অর্ণব সান্যালের চশমা

জয়শ্রী সান্যালের ছেলে, ইতিহাসে স্নাতকোত্তর, ছাত্রজীবনে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট, বর্তমানে পেশাদার সাংবাদিক অর্ণব সান্যালের কি গল্পকার হওয়ার কথা ছিলো? হয়তো ছিলো, হয়তো ছিলো না, কে জানে! কথা যাই থাকুক, এই একত্রিশ বছর বয়সী যুবক গল্পকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন শহর ঢাকায়; অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০এ বেরিয়ে গেছে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ শুধুই কোম্পানির প্রচারের জন্য।

শিল্পী মানবের করা নেশাধরানো প্রচ্ছদের মায়া কাটিয়ে এবং নন্দিত অনুবাদক জাভেদ হুসেনের লেখা ভূমিকা পড়ে বা না পড়ে মূল গ্রন্থে প্রবেশ করলে মোট দশটি গল্প পাওয়া যাবে। গল্পগুলো গ্রাম ও শহর উভয় প্রেক্ষিতেই লেখা, দুই পরিসরেই স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করেছেন গল্পকার। আমাদের চিরচেনা মানুষদেরকেই দেখা মিলবে এই গল্পগুলোতে।

ক্ষমতা সম্পর্ক কীভাবে ছড়িয়ে আছে জালের মতো, ‘কতিপয় শুয়োরের বাচ্চা’ গল্পটা তা নিয়েই। ‘স্বগতোক্তির’ বিষয়বস্তুও তাই। আধুনিক নগরজীবন মানুষের বহির্জাগতিক চাহিদা অনেকটাই মিটিয়েছে, কিন্তু শূন্য করে তুলেছে তাঁর অন্তর্জগত, সেই শূন্যতা অনুভব করা যায় এই গল্প দুটিতে।

‘গাড়ি’ গল্পটা ভাগ্যের কাছে পরাজিত হওয়ার গল্প, মানুষের জীবন যে কোনো রূপকথার গল্প নয়, তার নির্মম বয়ান। ‘বন্ধক’ গল্পটা উত্তরউপনিবেশে আর সব সম্পর্কের মতো মা-ছেলের সম্পর্কটাও যে লেনদেনের সম্পর্কে পরিণত হয়েছে, তার নির্লিপ্ত বর্ণনা। আধুনিকতার অন্ধকার দিকটি এসেছে এই দুটি গল্পে।

‘সালেহা ও দুলাল’ গল্পটিতে নরনারীর দাম্পত্য জীবনকে তীব্রভাবে বিদ্রুপ করেছেন অর্ণব, কাছাকাছি বিষয়ের হলেও, ‘গ্রিন টি উইদ হাসনাহেনাকে’ সেই তুলনায় নিষ্প্রভ মনে হয়েছে। দ্বিতীয় গল্পটা এই বইয়ে না থাকলেও পারতো। অপরাপর গল্পগুলোর তুলনায় এটাকে দুর্বল মনে হয়েছে।

একই কথা বলা যায় ‘পেঁয়াজের ঝাঁজ’ আর ‘কসাই’ গল্প দুটির ক্ষেত্রেও, বিষয়বস্তুতে যেগুলোকে প্রায় কাছাকাছিই মনে হয়। ‘কসাই’ গল্পটাই সম্ভবত এই বইয়ের সেরা গল্প। শহুরে মধ্যবিত্তের নীচতা এই গল্পে যতো স্বার্থকভাবে রূপায়িত হয়েছে, ‘পেঁয়াজের ঝাঁজ’-এ ততোটা হয়নি।

‘শুধুই কোম্পানির প্রচারের জন্য’ গল্পটায় গল্পকার স্রেফ গলাবাজির জোরে মানহীন পণ্য গছিয়ে দেয়ার দ্বিতীয় শ্রেণীর বাণিজ্যবুদ্ধিকে শাণিত শ্লেষের মাধ্যমে আক্রমণ করেছেন। কর্পোরেটদের সাথে ক্যানভাসারদের ফারাক এটুকুই, যে প্রথমোক্তদের সামাজিক সম্মান বেশি, আর্থিকভাবেও অগ্রসর তারা। ব্যবসাবাণিজ্য খারাপ কিছু নয়, কিন্তু মুনাফাসর্বস্ব মানসিকতা মান নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ করে, গল্পকারের ক্ষোভ এই মানসিকতাটার বিরুদ্ধে।

শ্রমজীবী মানুষের সহমর্মী হলেও তাঁদেরকে রোম্যান্টিসাইজ করার ভালগার মার্ক্সিস্ট প্রবণতা গল্পকারের মধ্যে নেই। ‘জিহবা’ এর প্রমাণ। শাহাদুজ্জামানকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একবার মজা করে বলেছিলেন, শ্রমজীবী মানুষেরা সব মহান হলে বিপ্লবের তো কোনো প্রয়োজনই পড়তো না, অর্ণবের এই গল্পটা পড়ে সেই কথাটা মনে পড়ে যায়।

শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অর্ণব হিসেবী, বোঝা যায়। গল্প বলতে বলতে প্রগলভ হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে, অর্ণবের ক্ষেত্রে সেটি হয় নি। তাতে কখনো কখনো অবশ্য অতৃপ্তি রয়ে গেছে, মনে হয়েছে আরেকটু মন খুলে বলতে পারতেন, যা-কিছু বলার ছিলো।

গল্প লিখতে গিয়ে অর্ণব কোথাও উচ্চকণ্ঠ হন না, শ্লোগানধর্মী ভাষা ব্যবহার করেন না, শীতল এক নির্লিপ্তি নিয়ে লিখে যান যা-কিছু লেখার।

এই নির্লিপ্ততার কারণেই তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসগুলোর জন্য স্মরিত হলেও তিনি কিছু দুর্দান্ত গল্প লিখে গেছেন। অর্ণবের গল্পগুলো সেই গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয়। যদিও মানিক মার্কসবাদী, অর্ণবের ঝোঁকটা নৈরাজ্যবাদের দিকে।

চশমা ছাড়া দুই হাত দূরেও অস্পষ্ট দেখেন গল্পকার। খোদা তাঁর চশমাটাকে সহি সালামতে রাখুন। ভাবাদর্শ যা লুকিয়ে রাখে, আমাদেরকে তা দেখাতে, অই চশমাটার প্রয়োজন হবে অর্ণব সান্যালের।

শুধুই কোম্পানির প্রচারের জন্য
অর্ণব সান্যাল, দ্যু প্রকাশন, ১৫০ টাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *