তৃতীয় সাম্রাজ্যঃ নাৎসি জার্মানির একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস / মার্টিন হুইটটক [অ১কি৩]

ব্যবহৃত আলোকচিত্রঃ ১৯২৩এর অতিমুদ্রাস্ফীতির সময় জার্মান শিশুরা মূল্যহীন হয়ে পড়া মার্ক দিয়ে ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে ওড়াচ্ছে, রেডডিট


নাৎসিদের ক্ষমতারোহণ, ১৯১৮-২৩ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে মিউনিখ পুশ

ভাইমার প্রজাতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান সমস্যাসমূহ

নতুন ভাইমার প্রজাতন্ত্র কয়েকটি ক্রমবর্ধমান সমস্যার মুখোমুখি হয়। প্রথমত, কমিউনিস্ট বিপ্লবের আতঙ্কে সমাজ গণতন্ত্রী সরকার এই হুমকির প্রতি অতিপ্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে এবং জার্মানির রক্ষণশীল ও সামরিক শক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে সেই গোষ্ঠীগুলো উৎসাহিত হয় যারা, বাস্তবে, সমাজ গণতন্ত্রীদের ঘৃণা করতো এবং গণতন্ত্রের জন্যও যাদের কোনো ভালোবাসা ছিলো না।

দ্বিতীয়ত, শ্রমিক শ্রেণি, যারা অন্য কোনো সময় ভাইমার প্রজাতন্ত্রের একটা সমর্থক ভিত্তি হয়ে উঠতে পারতো, ছিলো গভীরভাবে বিভক্ত। ১৯১৭তে, বহু শহুরে এলাকা উত্তেজনাপূর্ণ ধর্মঘটে ছেয়ে যায়। তারপর ঘটে স্পার্টাকিস্ট বিদ্রোহের রক্তাক্ত পতন। ১৯১৯এর মেতে, সেনাবাহিনী আর ফ্রেইকর্পস মিউনিখ সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রকে চূড়ান্তভাবে ধবংস করে দেয়। ১৯২০এ, র‍্যাডিকাল শ্রমিকরা (‘রেড রুর আর্মি’) রাইনল্যান্ড-ভেস্টফালিয়ার শিল্পাঞ্চলে ক্ষমতা দখল করেছিলো। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে সেনাবাহিনী আর ফ্রেইকর্পস ইউনিটগুলো এই অভ্যুত্থানটিকেও ধবংস করে দেয়। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে, এই সৈনিকদের অনেকেই এই একই সরকারের বিরুদ্ধে এক বছর আগে ঘটা ফ্রেইকর্পসের একটি অভ্যুত্থানকে (‘কাপ পুশ’) সমর্থন করেছিলো।[1] এই প্রতিটি ব্যর্থ বিদ্রোহের ক্ষেত্রে র‍্যাডিকাল শ্রমিকরা (যাদের অনেকেই কমিউনিস্ট ছিলো) এমন একটি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, যা যতোটা ছিলো সমাজ গণতন্ত্রী-নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে, ঠিক ততোটাই ছিলো পুঁজিবাদের শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে। স্বচ্ছল ও অধিকতর দক্ষ শ্রমিকেরা (এবং তাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলো) সরকারকে সমর্থন যোগাচ্ছিলো, আর এটা জার্মান শ্রমিক শ্রেণিকে তিক্তভাবে বিভক্ত করে ফেলেছিলো। ১৯৩৩এর জানুয়ারিতে হিটলার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত, ডানপন্থী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারা, এই সামাজিক গোষ্ঠীটির একটা প্রধান দুর্বলতা হয়ে থাকবে।

তৃতীয়ত, ভাইমার সংবিধানের খোদ চরিত্রটিই সরকারের জন্য সমস্যা তৈরি করেছিলো। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভোট ব্যবস্থা অনেকগুলো ছোটো ছোটো পার্টির বিকাশকে উৎসাহিত করছিলো। এটা সমস্যা মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী সরকার গঠন করাটাকে কঠিন করে তুলেছিলো। সংবিধানের ৪৮ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় জরুরী অবস্থার সময় রাষ্ট্রপতি রাইখস্ট্যাগএর (জাতীয় সংসদ) অনুমতি ছাড়াই আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা রাখতেন। এটা রাইখস্ট্যাগের ক্ষমতা, আর সেইসূত্রে নতুন গণতন্ত্রকেও, দুর্বল করে ফেলে।

চতুর্থত, বহু মধ্যবিত্ত জার্মান নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। বহু সরকারি কর্মকর্তা ও বিচারক ভাইমার প্রজাতন্ত্রে নিজ নিজ পদে আসীন থাকেন, যদিও তাঁদের অনেকেরই ভাইমার, বা গণতন্ত্র, কোনোটার প্রতিই কোনো ধরণের সহানুভূতি ছিলো না, এবং যারা ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর দিকে ঝুঁকে ছিলেন। একইভাবে, সেনাবাহিনী খুবই প্রভাবশালী রয়ে গেছিলো, এবং ভাইমার, বা গণতন্ত্রের প্রতি, তাদের সামান্যই আনুগত্য ছিলো। ১৯২০-২৬ সময়কালের সেনাপ্রধান জেনারেল সিকত সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, এবং ফ্রেইকর্পসের ক্ষমতা কমিয়েছিলেন, কিন্তু সেনাবাহিনীকে সরকারের থেকে স্বাধীন রাখার ব্যাপারেও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। আর সেনাবাহিনীতে অনেকেই বিশ্বাস করতো, জাতির জন্য কোনটা সবচে ভালো, তা নির্ধারণ করার অধিকার তাদের রয়েছে। এই সব ফ্যাক্টর মিলে একটা আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করাটা কঠিন করে তুলেছিলো।

অধিকন্তু, ভাইমার প্রজাতন্ত্রে আধাসামরিক বাহিনীর কোনো অভাব ছিলো না। নাৎসিদের ছিলো তাদের বাদামী-শার্ট পরিহিত লড়াই করার ইউনিট ঝঞ্ঝাবাহিনী, কমিউনিস্ট পার্টির ছিলো তাদের ‘রেড ফ্রন্ট ফাইটার্স লিগ’, সমাজ গণতন্ত্রী পার্টির ছিলো এর ‘রাইখ ব্যানার, ব্ল্যাক-রেড-গোল্ড’ সংগঠন, রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদীদের ছিলো সাবেক সৈনিকদের নিয়ে গঠিত ‘স্টিল হেলমেটস।’ আর এগুলোর পাশাপাশি ছিলো ফ্রেইকর্পসের জল্লাদ বাহিনীগুলো। এই আধাসামরিক সহিংসতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছিলো। বস্তুত, কয়েকটি জার্মান রাজ্য রাজনৈতিক সভায় কাচের ছাইদানি আনা আর পাবলিক পরিসরে চলার কাজে সাহায্য করা লাঠি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, কারণ প্রায়শই এগুলো আক্রমণের হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহৃত হত![2]

যেনো তীব্র রাজনৈতিক সমস্যাগুলোই যথেষ্ট ছিলো না। ভাইমার প্রজাতন্ত্র কিছু অর্থনৈতিক সমস্যারও সম্মুখীন হয়। বিজয়ী মিত্রপক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপক চাপ ছিলো, এবং সরকার এর ঋণ পরিশোধ করার জন্য সমানে টাকা ছাপিয়ে যাচ্ছিলো। এতে করে জার্মান অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতিমূলক চাপ পড়ে। তদুপরি, নতুন সামাজিক সংস্কারগুলো ব্যয়বহুল ছিলো, এবং সরকারকে এটা কুলিয়ে উঠতে বেগ পেতে হচ্ছিলো। ১৯২৩এ পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে ওঠে, যখন ফরাশিরা রুর অঞ্চলস্থিত জার্মান কয়লাখনিগুলো দখল করে নেয়। ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে জার্মানি পিছিয়ে পড়ছিলো, তাই ফরাশিদের আশা ছিলো, যা নেয়ার জোর করে নেবে। এটা জার্মান অর্থনীতিতে আরেকটা আঘাত হানে। এই সব সমস্যা ১৯২৩এর অতিমুদ্রাস্ফীতির দিকে নিয়ে যায়। অর্থের মূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। ১৯২৩এর নভেম্বরে স্রেফ ১ ইউএস ডলার কিনতে ২০০,০০০,০০০,০০০ মার্ক লাগতো। ব্যাপারটা বোঝার সুবিধার্থে এভাবেও বলা যেতে পারে, একটা ডিমের দাম ছিলো ১০০ মিলিয়ন মার্ক! দুইজন মহিলা ব্যাংক নোটে বোঝাই একটা ঝুড়ি নিয়ে শপিং করতে বেরিয়ে একটা দোকানের জানলা দিয়ে উঁকি মারতে ঝুড়িটা মাটিতে নামিয়ে রাখেন। যখন তারা পিছু ফিরে তাকালেন, দেখলেন টাকা টাকার জায়গায়ই আছে, ঝুড়িটা গায়েব হয়ে গেছে। হাজার হোক, ঝুড়ির তো মূল্য আছে একটা! মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সদস্যদের, এবং অন্য যাদের সেভিংস ছিলো, স্থায়ী পেনশন ছিলো, তারা দেখলো এগুলো রাতারাতি মূল্যহীন হয়ে উঠছে এবং শ্রমিকদের মজুরির মূল্যও ধবসে পড়ছে। যা-হোক, কয়েকটি অপেক্ষাকৃত বড়ো জার্মান ফার্ম আসলে এতে লাভবান হয় লেবার কস্ট কমিয়ে রাখতে পারায়, আর এই ফার্মগুলোই মুদ্রাকে স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টাগুলোয় বাধাপ্রদান করে।[3]

(চলবে…)


[1] কার্স্টেন, ফ্রান্সিস লুডউইগ, দি রেইখশোয়েহের অ্যান্ড পলিটিকস, ১৯১৮ টু ১৯৩৩, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, ১৯৭৪, পৃঃ ৭৮-৯।

[2] বুরলেই, মাইকেল, দা থার্ড রেইখ, এ নিউ হিস্টোরি, প্যান বুকস, ২০০১, পৃ. ৬৫।

[3] থর্নহিল, ক্রিস, পলিটিকাল থিওরি ইন মডার্ন জার্মানিঃ অ্যান ইন্ট্রোডাকশন, পলিটি, ২০০০, পৃ. ১০১। ১৯২০এর দশকে ভাইমার অর্থনীতির সংকটের একটা নিরীক্ষার জন্য, দেখুন উইডডিগ, ব্রেন্ড, কালচার অ্যান্ড ইনফ্ল্যাশন ইন ভাইমার জার্মানি, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ২০০১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *