আসন্ন মার্কিন-ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা কেনো করা উচিত?

২০১৬য় ইউএস প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু রাষ্ট্রেই যুদ্ধবিরোধী মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিলো, ট্রাম্প যেহেতু হিলারী ক্লিনটনের মতো ‘যুদ্ধবাজ’ নন, তাই তার পররাষ্ট্র নীতি অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ হবে। এঁদের অনেকেই ট্রাম্পের বর্ণবাদী, উগ্র জাতীয়তাবাদী, নারীবিদ্বেষী, অভিবাসীবিদ্বেষী, মুসলিমবিদ্বেষী চিন্তাচেতনার বিরোধী হলেও অন্তত এই একটা প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থনীয় মনে করতেন।

মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে দুই কোরিয়ার মধ্যে যে ঐতিহাসিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ট্রাম্পের ভূমিকা তার এই শান্তিকামী ভাবমূর্তিকেই শক্তিশালী করেছিলো।

এই ভাবমূর্তিতে প্রথম ফাটল ধরে জেরুসালেম ইস্যুতে। ঐতিহাসিক কারণে জুদাইজম, ক্রিশ্চিয়ানিটি, ও ইসলাম এই তিন ইব্রাহিমী একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারীদের চোখেই জেরুসালেম একটি পবিত্র শহর। ইহুদিদের পশ্চিম দেয়াল, ক্রিশ্চানদের চার্চ অফ দি হোলি সেপুলচার, আর মুসলমানদের আল-আকসা মসজিদ এই পবিত্র শহরে অবস্থিত। ১৯৬৭র আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের সময় ইজরায়েল জেরুসালেম দখল করে নেয়ায় এটি অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলসমূহের অংশ বলে বিবেচিত হয়। ইজরায়েল ও পিএলওর মধ্যে সাক্ষরিত অসলো চুক্তি অনুসারে পশ্চিম জেরুসালেম ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পূর্ব জেরুসালেম প্যালেস্টাইনিয়ান অথোরিটির (পিএ) নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। ট্রাম্প সেই জেরুসালেমকে ইজরায়েলের হাতে তুলে দিয়ে জায়নবাদী রাষ্ট্রটির প্রতি যে পরিষ্কার পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করলেন তা ইহুদি ইজরায়েলি ও আরব ফিলিস্তিনিদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সত্যিকার শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ করে দিলো। ফিলিস্তিনের ওপর জায়নবাদী ইজরায়েলের যে বর্ণবাদী-উপনিবেশিক দখলদারিত্ব এর মাধ্যমে সেটাকেও বৈধতা দেয়া হলো।

পাশাপাশি ট্রাম্প চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালেন। এই যুদ্ধে আমেরিকান অর্থনীতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, না চীনের অর্থনীতি, এই নিয়ে স্কলারদের মধ্যে দৃশ্যমান মতবিরোধ আছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের অর্থনৈতিক নীতির চর্চাবিষয়ক অধ্যাপক জেসন ফারম্যান মনে করেন এই যুদ্ধে চীনই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যদিও সেটা সামাল দেয়ার রাজনৈতিক সামর্থ্য আমেরিকার চেয়ে চীনের বেশি আছে। উল্টোদিকে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক অ্যালিসন কার্নেগী মনে করেন, ট্যারিফের অর্থনৈতিক খরচের পাশাপাশি এই বাণিজ্যযুদ্ধ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ততা ও সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য স্বার্থকে বিপন্ন করে তুলেছে। এই দুই বয়ানের যেটাই সত্যির অধিকতর নিকটবর্তী হোক না কেনো, বিশ্ব অর্থনীতি যেহেতু কোনো একটি রাষ্ট্রের ব্যাপার নয়, তাই শেষ পর্যন্ত এই বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের জনগণেরই হবে। পরোক্ষভাবে সেটা অন্যান্য রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। প্রভাবটা ইতিবাচক নয়।

ট্রাম্পের শান্তিকামী ভাবমূর্তির যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো, সেটাও ড্রোন হামলায় কাশেম সোলেমানী হত্যাকাণ্ডে ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। সিরিয়া যুদ্ধে সোলেমানীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও ইরাকের মাটিতে ইরানের একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করা সর্বপ্রকার আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘণ ও চূড়ান্ত প্রকৃতির হঠকারিতা বলেই বিবেচিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

মূলত ইওরোপিয়ান উপনিবেশবাদ ও অংশত নিজেদের ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদবুদ্ধির কারণে মধ্যপ্রাচ্য এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিগ্রহে পরিপূর্ণ একটি অঞ্চল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে সেখানে যে অনন্ত যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছিলো তারই ধারাবাহিকতায় আইএসের মতো ধর্মাশ্রয়ী রক্তপিপাসু শক্তির উত্থান ঘটেছে। তার কথিত খেলাফতের পতন ঘটানো গেছে বটে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায়, কমব্যাটেন্টদের পাশাপাশি বহু সিভিলিয়ানের খুন ঝরাতে হয়েছে। সৌদি আরব হোক আর ইরান হোক, তুরস্ক হোক আর সংযুক্ত আরব ইমারাত হোক, এসব যুদ্ধবিগ্রহ সব ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রেরই ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের কাজে এসেছে। সিরিয়া আর ইয়েমেন শিশুদের গণকবরে পরিণত হয়েছে। এই গল্পে কোনো হিরো নেই, সবাই ভিলেন। ট্রাম্পের এই হননযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢাললেন মাত্র।

ইরান ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তারা প্রচণ্ড প্রতিশোধ নেবে। এটা যে নিছকই কথার কথা নয়, রাশিয়া আর চীনের সাথে সম্মিলিত সামরিক মহড়া থেকে সেটা বোঝা গেছে। যুদ্ধ বেঁধে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র রাষ্ট্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব ইমারাত কোন পক্ষে থাকবে বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুদ্ধ বাঁধলে বিপুল অর্থক্ষয় আর প্রাণহানি ঘটবে। দুই রাষ্ট্রেই উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রবণতা শক্তিশালী হবে। জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে একদিকে মার্কিন সরকার আর অন্যদিকে আয়াতোল্লাহরা সর্বপ্রকার ভিন্নমতাবলম্বীকে দেশদ্রোহী অপবাদ দেয়ার সুযোগ পাবে। তাতে দুই দেশেই উদার বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী মানুষেরা কোনঠাসা হবে, দুই দেশেই মানবাধিকার কর্মীরা কোনঠাসা হবে। ফিরে আসবে বুশ ডকট্রিনঃ হয় তুমি আমার পক্ষে, আর না হয় আমার বিরুদ্ধে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসবে নাগরিক অধিকার সংকুচিত করা নানাপ্রকার নিপীড়ণমূলক আইন, ফিরে আসবে গুয়ান্তানামো বে আর আবু ঘারিব। ইরানে এভিন আর কাহরিজাখের মতো ভয়ংকর নিপীড়ণমূলক কারাগারগুলোও কথিত দেশদ্রোহীতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে, সিরিয়া যুদ্ধে যেমনটা ঘটেছিলো কুখ্যাত সেদেনিয়া কারাগারের ক্ষেত্রে।

ফিরে আসবে জিহাদিরাও। আইএসের খেলাফতের পতন ঘটলেও তারা এই যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে দেশে দেশে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে। অন্য জিহাদী মতাদর্শী গোষ্ঠীগুলোও ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার সুযোগটা হাতছাড়া করবে না। তারা ইরান বিরোধিতার নামে শিয়াদেরকে আক্রমণ করবে। ইরাকে আইএসের উত্থানের পেছনে নূরী আল-মালিকীদের যে সুন্নীবিরোধী নীতি অংশত দায়ী ছিলো, তার পুনরাবির্ভাব দেখা যাবে, ইরান-ব্যাকড শিয়া মিলিশিয়া বাহিনীগুলো জিহাদীদের বিরুদ্ধে লড়ার নামে সুন্নীদেরকে আক্রমণ করবে। ঘটবে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার। এতে আখেরে সব সম্প্রদায়ের মানুষই বিপন্ন হবে।

তুরস্ক আর ইজরায়েলও এই যুদ্ধের ফায়দা নেবে। কুর্দিদের বিরুদ্ধে এরদোগান যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছেন, তা মার্কিন-ইরান যুদ্ধের কারণে আড়ালে পড়ে যাবে, এতে তুরস্কেরই লাভ। একই ঘটনা ঘটবে ফিলিস্তিনে ইজরায়েলি জুলুমনিপীড়ণের ক্ষেত্রেও।

আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে আসছে মনে হচ্ছিলো। কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত ভেদবুদ্ধিজনিত কারণে নয়, নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে, ইরাক থেকে লেবাননে জ্বলে উঠছিলো বিদ্রোহের আগুন। এই যুদ্ধ সেই আগুনে পানি ঢেলে দেবে।

একমাত্র প্রতিরোধযুদ্ধ ছাড়া, আর কোনো যুদ্ধে, দুনিয়ার কোথাও জনগণের কোনো ফায়দা হয় না। ফায়দা হয় অস্ত্র ব্যবসায়ী আর অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের। আসন্ন মার্কিন-ইরান যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়।

আশার কথা, অনেকেই সেটা অনুভব করতে পারছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। এই অন্ধকার সময়ে এমন মানুষেরাই আশান্বিত করেন। যুদ্ধের জন্য মাস হিস্টেরিয়া তৈরি করা সহজ। ডুগডুগি বাজানো সহজ। যুদ্ধের অমানবিকতা অনুভব করা ঢের বেশি কঠিন। আমাদের উচিত এই কঠিন কাজটাই করাঃ মৃত্যুবণিকদের তাবৎ উসকানি উপেক্ষা করে আসন্ন মার্কিন-ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *