তৃতীয় সাম্রাজ্যঃ নাৎসি জার্মানির একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস / মার্টিন হুইটটক [অ১কি২]

ব্যবহৃত আলোকচিত্রঃ জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়াচ্ছেন রাষ্ট্রপতি এবার্ট, রেডডিট


নাৎসিদের ক্ষমতারোহণ, ১৯১৮-২৩ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে মিউনিখ পুশ

জাতীয় পরাজয় এবং ভাইমার প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা

১৯১৮র নভেম্বরে জার্মানি যখন পরাজয়ের সম্মুখীন হয়, তখন দেশটি ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছিলো। উইলহেমশহাভেন, কিয়েল আর হামবুর্গের বন্দরগুলোতে নাবিকেরা বিদ্রোহ করে বসে; বার্লিন ও অন্য শহরগুলোতে শ্রমিক ও সাবেক সৈন্যরা বিপ্লবী সোভিয়েত (বিপ্লবী পরিষদ, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত সাম্যবাদী রাশিয়ার নামানুসারে) গঠন করে। জার্মান সম্রাট – কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম – হল্যান্ডে পালিয়ে যান এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার তাঁকে প্রতিস্থাপিত করে। এটা ছিলো একটা মডারেট সমাজতন্ত্রী সরকার, যার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জার্মান সমাজ গণতন্ত্রী দলের (এসডিপি) নেতা, ফ্রেডরিখ এবার্ট। ১৯১৯এর ১১ ফেব্রুয়ারি, এবার্ট নতুন জার্মান প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিশেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯২৫এর ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত তিনি স্বপদে বহাল ছিলেন। তাঁর শাসনামলে, জার্মানি ১৯১৯এর বিপর্যয়েও টিকে থাকতে সক্ষম হয়, এবং ক্রমান্বয়ে যথেষ্ট পরিমাণে স্থিতিশীলতা অর্জন করে, এতোটাই, যে একসময় মনে হচ্ছিলো, জার্মানির সামনে বুঝি সত্যিই একটা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ আছে।[1]

কিন্তু শুরুর দিকে, এবার্টের নতুন সরকার ব্যাপক অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হয়। জার্মানির বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র শ্রমিক ও সৈনিকরা – সাম্প্রতিক ১৯১৭র রুশ বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে – সাম্যবাদী অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলো। ফ্রেইকর্পস (ফ্রি কর্পস) নামে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থী সাবেক সৈন্যদের বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনী তাদের রক্তাক্ত পতন ঘটায়। ১৯১৯ নাগাদ, জার্মানিতে এরকম ফ্রেইকর্পসের প্রায় ২০০টির মতো গোষ্ঠী ছিলো। নতুন সরকার সাম্যবাদীদের বিদ্রোহ দমন করার কাজে এদেরকে ব্যবহার করলেও, গণতন্ত্রের প্রতি এদেরও কোনো ভালোবাসা ছিলো না। ১৯১৯এর জানুয়ারিতে, কমিউনিস্টদের একটা গোষ্ঠী বার্লিনে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। এরা ছিলো স্পার্টাকিস্ট, যারা এই বিদ্রোহের অল্প কিছুদিন আগে জার্মান সাম্যবাদী দল (কেপিডি) গঠন করেছিলো। ফ্রেইকর্পসরা ‘স্পার্টাকিস্ট বিদ্রোহ’ রক্তাক্ত প্রক্রিয়ায় দমন করে, যারা এবার্ট সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিলো, কারণ তারা সমাজ গণতন্ত্রীদের যতোটা ঘৃণা করতো সাম্যবাদকে তারচে অনেক বেশি ঘৃণা করতো।

ফলস্বরূপ, এবার্টের সরকার টিকে গেলো, কিন্তু এটা সমাজ গণতন্ত্রী দলের (এসপিডি) মডারেট সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদী দলের (কেপিডি) মধ্যে একটা তিক্ত বিচ্ছেদের জন্ম দিলো। এর মানে দাঁড়ালো, জার্মানির বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের জাতীয়তাবাদী প্রতিপক্ষকে যতোটা ঘৃণা করতো, তারা ঠিক ততোটাই ঘৃণা করতো একে অপরকে। বাভারিয়ার (অন্যতম একটি জার্মান রাজ্য) রাজধানী মিউনিখে, বাভারীয় সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিলো, এবং কুর্ট এইসনারের নেতৃত্বে স্বল্পকালের জন্য একটি স্বাধীন সাম্যবাদী সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র গঠন করা হয়েছিলো। কিন্তু ক্রমান্বয়ে এটিও সেনাবাহিনী ও ফ্রেইকর্পসের হাতে ধবংস হয়ে যায়, এবং এরা নেতারা খুন হয়ে যান।[2]

জার্মানি যখন এই অস্থিরতার মাঝখানে ছিলো, তখন জাতির জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। স্পার্টাকিস্ট বিদ্রোহের ফলে রাজধানী বার্লিন অরাজকতায় পরিপূর্ণ থাকায় এই সংবিধানটি গৃহীত হয়েছিলো ভাইমার শহরে। ফলে, ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩এর জানুয়ারিতে হিটলার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত জার্মান সরকারকে ‘ভাইমার প্রজাতন্ত্র’ বলা হয়।

১৯১৯এ, নতুন ভাইমার সরকার ভার্সাই চুক্তিতে সম্মত হলো, যা আনুষ্ঠানিকভাবে ইতি টেনেছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের। বিজয়ী মিত্রপক্ষ (মূলত ব্রিটেন, ফ্রান্স, ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) জার্মানিকে দুর্বল করার জন্য দেশটির ওপর অত্যন্ত কঠোর একগুচ্ছ দাবিদাওয়া চাপিয়ে দিলো, যাতে জার্মানি আর কোনোদিন ইওরোপের শান্তিভঙ্গ করতে না পারে।[3] আরেকটা উদ্দেশ্য ছিলো আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি প্রসারিত করা, যাকে করে লোকে তাদের নিজস্ব নৃ গোষ্ঠীগুলো নিয়ে গঠিত দেশগুলোর অংশ হতে পারে। এভাবে, এককালে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, আর রাশিয়া কর্তৃক শাসিত হয়েছে, এমন ভূখণ্ড নিয়ে গঠন করা হলো পোল্যান্ড। কিন্তু লক্ষ লক্ষ অস্ট্রিয়ান (এখন, নিজের সাম্রাজ্য হারিয়ে, একটি ছোটো দেশ) তাদের সতীর্থ জার্মানদের সাথে দুই দেশের একটা আনশলুসএ (ঐক্য) যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে স্বাধীন ছিলো না। ঘটনাচক্রে, গণতন্ত্র আর নতুন ভাইমার প্রজাতন্ত্রকে পরাজয় আর অপমানের সাথে সংযুক্ত মনে হচ্ছিলো, এবং এটা সেই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করবে যারা ১৯২০এর দশকে এর পতন ঘটাতে চাচ্ছিলো। যে-রাজনীতিকরা জার্মানিকে ১৯১৮য় যুদ্ধ থেকে বের করে এনেছে, তাদের কাছে তারা ছিলো ‘নভেম্বর ক্রিমিনাল’, এবং এই ‘ক্রিমিনালরা’ অবমাননাকর ভার্সাই চুক্তিতে সাক্ষর করে নিজেদের অপরাধ বহুগুণে বাড়িয়েছে।

বহু জার্মান এটা বিশ্বাস করতে অনিচ্ছুক ছিলো যে শক্তিশালী জার্মান সেনাবাহিনী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে গেছে। তারা বরঞ্চ এটা বিশ্বাস করতে পছন্দ করতো যে, দেশটি সমাজতন্ত্রী রাজনীতিক, সাম্যবাদী বিপ্লবী, আর ইহুদিদের (জার্মান ইহুদি জনসংখ্যার ছোটো আকার এবং জার্মান সমাজে সম্প্রদায়টির উচ্চ মাত্রার সংযুক্ততা সত্ত্বেও) দ্বারা বেঈমানির শিকার হয়েছে। যুদ্ধ পরবর্তী কালের অস্থিরতাও এইসব লোকজনের জন্য এটা বিশ্বাস করা সহজতর করে তুলেছিলো যে, জার্মানি একটা সাম্যবাদী বিপ্লবের ঝুঁকির মুখে আছে। ফলে, ১৯২০এর দশক জুড়ে সেনাবাহিনী আর জাতীয়তাবাদের জন্য ব্যাপক সমর্থন রয়ে গেছিলো, যদিও বাস্তবে, ১৯১৮র পরাজয়ের যে-বিপর্যয়, জার্মানির জন্য তা এই দুটো শক্তিই ডেকে এনেছিলো। সর্বোপরি, ভার্সাই চুক্তির কঠোরতা দূরের শত্রুর দিকে রাগের গতিমুখটা চালিত করা সহজতর করে তুলেছিলো, জার্মানির সামরিক উচ্চাভিলাষই যে তার জন্য এসব সংকটের অনেকগুলোই ডেকে এনেছিলো তা স্বীকার করার চেয়ে।[4]

(চলবে…)


[1] দেখুন, ওয়েইৎজ, এরিক ডি., ভাইমার জার্মানিঃ প্রমিজ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৭, এবং ফ্রেডরিখ, অটো, বিফোর দা ডিল্যুজঃ এ পোর্ট্রেট অফ বার্লিন ইন দা ১৯২০জ, হার্পারকলিন্স, ১৯৭২।

[2] হার্মান, ক্রিস, দা লাস্ট রেভল্যুশনঃ জার্মানি ১৯১৮ টু ১৯২৩, হেমার্কেট বুকস, ২০০৩, দাবি করেছেন, কেউ যদি জার্মানিতে ডানপন্থার সাফল্য ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিচ্ছিন্নতাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে চায়, তাহলে তাঁকে জার্মানিতে বিপ্লবের ব্যর্থতাটা বুঝতে হবে।

[3] ম্যাকমিলান, মার্গারেট, পিসমেকারসঃ সিক্স মান্থস দ্যাট চেঞ্জড দা ওয়ার্ল্ডঃ দা প্যারিস পিস কনফারেন্স অফ ১৯১৯ অ্যান্ড ইটস অ্যাটম্পট টু এন্ড ওয়ার, জন মুরে, ২০০৩, যুদ্ধোত্তর শান্তি চুক্তিগুলো প্রণয়ন করার জটিলতা এবং পিসমেকাররা যেসব কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন তা অনুসন্ধান করেছেন।

[4] হুইলার-বেনেট, জন ডব্লিউ., নেমেসিস অফ পাওয়ারঃ দা জার্মান আর্মি ইন পলিটিকস ১৯১৮-১৯৪৫ (দ্বিতীয় সংস্করণ), পেলগ্রেভ ম্যাকমিলান, ২০০৫, কীভাবে জার্মান সেনাবাহিনী ভাইমার প্রজাতন্ত্রে একটি আধিপত্যশীল ভূমিকা পালন করতো এবং নাৎসিদের উত্থানে এর যে-ভূমিকা ও পরবর্তীতে নাৎসি অপরাধগুলোর ব্যাপারে এর যে-সহনশীলতা, তার একটা বিস্তারিত নিরীক্ষা পেশ করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *