বৈরুত, বিশ্বের রক্ষিতা / নিজার কাব্বানি

লেবানন নিয়ে আমার আগ্রহের শুরুটা ইনসেনডিজ দেখে। মধ্যপ্রাচ্যের এক নামহীন দেশে নাওয়াল নামে এক ক্রিশ্চান আরব মেয়ে এক ফালাস্তিনি রিফিউজির প্রেমে পড়ে অন্তঃস্বত্তা হয়। সহজেই অনুমেয় প্রেমিকটি মুসলিম ছিলো, এবং ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর প্রেমিকার পরিবারের হাতে খুন হয়ে গিয়েছিলো, মেয়েটিও আরেকটু হলে তার পরিবারের হাতে অনার কিলিংয়ের শিকার হয়ে যেতো।

সে মূলত তার দাদীর কল্যাণে বেঁচে যায়, কিন্তু প্রসবের পরপরই, সন্তান ফেলে রেখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। যাওয়ার আগে নিহাদের পায়ে একটা চিহ্ন আঁকে, যাতে ভবিষ্যতে ছেলেকে শনাক্ত করা যায়। বহুবছর পর দেশটির গৃহযুদ্ধের সময় একে অপরকে না চেনা মা আর ছেলের দেখা হয়, কিন্তু তারপর যা হয়, সেই ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়ার চেয়ে পৃথিবীর যে-কোনো মা বিষ খেয়ে মরে যাওয়াটা প্রেফার করবে।

আমার চোখে সহজে পানি আসে না, কিন্তু এই সিনেমাটা দেখে এসেছিলো, আসা অস্বাভাবিক এমনটা মনে করি না।

ইনসেনডিজে একটা মন খারাপ করা দৃশ্য ছিলো। ইজরায়েল-ব্যাকড ক্রিশ্চিয়ান ন্যাশনালিস্ট মিলিশিয়া মুসলিম যাত্রীতে ভর্তি বাস থামিয়ে একটা ম্যাসাকার চালিয়েছিলো, ঘটনাচক্রে যে-বাসে উঠে পড়েছিলো নাওয়াল। এক সহযাত্রী মুসলিম মহিলার একটা কন্যাসন্তান ছিলো। নাওয়াল গলায় ঝোলানো ক্রুশচিহ্নের লকেট দেখালে ওকে ধর্মের বোন জেনে মিলিশিয়ারা খুশী হয়, সে প্রাণে বেঁচে যায়। সহযাত্রী মুসলিম মহিলাটির কন্যাসন্তানকে বাঁচাতে নাওয়াল নিজের কাছে টেনে নেয়, এতে মিলিশিয়ারা মনে করে মেয়েটি বুঝি ক্রিশ্চান। কিন্তু বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যখন ওরা ব্রাশফায়ার করছিলো, তখন মেয়েটি চিৎকার করতে করতে বাসের দিকে ছুটে যায়, পেছন থেকে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয় ওর ছোট্টো শরীরটাকে। যারা গুলি চালাচ্ছিলো, তাদের আগ্নেয়াস্ত্রে সেই মহিলার ছবি ঝোলানো ছিলো, যিনি নাওয়ালের মতোই কুমারী দশায় মা হয়েছিলেন।

বাস্তবে এই নামহীন দেশটি আসলে লেবানন, দীর্ঘদিন ধরে যা ছিলো সেকটারিয়ান সহিংসতায় জর্জরিত। ক্রিশ্চান আর মুসলিমরা পরস্পরকে অবিশ্বাসের চোখে দেখতো, সৌহার্দ্য ছিলো না শিয়া আর সুন্নীদের ভেতর, বিভাজন ছিলো সর্বব্যাপক। সেই বিভাজন উসকে দিয়ে ফায়দা লুটেছে অন্যরা, বৈশ্বিক আর আঞ্চলিক মোড়লরা, কোনো কমিউনিটিরই কম রক্ত ঝরে নি।

আজকে লেবাননে যা হচ্ছে তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। সরকারবিরোধী এই আন্দোলনে কোনো সেকটারিয়ান বিভাজন নাই, ক্রিশ্চানরা যেমন আছে তেমনি আছে মুসলিমরা, আছে শিয়া সুন্নী সবাই। এই আন্দোলনের পেছনে চালিকা শক্তি নাগরিক অধিকারচেতনা।

১৯৭৮এ সিরিয়ান কবি নিজার কাব্বানি লেবাননে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ছিলেন, দুনিয়ার সুখীতম হতাশাগ্রস্ত মানুষেরা যে-দেশে থাকে তার রাজধানীর উদ্দেশ্যে এই কবিতাটি লিখেছিলেন, আমি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করলাম।

বৈরুত, বিশ্বের রক্ষিতা
এক আল্লাহর সামনে স্বীকার করে নিচ্ছি
যে আমরা তোমার প্রতি ঈর্ষাতুর ছিলাম
তোমার সৌন্দর্য আঘাত করতো আমাদের
স্বীকার করে নিচ্ছি
যে দুর্ব্যবহার করেছি তোমার সাথে, ভুল বুঝেছি তোমাকে
আর আমাদের কোনো দয়ামায়া নেই, আমরা ক্ষমাহীন
ফুলের বদলে ছুরিকাই ছিলো আমাদের হাতে
স্বীকার করে নিচ্ছি পরম ন্যায়পরায়ণের সামনে
যে তোমাকে আহত করেছি, আহ; বিরক্ত করেছি
তোমাকে উত্যক্ত করেছি, কাঁদিয়েছি তোমাকে
আর আমাদের বিদ্রোহগুলো চাপিয়ে দিয়েছি তোমার ওপর

ও বৈরুত
তুমি ছাড়া দুনিয়াটা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়
তোমার শিকড় হৃদয়ে কতোটা ছড়িয়েছে, এখন বুঝি
কতো না জুলুম আমরা করেছি, এখন বুঝি
ধবংসস্তূপের নিচ থেকে জেগে ওঠো
এপ্রিলে বাদামবৃক্ষে আসা ফুলের মতন
কাটিয়ে ওঠো তোমার দুঃখ
বিপ্লব তো দুঃখের ক্ষতেই বেড়ে ওঠে
তোমার বনগুলোর সম্মানে জেগে ওঠো,
তোমার নদীগুলোর সম্মানে জেগে ওঠো
গোটা মানবজাতির সম্মানে জেগে ওঠো
জেগে ওঠো, বৈরুত!

রচনাকাল ।। ১৯৭৮, লেবাননের গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিলো, সিরিয়ান কবি নিজার তখন স্বেচ্ছানির্বাসনে ছিলেন

লেবাননের চলমান সরকার বিরোধী আন্দোলনের কয়েকটি ছবি, সবগুলোই ছবি অনলাইন থেকে নেয়া হয়েছেঃ

Image may contain: 8 people, people smiling, crowd and outdoor
Image may contain: 5 people, people smiling, people standing, crowd and outdoor
Image may contain: 3 people, crowd and outdoor
Image may contain: 16 people, crowd and outdoor
Image may contain: 4 people, crowd, sky and outdoor
Image may contain: 7 people, people smiling

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *