ল্যাবিরিন্থ অফ লাইজঃ একটি জাতির আত্মসমীক্ষণের গল্প

ফ্রাঙ্কফুর্ট, ১৯৫৮। স্নায়ুযুদ্ধের ছুরিতে জার্মানি দুই টুকরো হয়ে গেছে। সীমান্তের পূর্বদিক সোভিয়েতরা চালায়, পশ্চিমদিক চালায় আমেরিকা।

জার্মানরা তাদের ইতিহাস ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পশ্চিম জার্মানির ক্ষেত্রেও আমেরিকানরা তাতে উৎসাহ দিচ্ছে। যা হওয়ার হয়ে গেছে, অতীতকে ভুল গিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে, লড়তে হবে নতুন শত্রু কমিদের বিরুদ্ধে।

জার্মান তরুণরা, যাদের বয়স বিশের কোঠায়, তারা প্রায় কিছুই জানে না নাৎসিদের সম্পর্কে। নাৎসি নামে একটা পার্টি ছিলো, তারা কী সব জানি করেছিলো, যুদ্ধের পরে নুরেমবার্গে তাদের কয়েকজনের বিচারও হয়েছিলো। এরচে বেশি তাদেরকে জানতে দেয়া হয় না।

ফলে তরুণ আইনজীবী জোহান রাডম্যান খুবই অবাক হলো, যখন সে জানতে পারলো স্থানীয় এক স্কুলের মাস্টার যুদ্ধের সময় ওয়াফেন-এসএস’এ ছিলো, পোল্যান্ডের আউশউইৎজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে সে সার্ভও করেছিলো। অথচ রাডম্যান আউশউৎইজের নামও শোনেনি এর আগে। কেনো সাংবাদিক টমাস নিয়েলকা বিষয়টা নিয়ে উত্তেজিত, সে বুঝতে পারলো না, তবে কেসটার ব্যাপারে সে উৎসাহিত হলো।

এরপর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হলো। জানা গেলো, যুদ্ধপরবর্তী ডিনাৎসিফিকেশন একটা অতিকথন মাত্র। অই কর্মসূচি বেশিদিন চালানো যায় নি, জার্মান সমাজরাষ্ট্রের স্তরে স্তরে নাৎসিরা লুকিয়ে আছে, যুদ্ধের পরে ভেক বদলে চমৎকার দিন কাটছে তাদের।

এরা সিভিল সার্ভিসে আছে, আর্মিতে আছে, আছে চিকিৎসক/শিক্ষকের মতো সামাজিকভাবে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা হয় এমন সব পেশায়।

জার্মান সমাজে এদের প্রতি ব্যাপক সহানুভূতি আছে। ওরা যা করেছে সবই করেছে দেশের জন্য। ওরা ছিলো দেশপ্রেমিক।

রাডম্যানের সহকর্মীরা তার বোকামি নিয়ে হাসাহাসি করে। নামকরা কোনো ফার্মের পোষা আইনজীবী হয়ে কোথায় দুটো পয়সা কামিয়ে নেবে, তা না, পড়ে আছে মান্ধাতার আমলে নাৎসিদের করা ক্রাইম নিয়ে। হিটলার মরে গেছে, এখন আর এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ, খামোখা নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করা।

ছেলেটা অবশ্য গোঁয়ার, সে হাল ছাড়লো না।

অ্যাটোর্নি জেনারেল ফ্রিৎজ বাউয়ের, যিনি একজন ইহুদি, তরুণ রাডম্যানকে দায়িত্ব দিলেন রক্ষিবাহিনীর (এসএস) ক্রিমিনালদেরকে খুঁজে বের করার। এই অনুসন্ধান একসময় রাডম্যানের অস্তিত্ব নাড়িয়ে দিলো। সে ভয়াবহ কিছু অস্বস্তিকর সত্যের সম্মুখীন হলো।

ম্যাঙ্গেলা তাদের মতোই ‘শিক্ষিত’ এক লোক ছিলো, ছিলো চিকিৎসা পেশায়, যে ভালোবাসতো অপেরা আর উপভোগ করতো কনসার্ট। এমন লোক কী করে নাৎসি পার্টিতে যায়? যতো ভাবে, ততোই বিস্ময় বাড়তে থাকে রাডম্যানের!

আইখম্যানের মতো সেই ম্যাঙ্গেলাও আর্জেন্টিনায় পালিয়ে গেছে, খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো জোহান রাডম্যান। কিন্তু লোকটা নিয়মিত বিরতিতে আসে পশ্চিম জার্মানিতে, কারণ তার পরিবার সেখানেই বাস করে। পুলিশ সব জানে, কিন্তু কিছু করে না, ‘উপরতলার’ হুকুম আছে কিছু না করার।

যুদ্ধের সময় থেকেই তাঁর বাবা নিখোঁজ, কিন্তু যুদ্ধের সময় তাঁর বাবার ভূমিকা কী ছিলো রাডম্যান জানতো না। সে এখন জানতে পারলো, আরো বহু ‘সাধারণ জার্মানের মতোই’, তার বাবাও ছিলো নাৎসি পার্টিতে। শুধু তাই নয়, তাঁর প্রেমিকা মার্লিনের বাবাও যুদ্ধের সময় নাৎসিদের পক্ষ নিয়ে লড়েছে, এমনকি যে-সাংবাদিক রক্ষিবাহিনীর ক্রিমিনালদের বিচারের মুখোমুখি করতে মুখিয়ে আছে সেই নিয়েলকাও কিশোর বয়সে নাৎসিদের দ্বারা বাধ্য হয়েছিলো আউশউইৎজে সার্ভ করতে।

রাডম্যান একটা মারাত্মক উপলব্ধিতে পৌঁছায়, হলোকাস্ট শুধুই হিটলার আর কিছু ফ্যানাটিকাল জার্মানের দায় নয়, কথিত ‘সাধারণ জার্মানদের’ ইনডিফরেন্স আর কমপ্লিসিটিই একটু একটু করে তৈরি করেছিলো ডাচাউ-ফ্লোজেনবার্গ-রাভেন্সব্রুকের রাস্তা।

সে বাউয়েরকে বলে, তার বাবাও নাৎসি ছিলো! বাউয়ের বলেন, তো, তুমি কী আশা করছিলে? এরপর বাউয়ের বলেন, তুমি যদি মনে করো এই অনুসন্ধান কে অপরাধী ছিলো আর কে নিরপরাধ ছিলো সেটা খুঁজে বের করার জন্য, তাহলে তুমি ন্যায়বিচারের মর্মার্থটাই বোঝো না।

মোশাদের এজেন্টরা আইখম্যানকে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরণ করেছিলো। তাকে গ্রেপ্তার করে জেরুজালেমে নিয়ে গিয়েছিলো তারা। সে একমাত্র নাৎসি, যার বিচার হয়েছিলো ইজরায়েলে। ধূর্ত ম্যাঙ্গেলাকে অবশ্য কোনোভাবেই আর ধরা যায় নি। ১৯৭৯তে ব্রাজিলে সে এক দুর্ঘটনায় মারা যায়, স্বাভাবিক মৃত্যু তাঁকে বাঁচিয়ে দেয় বিচারের সম্মুখীন হওয়ার হাত থেকে। রাডম্যানের চরিত্রটা কয়েকটা বাস্তব চরিত্রের মিশেলে গড়া। ফ্রিৎজ বাউয়ের আর টমাস নিয়েলকার চরিত্রগুলো বাস্তব।

১৯৬৩এর ২০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৫র ১৯ আগস্ট, এই সময়কালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে ফ্রাঙ্কফুর্ট আউশউইৎজ ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ কারণে এই ট্রায়ালের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। যুদ্ধের পরপরই নুরেমবার্গের আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে প্রথম সারির নাৎসি ওয়ার ক্রিমিনালদের বিচার হয়েছিলো। কিন্তু সেই বিচারের উদ্যোগ নিয়েছিলো যুদ্ধকালীন মিত্রপক্ষ। ফ্রাঙ্কফুর্ট আউশউইৎজ ট্রায়াল ছিলো প্রথম বিচার, যাতে জার্মানির আদালতে জার্মান আইনে জার্মান ওয়ার ক্রিমিনালদের বিচার হয়েছে। এই ট্রায়াল দেশটির ইতিহাসের একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিলো, একইসাথে ছিলো একটি জাতির আত্মসমীক্ষণও। এরপর আর কখনোই জার্মানির পক্ষে নাৎসি হলোকাস্টের নৃশংসতার দায় এড়ানো সম্ভব হয় নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *