কিশ সিনামা দেখেছিলো আয়াত, ওখানে একটা সংলাপ ছিলো, আমি আমার বৌয়ের প্রেমে পড়ে গেছি। ওর ক্ষেত্রে এগজেক্টলি সেটাই হয়েছে, পরিবারের পছন্দে বিয়ে করলেও, বিয়ের মাত্র ছয়মাসের মধ্যে সে তিথিকে ভালোবেসে ফেলেছে। বর হিসেবেও আয়াত যথেষ্ট কনসিডারিং আর কেয়ারিং, বৌকে ট্রাস্ট করে, গড়পরতা বাঙালি ব্যাটাছেলেদের মতো সার্ভেইলেন্সের স্বভাব নাই।

তারপরও সেই রাতে একটা অদ্ভূত ঘটনা ঘটলো। তিথিকে তখন সে বিদ্ধ করে চলেছে, জড়িয়ে ধরে উন্মত্তভাবে চুমু খেতে খেতে, বীর্যস্খলনের বেশি দেরী নেই, চোখ বুজে আছে তিথি, চলে গেছে একসট্যাসির পর্যায়ে, এমন সময়, আয়াতের মনে হলো সে শিউলিকে বিদ্ধ করছে। শিউলির শরীর যাদুক্রমে তিথির শরীর হয়ে গেছে, তিথির মাধ্যমে সে আসলে শিউলিকেই ভালোবাসছে, ভাবনাটা অস্বস্তিতে ফেললো তাকে।

পরদিন ক্লাসে কয়েকবার মনোসংযোগ বিঘ্নিত হলো আয়াতের।

এতে ওর শিক্ষার্থীরা খুব অবাক হয়ে গেলো। এমনটা তো হয় না আয়াত স্যারের সাথে! গ্রীষ্ম বর্ষা সব ঋতুতেই আয়াত খুব সিরিয়াস। পাঠদানে অখণ্ড মনোযোগ। সে পড়ায়ও ভালো, কমিউনিকেট করতে পারে সবচে দুর্বল শিক্ষার্থীটির সাথে, স্রেফ কথিত মেধাবীদের নিয়ে মেতে থাকে না। অল্প সময়েই শিক্ষার্থীমহলে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্য শিক্ষকরা ওকে খানিকটা ঈর্ষার চোখেই দেখে।

বাসায় ফিরে তিথির দিকে তাকাতে লজ্জা লাগছিলো। যেনো কৈশোরের সেই লজ্জাটা আবার ফিরে এসেছে। আয়াতের মনে হচ্ছিলো সে একটা বাজে লোক। এতোদিন সে নিজেকে ডিভোটেড হাজবেন্ড মনে করতো। যে দেহে ও মনে বৌয়ের প্রতি সমর্পিত। অথচ কালকে রাতে সেই সমর্পণটা ভেঙে গেছে। শিউলিকে পেতে ওর খুব লোভ হচ্ছে, আর ব্যাপারটা শুধুই শরীরী নয়, পুরনো প্রেম যেনো ওর হৃদয়ের গোপনতম গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে।

তিনদিন পর শিউলি আহমেদ একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে ক্ষনিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। আয়াত, সেই আয়াত! কলেজের সবচে মুখচোরা ছেলে, ওর ভার্সিটি জীবনের প্রেমিক, একদিন যাকে না পেলে মরে যাবে ভাবতো আসলেই কি তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে? শিউলি তার বর জামান সাহেবকে খুবই ভালোবাসে। আয়াতের কথা ভুলে গেছিলো সে অনেক আগেই। কর্ম জীবনের সূত্রেই সে আনিসুজ্জামানের প্রেমে পড়েছিলো। শিউলির ধারণা ছিলো সে সুখী হতে যাচ্ছে, এমন সময় অনাহুত অতিথির মতো আসলো আয়াত, টোকা দিলো মনদরজায়।

মেসেঞ্জারে শিউলি শুধু লিখতে পারলোঃ কেমন আছো?

এক সপ্তাহ পর। কলেজের অন্যমনস্ক মেয়েটি আর লাজুক ছেলেটি গ্লোরিয়া জিনসে কফি সামনে নিয়ে বসে আছে। নির্বাক।

কী নিয়ে কথা বলবে বুঝে পাচ্ছে না।

একটা কিছু বলো, আয়াত, বলো একটা কিছু! তোমার ডাকেই তো ছুটে এসেছে এই মেয়েটা!! স্মৃতির চাপে শিউলির বুক ভেঙে আসছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর, তুমি কিছু না বললে কীভাবে হবে!!!

শিউলির খুব ইচ্ছা করছিলো সীন ক্রিয়েট করতে। চিৎকার করে আয়াতকে বলতে এখনো তাকে ভালোবাসে। বয়স বাড়েনি ওদের।

কিন্তু বয়স তো আর থেমে থাকে নি, এই বয়সে সীন ক্রিয়েট করাটা খারাপ দেখায়, শিউলি সেটা বোঝে। তাই সে খুব মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলো আয়াতকে, তুমি তোমার লাইফ নিয়ে হ্যাপি তো? আয়াত কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, শিউলির সাথে আবার দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত তার কাছে এই প্রশ্নের সুনিশ্চিত উত্তর ছিলো, কিন্তু এখন সে আর কোনো ব্যাপারেই নিশ্চিত নয়। শেষ পর্যন্ত সে কোনো জবাব দিলো না। পাল্টা প্রশ্ন করলো। তুমি কি হ্যাপি? শিউলি আয়াতের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো…

শিউলি আয়াতকে ভালোবাসতো। আয়াত শিউলিকে ভালোবাসতো। আয়াত তিথিকে ভালোবাসে। শিউলি জামানকে ভালোবাসে। শিউলি আয়াতকে ভালোবাসে। আয়াত শিউলিকে ভালোবাসে। একটা ভালোবাসা আরেকটা ভালোবাসাকে খারিজ করে না। ভালোবাসা আর যাই হোক, জিরো-সাম গেম না। ভালোবাসা হলো সূর্যের নিচে হাসতে থাকা নুড়িপাথর। লাকাঁ। পশুরাও ভালোবাসায় বাঁচে। ভালোবাসায় বাঁচে গাছেরাও। ভালোবাসা জিনিশটা বাতাসের মতো, পানির মতো, প্রবহমান। বাইবেলে বলা আছে, সবকিছুর মধ্যে ভালোবাসাটাই শ্রেষ্ঠ। ১ করিন্থীয়গণ ১৩:১৩। মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে। নরকেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *