উপন্যাস প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান সুমনের সাথে চিঠিচালাচালি

০২.০৩.২০২০

সুহৃদ,

এবছর বই মেলায় আপনার প্রথম উপন্যাস ‘এক অসাধারণ অন্ধ সময়ের স্মৃতি’ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশ নয়, ভারত থেকে। ফেসবুকে দেখেছিলাম, যদি ১৫০ জন পাঠক বইটির প্রি অর্ডার করেন, তাহলে সেটি বাংলাদেশ থেকেও প্রকাশিত হবে। আমি প্রি অর্ডার করেছিলাম। পরে টাকা ফেরত পেয়েছি। এবছর বইমেলাতে ৮২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। কিন্তু আপনার বই কেনার মতো ১৫০ জন পাঠক পাওয়া যায়নি, এই ঘটনা আমাকে খুব হতাশ ও বিব্রত করেছে। কারণ এই ফেসবুকে পরিচয়ের পর থেকে যত দিন গেছে, আপনাকে পাঠের আগ্রহ আমার বেড়ে চলেছে।

আপনার উপন্যাসটিও পড়া হলো। গতানুগতিক কাঠামোর বাইরে এটিকে কি আমি নিরীক্ষাধর্মী লেখা বলতে পারি? আপনার উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র শহিদ এর বসবাস, খাওয়া দাওয়া, ঘুম সবই ইতিহাসের পাতায়। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, ফ্যাসিজম ও গণহত্যার ইতিহাস। গত শতকের ঘটে যাওয়া প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ গণহত্যার ইতিহাসের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ায় আপনার চরিত্র। সে হিসেবে গণহত্যাকেই এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বলা চলে। কিন্তু ঘটনাগুলো উপন্যাসে এতো সরাসরি এসেছে যে, কোন পাঠক যদি গ্রন্থটিকে গত শতকের গণহত্যার সালতামামি হিসেবে চিহ্নিত করতে চান, তবে তাকে বোধহয় খুব একটা দোষ দেয়া যায় না।

সুহৃদ, আপনার গ্রন্থ পড়েই বুঝেছি- এই পৃথিবীতে প্রায় সকল জাতিতে, সকল ভাষায়, সকল মতবাদে মানুষ মানুষের উপরে আরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। নৃশংসভাবে চড়াও হয়েছে। হত্যা করেছে। এ নৃশংসতা মানুষেরই স্বভাব জাত। আপনার কাছে প্রশ্ন, যেখানে স্থান কাল ভেদে একটির সাথে আরেকটি ঘটনা এতোটাই সাদৃশ্যপূর্ণ, সেখানে এতো এতো মৃত্যুর ভেতরে আপনার পাঠককে ঠেলে দিয়ে কি লাভ হলো?

শহিদ আর আমি প্রায় সমবয়সী। শহিদ যে বয়সে যে ঘটনা পাড়ি দিয়েছে, আমিও সেই টাইমলাইন ধরে এগিয়েছি। শহিদের পড়া অনেক বইই আমার পড়া। রাজনীতি ও যুদ্ধের যে চলচ্চিত্রগুলো শহিদের মনে দাগ কেটেছে তার প্রায় সবগুলোই আমার পছন্দের তালিকায় আছে। আমিও দীক্ষাপ্রশিক্ষণকেন্দ্র ১এর শিক্ষার্থী ছিলাম। কিন্তু কোথাও গিয়ে শহিদ আর আমার ভেতর একটা বড় পাথর্ক্য রয়েছে। আমি ইতিহাসে বাস করি না এবং কন্টিনিউয়াসলি সেখানে কেউ বাস করতে পারে, এটাও আমার কাছে অসম্ভব মনে হয়।

যেমন আপনি বসনিয়ার গণহত্যার কথা বলেছেন। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা আমি ভুলতে পারি না। সার্বিয় সেনাবাহিনী কয়েকজন বসনিয়ান বেসামরিক পুরুষ ও শিশুদের হত্যার উদ্দেশ্যে বধ্যভূমির দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সেই দলে থাকা এক যুবকের জুতোর ভেতরে খুব তীক্ষ্ণ আর ধারালো একটা পাথর ঢুকে পড়েছিল। একটু পরেই মৃত্যুর শিকার হবে যে মানুষ, তার কাছে ঐ মুহূর্তের পায়ের বেদনা, তাঁর হাঁটতে না পারাটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। এর সামনে পেছনে যেন আর কিছু নেই।

এই ঘটনা আমাকে বলে যে, মানুষ সর্বক্ষণ ইতিহাসের পাতায় বসবাস করে না। যদি কেউ করে, তাকে বা আপনার উপন্যাসের শহিদকে কি আমরা মানসিকভাবে সুস্থ বলতে পারি? যে শুধু ধ্বংসের তত্ত্বতালাশ করে গেছে। সে কি কখনও ভালোবাসেনি? তার কোন যৌন চেতনা নেই? কোন আনন্দ, কোন আলো তাঁকে কখনো স্পর্শ করে নি? সে কি কবীর সুমনের গান শোনেনি? যদিও আপনার চরিত্রটি শেষমেষ দাবী করে যে, সে মানসিকভাবে সুস্থ। কিন্তু তার সুস্থ থাকার উপকরণগুলো ঠিক কি, স্বাভাবিকভাবেই তা আমার জানতে ইচ্ছা করে।

আপনার উপন্যাসে ২০১৩ এর শাহবাগ আন্দোলন ও তার পরবর্তী ঘটনাসহ বর্তমান সময়ের অনেক উল্লেখযোগ্য বিষয় স্থান পেয়েছে। এই ঘটনাগুলো এসেছে কখনও উদ্বৃতি, কখনও পেপারের হেডলাইন, কখনও কারো ফেসবুক স্ট্যাটাস হিসেবে। এর সব কিছুই আপনার চরিত্রকে গভীর ভাবে আলোড়িত করে। যেমন এনফোর্সড ডিজএপিয়ারেন্স, ক্রস ফায়ার প্রভৃতি। র‍্যাব কর্তৃক চট্টগ্রামের একরামুল হত্যাকাণ্ডের ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপটি শহিদের মতো আমিও শুনেছি এবং আলোড়িত হয়েছি। তবে তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে।

সেই রাতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী একরামুলকে যখন হত্যার উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়, তাদের দলে দক্ষ হত্যাকারীরা ছিল। অডিও শুনে আমরা বুঝতে পারি, কিভাবে একটি হত্যাকান্ডকে বন্দুক যুদ্ধ হিসেবে সাজানো হয়। মটর সাইকেলটা কিভাবে পড়ে থাকবে, কোথায় কোথায় কতগুলো গুলির খোসা ছড়ানো থাকবে তা খুব সতর্কতার সাথে ঠিক করে নেয়া হয়। কিন্তু আমাকে কৌতুহলী করে তোলে একটা ভিন্ন কণ্ঠ। হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১.৩০ মিনিট আগে সেই দলে থাকা একজন এক্সিকিউশনার নিশ্চিত হতে চাইছিলেন যে, লোকটা প্রকৃতই দোষী কি’না। তিনি বার দুই তিন প্রশ্নটি করেন। এই লোকটি আসলে কে? আমাদের রাষ্ট্রপ্রকল্পে যে হত্যাকারী তৈরি হয়, সেখানে তিনি একেবারেই শিক্ষানবীস? যিনি অনেকগুলো পেশাদারদের সাথে থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরে মানুষ হত্যার যুক্তি খুঁজে গেছেন? তাঁকে নিয়ে কেউ কখনও লিখবে এই বাংলাদেশে? আমার জানা নেই।

হতে পারে যে, আপনার উপন্যাসটির সঠিক পাঠক আমি নই। আমি বরং এনফোর্সড ডিজএপিয়ারেন্স এর শিকার হওয়া সুমনকে নিয়ে শহিদের লেখা একটি অনন্য সুন্দর গল্পপাঠের জন্য আপনার উপন্যাসটি আবার পড়বো। তবে সব মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে যে, এই লেখাটি আপনার আরো সময় পাওয়ার দাবী রাখে। আপনার অস্থিরতা সে পেয়েছে, কিন্তু আপনার আদরও তার প্রাপ্য। আর যখন আমাদের কাছে শত শত অভিজ্ঞতা ও তথ্য রয়েছে, তখন সেগুলোকে আমরা আমাদের সৃষ্টিতে কিভাবে ব্যবহার করব, তার চমৎকার উদাহরণ আপনার অনুবাদ করা কবিতাগুলোর ভেতরেই রয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, গণহত্যার ইতিহাস হচ্ছে অস্বীকারের ইতিহাস। এই প্রেক্ষিতে মিলান কুন্দেরা বলেছিলেন, ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই হল, আদতে ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই।’ বাংলাদেশের ফ্যাসিজমকে ধরতে আপনার চরিত্রটি সেই ভারবাহী লড়াইটি সম্পূর্ণ একা, দম বন্ধ করে লড়ে গেছে। সে একদিন লড়াইটা শেষ করতে পারবে, আমি এমন প্রত্যাশাই রাখি। ভালো থাকবেন।

বিনীত,
মেহেদী হাসান সুমন

০৩.০৩.২০২০

সুমন ভাই,

আপনার পাঠপ্রতিক্রিয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। ৮২ কোটি টাকা মূল্যের বই বিক্রি হওয়ার মেলায় আমার বইটা যাতে প্রকাশিত হতে পারে তার জন্য প্রি-অর্ডার দিতে মাত্র ১৫০ জন পাঠকও পাওয়া যায় নি, এটা আমার জন্য একটা গভীর দুঃখের কারণ ছিলো। আপনি বিষয়টা খেয়াল করেছেন, ভেবে স্বস্তি লাগছে।

হ্যাঁ, উপন্যাসটা নিরীক্ষাধর্মী। তবে নিরীক্ষা বেশি হয়ে গেছে বুঝতে পারি। এটা আদৌ উপন্যাস হয়েছে কিনা পাঠকের মনে সেই প্রশ্ন আসতে পারে, এই ঝুঁকি নিয়েই আমি কাজটা করেছি।

“যদি কেউ করে, তাকে বা আপনার উপন্যাসের শহিদকে কি আমরা মানসিকভাবে সুস্থ বলতে পারি? যে শুধু ধ্বংসের তত্ত্বতালাশ করে গেছে। সে কি কখনও ভালোবাসেনি? তার কোন যৌন চেতনা নেই? কোন আনন্দ, কোন আলো তাঁকে কখনো স্পর্শ করে নি? সে কি কবীর সুমনের গান শোনেনি? যদিও আপনার চরিত্রটি শেষমেষ দাবী করে যে, সে মানসিকভাবে সুস্থ।”

আপনার পাঠপ্রতিক্রিয়ার এই অংশটি আমাকে অভিভূত করেছে, কারণ আমি চাচ্ছিলাম, কেউ না কেউ আমাকে এই প্রশ্নটি করুক।

আপনি কি এই ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন যে, শহিদ হাসানের যৌন জীবন নিয়ে আমার উপন্যাসে একটা অক্ষরও নেই?

তামান্না ইসলামের সাথে তার প্রেম না থাকুক, একটা সম্পর্ক তো ছিলো, এবং সেটা বেশ লম্বা সময় জুড়েই।

সে কি কখনো তামান্নার সাথে শোয় নাই? চুমু খায় নাই? তার ভেতরে কি ইচ্ছাটুকুও জাগ্রত হয় নাই?

শহিদ হাসান লোকটা কি পর্নোগ্রাফি দেখে? বলিউড সিনেমার আইটেম সং? যৌনতার সাথে সামান্যতম সম্পর্ক আছে এমন কিছু?

মেয়েমানুষের বুক, কোমর, আর নিতম্ব দেখে তার মধ্যে কি যৌন উত্তেজনা তৈরি হয় না? মাস্টারবেট করে না বা বেশ্যাগৃহে যায় না? তাহলে তার যৌন কামনা কীভাবে মেটায়?

এসবের প্রশ্নের উত্তর উপন্যাসে পাওয়া যায় না। অথচ আকুতি রয়েছে কিন্তু শহিদ হাসানের মধ্যে, নইলে তামান্না তার জীবন থেকে হঠাৎ করে হারিয়ে গেলে, সে এতোটা ভেঙে পড়তো না।

শহিদ হাসান অপ্রকৃতিস্থ এটা আপনি ঠিকই ধরেছেন। তাই সে শুধু ধবংসের তত্ত্বতালাশ করে গেছে। ভালোবাসতে ভয় পেয়েছে, ভয় পেয়েছে আলো দেখে, পরিণত হয়েছে এক ধরণের অন্ধকারের প্রাণীতে।

নিজেকে সুস্থ দাবি করেছে একেবারে শেষদিকে এসে, কিন্তু এটা মিথ্যাচার মাত্র। মানুষ মিথ্যা কথা বলে তো অনেক। নিজের সাথে, অন্যের সাথে।

একটা জায়গায় আমি দ্বিমত পোষণ করতে চাই।

আপনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের ফ্যাসিজমকে ধরতে আপনার চরিত্রটি সেই ভারবাহী লড়াইটি সম্পূর্ণ একা, দম বন্ধ করে লড়ে গেছে”।

না। লড়ে যায় নাই। শহিদ হাসান এই কবন্ধকালের সাক্ষী ছিলো স্রেফ। হয়তো শিকারও ছিলো। কিন্তু সে আসলেই কোনো লড়াই করে নাই! ইতিহাসের পাতায় আর কিলিং ফিল্ডসগুলোতে পালিয়ে বেরিয়েছে, না হয় পালিয়ে বেরিয়েছে নেটফ্লিক্সের সিরিজগুলোতে। শহিদ হাসান অপ্রকৃতিস্থ বটেই, কিন্তু যাদেরকে পুরোপুরি প্রকৃতিস্থ মনে হয় আপাতদৃষ্টিতে, তাদের অনেকেও কি পালিয়ে বেড়াচ্ছে না?

আমি উপন্যাসের শেষদিকে এসে একটা লাইন লিখেছি,

“সবার ভেতরেই হয়তো একটা শহিদ হাসান আছে, যার নিজেকে নির্বাসিত মনে হয়, যার কোনো জায়গা নেই যাওয়ার।”

শহিদ হাসান কি আদৌ কোনো রক্তমাংসের মানুষ? নাকি সে একটা প্রতীক, বিচ্ছিন্ন মানুষদের প্রতীক? যারা সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে শেষ পর্যন্ত নিজের সত্ত্বা থেকে পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে গেছে?

আপনি আপনার পাঠপ্রতিক্রিয়ার একেবারে শেষে এসে লিখেছেন,

“সে একদিন লড়াইটা শেষ করতে পারবে, আমি এমন প্রত্যাশাই রাখি।”

বিচ্ছিন্ন অপ্রকৃতিস্থ মানুষ লড়াই করতে পারে না। তারা শুধু পারফর্ম করে। শহিদ হাসানের কাছে নিজেকে সুস্থ মনে হয়েছে শেষ পর্যন্ত, কারণ শেষ পর্যন্ত সে একজন পারফর্মারে পরিণত হয়েছে।

আমার উপন্যাসের কথক অবশ্য রীতিমতো ক্ষমা চেয়েছেন, উপন্যাসের পাঠকদের কাছে, শেষ অধ্যায়ে এসেঃ

“আপনাকে শহিদ হাসানের গল্পটা বলার কথা ছিলো। সেটা বলতে গিয়ে একটা সময়ের গল্প বললাম। আমাকে ক্ষমা করবেন।”

আপনি আপনার মূল্যবান পাঠপ্রতিক্রিয়ার এক জায়গায় লিখেছেন,

“হতে পারে যে, আপনার উপন্যাসটির সঠিক পাঠক আমি নই।”

উপন্যাসের সঠিক বা বেঠিক পাঠক হয় না। শুধু পাঠক হয়। আপনি নিঃসন্দেহে আমার উপন্যাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ পাঠক, কারণ আপনি যে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে ও যত্নের সাথে আমার উপন্যাসটি পাঠ করেছেন, তা আপনার সংক্ষিপ্ত-কিন্তু-সংহত পাঠপ্রতিক্রিয়ায় পরিষ্কারভাবে বোঝা গেছে।

আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া গেলো না। অবশ্য সব প্রশ্নের সেভাবে উত্তর হয়ও না। আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি, আপনাকে, আপনিও ভালো থাকবেন।

বিনীত,
ইরফানুর রহমান রাফিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *