“আপনার উপন্যাসের বিষয়বস্তু কী?” এই প্রশ্নের জবাবে

ফেসবুকে যারা আমার বন্ধুতালিকায় আছেন, বা আমাকে ফলো করেন, আমার পার্সোনাল আইডিতে বা পেজে, তাদের অনেকেই, ইতোমধ্যে জেনে গেছেন যে, আমি একটা উপন্যাস লিখেছি, আমার প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসের নাম এক অসাধারণ অন্ধ সময়ের স্মৃতি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে উপন্যাসটি প্রকাশ করছে কাউন্টার এরা, বাংলাদেশে প্রকাশে আগ্রহ দেখিয়েছে গ্রন্থিক প্রকাশন, দুইদেশেই জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা হয়।

অনেকেই আমার কাছে উপন্যাসের বিষয়বস্তু জানতে চেয়েছেন। সেটা অস্বাভাবিক নয়, প্রতি বছর ফিকশন জনরাঁর বহু বই বেরোয়, তাই পাঠক কেনো আমার বইটা কিনবেন সেটা জানার অধিকার তার আছে। এই লেখাটা আমার দিক থেকে জানাবার প্রচেষ্টা।

মাইক্রো লেভেলে আমার উপন্যাসটি একজন ব্যক্তির গল্প। ব্যক্তিমানুষের জীবনে অনেক সময়ই বিপর্যয় ঘটে যায়, সে হারিয়ে ফেলে প্রিয় কোনো কিছু। আমি এই লসের ধারণা দ্বারা পরিচালিত হয়েছি। আমি দেখাতে চেয়েছি, এই লসের পেছনে যেসব কারণ ক্রিয়াশীল থাকে, তা আপাতদৃষ্টিতে খুব সামান্য মনে হতে পারে। আমরা ‘আধুনিকরা’ প্রকৃতির ওপর মানুষের বিজয় নিশান ওড়ানোর গল্প পড়ে বড়ো হয়েছি, সেটাকেই সভ্যতা বলে মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমার এই উপন্যাসে আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি, প্রকৃতি দূরে থাক, এমনকি নিজের জীবনের ওপরও মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। মানুষ ভয়ংকর রকমের ভালনারেবল একটা প্রাণী, ফ্র্যাজাইল একটা প্রাণী, উপন্যাসটিতে সেই ভালনারেবলিটি আর ফ্র্যাজাইলিটি ব্যক্তিমানুষকে আশ্রয় করেছে।

ম্যাক্রো লেভেলে আমার উপন্যাসটি একটা সময়ের গল্প। বিশশতক থেকে শুরু করে একুশশতকের প্রথম দুইদশক। এই সময়ে দুনিয়ায় মেলা কিছু ঘটে গেছে। ফ্যাসিজম আর স্টেট সোশ্যালিজমের পতন ঘটে গেছে, লিবারেলিজম ধুঁকতে ধুঁকতে কোনোরকমে বেঁচে আছে, তার আয়ুও ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ে একদিকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার ওপর মানুষ আস্থা রাখতে পারেনি, অন্যদিকে নানাপ্রকার আদর্শবাদ মানুষকে কানাগলিতে নিয়ে গেছে। মানুষ সবসময়ই জীবনের অর্থ খুঁজেছে, কিন্তু ‘আধুনিক’ মানুষের কোনো পারপাজ অফ লাইফ নাই, এই না থাকাটা তার জন্য পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের প্রতিটা পরিসরে একটা ভয়ানক আস্তিত্বিক সংকট তৈরি করেছে। আমার উপন্যাসটিতে দেখা যাবে এই সংকটটা বৈশ্বিক।

এই পর্যায়ে এসে, অনেকের মনে স্বাভাবিকভাবেই আরেকটা প্রশ্ন আসতে পারে, উপন্যাসটি কি আত্মজৈবনিক। এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছেঃ হ্যাঁ এবং না। আমার জীবনের অনেক প্রসঙ্গই এখানে চলে এসেছে, সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এটা একটা উপন্যাস, আমি আত্মজীবনী লিখিনি। তাই আমার জীবনে ঘটেনি, তবে আমার পরিচিত-স্বল্পপরিচিত-অপরিচিত মানুষদের জীবনে ঘটেছে বা ঘটা সম্ভব, এমন অনেককিছুই উপন্যাসটিতে আছে। পাঠকদের কেউ তার জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার সাথে মিল খুঁজে পেতে পারেন। সে-ক্ষেত্রে বিষয়টা কাকতালীয় বলে ধরে নিতে হবে, যেহেতু পৃথিবীতে কাক আর তাল দুটোই সহজলভ্য, এমনটা ঘটতেই পারে।

গদ্য আর কবিতার মধ্যে, বা ‘মৌলিক’ রচনা আর অনুবাদের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল আছে, অনেকেই এমনটা ভেবে থাকেন। আমি সেই অদৃশ্য দেয়ালগুলো ভাঙার চেষ্টা করেছি। আমার উপন্যাসে গদ্য যেমন আছে, আছে কবিতাও, ‘মৌলিক’ অংশের সাথে আছে অনুবাদের অংশ। এটা একটা খুবই বিপজ্জনক ধরণের নিরীক্ষা ছিলো। পণ্ডিতেরা হয়তো আমার সাহিত্যপ্রচেষ্টাটি বাতিল করে দেবেন, ‘কিছুই হয়নি’ বলে হাসবেন অবজ্ঞার হাসি। তা করতেই পারেন। কিন্তু আমি পণ্ডিতদের জন্য উপন্যাসটি লিখিনি, লিখেছি আমার মতোই অতিসাধারণদের জন্য, আশা রাখি তাদের কাছে গৃহীত হবো।

এই উপন্যাস প্রকাশে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আমার বন্ধু সৌম্যরীত চৌধুরী এবং বাংলাদেশে অনুজ সৈকত আমীন বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। উপন্যাসটির জন্য চমৎকার একটি প্রচ্ছদ এঁকেছেন তৃত। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

ইরফানুর রহমান রাফিন
১৫ জানুয়ারি ২০২০
হাজারিবাগ, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *