তৃতীয় সাম্রাজ্যঃ নাৎসি জার্মানির একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস / মার্টিন হুইটটক [অ১কি১]

ব্যবহৃত আলোকচিত্রঃ আন্তন দ্রেক্সলারের সাক্ষর করা ছবি, এসজেএস মিলিটারিয়া


নাৎসিদের ক্ষমতারোহণ, ১৯১৮-২৩ : প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে মিউনিখ পুশ

আন্তন দ্রেক্সলারের জন্ম জার্মানিতে, ১৮৮৪তে। তার কর্মজীবন শুরু হয় মেশিন ফিটার হিশেবে কাজ করার মধ্য দিয়ে। ১৯০২এ, বার্লিনে, দ্রেক্সলার একজন তালাচাবিঅলা হিশেবে কাজ শুরু করেন। একজন উগ্র জাতীয়তাবাদী হওয়া সত্ত্বেও, তাকে সামরিক দায়িত্বের অনুপযুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিলো, আর এই কারণে, এটা তার জন্য খুবই হতাশাজনক একটা ঘটনা ছিলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়ার অনুমতি মেলে নি তার। ১৯১৯এ, জার্মানির পরাজয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে এবং যুদ্ধোত্তর বাভারিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় আতঙ্কিত হয়ে, তিনি সমমনা মানুষদের সাথে মিলে মিউনিখে জার্মান শ্রমিক দল (ডিএপি) প্রতিষ্ঠা করেন। দ্রেক্সলার জার্মান জনগণের একটা বিপন্ন অংশের যথার্থ প্রতিনিধি ছিলেনঃ নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি। শ্রমিকদের তুলনায় দক্ষতা আর স্বাধীনতা বেশি থাকায়, এই শ্রেণির লোকেরা শ্রেণিসমাজে নিচে নেমে যাওয়ার এমন যে-কোনো প্রকার চাপ এড়াতে মরিয়া ছিলো, যা তাদেরকে শ্রমিকশ্রেণির স্তরে নামিয়ে দিতে পারতো। যুদ্ধোত্তর জার্মানির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় এদের মধ্যে  নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করেছিলো, যার ফলে এরা জার্মানির সঙ্কটাপন্ন দশার জন্য দ্রুতই ইহুদি, সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টদের দায়ী করা শুরু করে।

ডিএপি ছিলো বাভারিয়ার অনেকগুলো ছোটো ছোটো ভোলকিশ (বর্ণবাদী) পার্টির মধ্যে একটি। জার্মান রক্ত আর জার্মান সংস্কৃতির পরিশুদ্ধতায় বর্ণবাদী বিশ্বাস ছিলো এসব পার্টির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এর বাইরে, তাদের লালনকৃত বিশ্বাসগুলো ছিলো উগ্র জাতীয়তাবাদ, ইহুদিবিদ্বেষ, আর ডানপন্থী সমরবাদের এক অদ্ভূত মিশ্রণ, যাতে মিশে ছিলো পুঁজিবাদ, বৃহদায়তন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, আর অনুপার্জিত মুনাফার বিরুদ্ধে এক ধরণের র‍্যাডিকাল ও আধা-সমাজতান্ত্রিক আক্রোশ। ফলে, তাদেরকে রাজনৈতিক বর্ণালীর কোনো বিন্দুতে স্থাপন করা কঠিন, যেহেতু, তারা সেইসব লোকের উদ্বেগ, ভয়, আর আক্রোশের প্রতিনিধিত্ব করতো, যার নিজেদেরকে ওপর নিচে দুই দিক থেকেই চাপের মুখে থাকা মানুষ হিশেবে অনুভব করতো। তাদের নিচে ছিলো বর্ণের বদলে শ্রেণির প্রতি আন্তর্জাতিক আনুগত্য পোষণ করা ইউনিয়নায়িত শ্রমিকেরা; তাদের ওপরে ছিলো অপেক্ষাকৃত অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করা ধনীরা, যাদের জাতীয়তাবাদ ছিলো মূলত রক্ষণশীল।

১৯১৯এ, ডিএপির একটি সভায় উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রীয় উৎসের এক রহস্যময় সেনা কর্পোরাল – অ্যাডলফ হিটলার। দ্রেক্সলার হিটলারকে ‘আমার রাজনৈতিক জাগরণ’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা পড়তে দিয়েছিলেন। পরবর্তী হিটলারের রাজনৈতিক আত্মজীবনী মেইন কাম্ফএ (আমার সংগ্রাম) প্রকাশিত চিন্তা অনুসারে, দ্রেক্সলারের পুস্তিকাটিতে হিটলারের বহু উদীয়মান বিশ্বাসের ছাপ ছিলো। ফলে, হিটলার দ্রেক্সলারের ছোট্টো পার্টিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলেন, এবং, ১৯২০ নাগাদ, তার রেটোরিকাল দক্ষতা একদিকে যেমন ভিড় জমাচ্ছিলো তার চারপাশে, অন্যদিকে তেমনি নিষ্প্রভ করে তুলছিলো দ্রেক্সলারকে। সেই একই বছরে, তিনি দ্রেক্সলারকে পার্টির নাম বদলে জাতীয় সমাজতন্ত্রী জার্মান শ্রমিকদের দল (এনএসডিএপি, বা, নাৎসি) করায় প্রলুব্ধ করলেন। ১৯২১, হিটলার দ্রেক্সলারের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করলেন, এবং প্রতিরোধপ্রচেষ্টার ছোটো একটা পর্বের পর, দ্রেক্সলার পদত্যাগ করলেন। হিটলারকে প্রতিহত করার দক্ষতা বা সংগঠন কোনোটাই না থাকায়, দ্রেক্সলার ১৯২৩এ এনএসডিএপি ছেড়ে চলে যান। ১৯৪২এর ফেব্রুয়ারিতে তিনি একজন বিস্মৃতপ্রায় ব্যক্তি হিশেবে মিউনিখে মৃত্যুবরণ করেন। ততোদিনে তার কাছ থেকে হিটলার যে-পার্টি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন, ক্ষমতায় সেটি প্রায় দশ বছর পার করে ফেলেছে, এবং অবিশ্বাস্য বন্যতায় পরিপূর্ণ একটা বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছে। জার্মান সৈন্যরা আটলান্টিক থেকে দক্ষিণ রাশিয়া পর্যন্ত পুরো ইওরোপ দখল করে নিয়েছে এবং গত গ্রীষ্ম থেকে পূর্ব ইওরোপের ইহুদিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো শুরু হয়েছে। ১৯১৮য় জার্মানির পরাজয়ের পরবর্তী বছরগুলোতে এই দৃশ্যাবলী কল্পনারও অতীত ছিলো। কিন্তু হিটলার যাকে একদিন তৃতীয় সাম্রাজ্য বলে আখ্যায়িত করবেন, তার শেকড় খুঁজতে ফিরে যেতে হবে সেই সমস্যাসংকুল ও এলোমেলো সময়েই, এবং স্ববিরোধী সেইসব বিশ্বাসের ঘূর্ণাবর্তে যা দ্রেক্সলারের ছোট্টো রাজনৈতিক দলটার কেন্দ্রে অবস্থিত ছিলো[1]

(চলবে…)


[1] আন্তন দ্রেক্সলারের ক্যারিয়ারের একটা শুরুর দিকের রূপরেখার জন্য, দেখুন হেইডেন, করনাড, এ হিস্ট্রি অফ ন্যাশনাল সোশালিজম, আলফ্রেড এ. নফ, ইনক, ১৯৩৫, অক্টাগন বুকস কর্তৃক পুনঃমুদ্রিত, ১৯৭১, পৃঃ ৩-৮। আরো দেখুনঃ শোওয়েনবম, ডেভিড, হিটলারস সোশাল রেভল্যুশনঃ ক্লাস অ্যান্ড স্ট্যাটাস ইন নাৎসি জার্মানি, ১৯৩৩-১৯৩৯, ডব্লিউ. ডব্লিউ. নর্টন, ১৯৯৭, পৃঃ ১৫-১৬।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *