যে-উপন্যাসটা শেষ করতে আমার দশ বছর লেগেছে

মার্কেজ যে-বয়সে সিয়েন আনিয়োস দে সোলেদাদ লিখতে শুরু করেন, ১৬ বছর বয়সে (চৌধুরী, ২০১৭ঃ৩০), প্রায় সে-বয়সেই আমি একটা ইশকুলের লাইব্রেরিতে বসে তখনো-না-চেনা জনৈক গোলাম হোসেন হাবীবের তর্জমায় পড়া শুরু করি নিঃসঙ্গতার একশ বছর। আমার এক বন্ধু উপন্যাসটা পড়তে উসকানি দিয়েছিলো, আমাদের সেই বয়সে, যখন লেখক বলতে বোঝায় আহমেদ ইকবাল ভাইয়েদেরকে। এর বাইরে একটু আকটু সেবা, বা বিসাকে। আমি কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে প্রচণ্ড বিরক্ত হই, মাথা ধরে যায়, এবং একসময় আমি পড়া বন্ধ করে দেই। এরপর বহুদিন চলে যায়, আমিও ছফা আজাদ তসলিমাদের কাছে চলে যাই, এবং বেশ কিছুকাল তাঁদের অনুরাগী হয়ে থাকি। একসময় সেই অনুরাগও নানাকারণে ফিকে হয়ে আসে। এর মধ্যেই একদিন আমি চলে আসি রাজধানীতে, মফস্বলে-বেড়ে-ওঠা এক তরুণ, সম্মুখীন হয় আজিজ মার্কেটের দোকান ভর্তি বিস্ময়ের।
 
 
এবার আমি নতুন করে মার্কেজকে আবিষ্কার করি, ততোদিনে নিঃসঙ্গতার একশ বছরের নতুন সংস্করণ বেরিয়ে গেছে, নান্দনিক থেকে। কিন্তু নান্দনিকের প্রচ্ছদটা আমার পছন্দ হয় না। তারপরও কিনে ফেলি। এরও অনেক বছর পর কিনি বাতিঘরের সংস্করণটা। সুবর্ণ জয়ন্তী সংস্করণ। এটাই একমাত্র বই কিনেছি যার একাধিক সংস্করণ। এ-ছাড়া গ্রেগরি রাবাসা যে-অসামান্য ইংরেজি তর্জমাটা করেছিলেন, সেটা উপহার পাই এক বন্ধুর বন্ধুর কাছ থেকে, এক জন্মদিনে।
 
 
এই উপন্যাসটা আমি অসংখ্যবার পড়তে শুরু করেছি, শেষ করতে পারি নি, যেখানে থেমে গেছিলাম, সেখান থেকে না করে, আবার, শুরু থেকে শুরু করেছি, শেষ করতে পারি নি। তুর্কিদের সড়কে যেনো ঘুরে বেড়িয়েছি দিকভ্রান্তের মতো, আমার দিকে তাকিয়ে স্রেফ হেসেছে মেলকিয়াদেস। একটা অসমাপ্ত উপন্যাস ঘাড়ে নিয়ে ঘুরেছি বহুবছর।
 
 
আমি বুয়েন্দিয়া পরিবারের এক সদস্য হয়ে গেছি, যে সবাইকে দেখে, কিন্তু যাকে পরিবারের কেউ দেখতে পায় না। মাকোন্দোর অনিদ্রাঅসুখে আক্রান্ত হয়ে আমিও নির্ঘুম থেকেছি। উরসুলা ইগুয়ারানকে দেখেছি দক্ষ হাতে সংসার সামলাতে, যেভাবে মায়েরা সামলায়, দুনিয়ার বিভিন্ন কোণায়। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সাথে আবিষ্কার করেছি সেই সমস্ত কিছু, পৃথিবীতে যা বহু আগেই আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। রেমেদিওস মসকোত আমার ভেতরে সে-যন্ত্রণা তৈরি করেছে, ভালোবাসা মেশানো যন্ত্রণা, যা জুতোয় পাথরকুচি আটকে গেলে তৈরি হয়। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার বত্রিশটা বিদ্রোহেই অংশ নিয়েছি, দেখেছি তাঁকে এর সবকটিতে হেরে যেতে, আমিও হয়েছি যে-পরাজয়ের অংশীদার। হোসে আর্কাদিওতে দেখেছি পালিয়ে যেতে জিপসিদের সাথে, পরে ফিরে এসে বিয়ে করতে রেবেকাকে, এবং সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে। আমারান্তা আর রেবেকাকে দেখেছে পরস্পরকে ঘৃণা করতে, কয়েক দশক ধরে, এই ঘৃণার বন্ধন ভালোবাসার চেয়েও অটুট ছিলো। পিয়েত্রো ক্রেসপি হাত কেটে ফেলেছিলো আমারান্তার অকারণ প্রত্যাখ্যানে; এ-করুণদৃশ্যে জীবনানন্দকে মনে পড়ে গেছে আমার; যিনি ভালোবেসে, ঘৃণা করে, অবহেলা করে দেখেছিলেন মেয়েমানুষেরে এবং মেয়েমানুষ যাকে বারেবারে উপেক্ষা করে, ঘৃণা করে চলে গেছে। পিলার তারনেরা হাত দেখে আমার ভবিষ্যৎ জানিয়েছে, আর পেত্রা কোতেসের ভেতর দেখেছি সতী নারীর সর্বনাশ করা প্রবাদপ্রতিম উপপত্নীটিকে। কসাই কাপ্তান যখন বৃষ্টির ভেতরে গুলি করে আর্কাদিওকে, আবার শরীরও ভিজে গেছে তার সাথে, পানিতে ও রক্তে। ফারনান্দা দেল কার্পিওর রক্ষণশীলতা দেখে মজা পেয়েছি, অবাক হয়েছি সুন্দরী রেমেদিউসের সশরীরে স্বর্গারোহণে। রেনাতা রেমেদিওস আমাকেই চুমু খেয়েছে অন্ধকার ছবিঘরে, তারপর ধরা পড়েছে, আর আমি মরে গেছি মাউরিসিও বাবিলনিয়া হয়ে। আমারান্তা উরসুলা আর আউরেলিয়ানো বাবিলনিয়ার যে-পাপ, আমি তার সাক্ষী ছিলাম স্বর্গোদ্যানের সাপটির মতো। কলা কোম্পানির পক্ষে সেনাবাহিনী যে-গণহত্যা চালিয়েছিলো নিরস্ত্র শ্রমজীবী মানুষদের ওপর, আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম, হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর মতো আমিও নিশ্চিত ছিলাম ওখানে তিন হাজারেরও বেশি লোক ছিলো। সবশেষে মাকোন্দো যখন উবে গেলো বাতাসের সাথে, আমার অস্তিত্বের একটা অংশকেও হারিয়ে ফেলেছি, যেমনটা হারায় উপনিবেশের লোকেরা। পাঠশেষে একটা অনুভুতিই অবশিষ্ট ছিলো – নিঃসঙ্গতা।
 
 
শেষ পর্যন্ত আমি উপন্যাসটা শেষ করতে পেরেছি। তবে তাতে দশ বছর লেগে গেছে আমার। আসলে আমি উপন্যাসটা জীবনভর পড়ে যেতে পারতাম, ক্লান্ত না হয়ে, একটা জীবন পার করে দিতাম এটা পড়েই।
 
 
কোনো লেখকই হাওয়া থেকে সৃষ্টি করেন না। মার্কেজও করেন নি। মাকোন্দোর অনুপ্রেরণা আরাকাতাকা নামের এক বাস্তব গ্রাম। ছোটবেলায় মার্কেজ তাঁর নানার কাছে যে-সব গল্প শুনতেন, সে-সব গল্পের ছাপ আছে এ-উপন্যাসে। যে-খালাকে ভাবতেন এক অদ্ভূত মহিলা, অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে বলার তাঁর যে-সামর্থ্য, তা মূলে আছে উপন্যাসটির যাদুবাস্তবতার (চৌধুরী, ২০১৭ঃ ১৬-১৯)। কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া চরিত্রটিও যে অনেকাংশেই সাইমন বলিভার দ্বারা প্রভাবিত, লাতিন আমেরিকার ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা আছে, এমন যে কেউ সেটা সহজেই ধরে ফেলতে পারবেন ফুটনোটের সাহায্য ছাড়াই। কলা কোম্পানির গণহত্যার ঘটনাটি ঐতিহাসিক সত্য, বাস্তবে কোম্পানিটির নাম ছিলো ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি (চৌধুরী, ২০১৭ঃ ২৬-২৯)।
 
 
কিন্তু এইসব যদি জানা না থাকতো আমার? যদি না জানতাম এ-উপন্যাসের বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত? তাহলে কি নিঃসঙ্গতা আমাকে গ্রাস করতো না? এখানেই মনে হয় লেখক হিসেবে মার্কেজের স্বার্থকতা। কিছু না জেনেও যদি কেউ পড়ে উপন্যাসটি, প্রভাব খুব একটা ভিন্নরকম হবে না, অনুভূতি একই থাকবে তাঁর। কালোত্তীর্ণ প্রতিটি রচনা পেরিয়ে যায় স্থানকালের সীমা। দুনিয়ায় যতোদিন মানুষ থাকবে, ততোদিন মানুষের ছায়া হয়ে থাকবে তাঁর নিঃসঙ্গতা, আর প্রাসঙ্গিক থাকবে নিঃসঙ্গতার একশ বছর।
 
 
তথ্যসূত্র
চৌধুরী, রফিক-উম-মুনীর (২০১৭) মারিয়ো বার্গাস ইয়োসার মুখোমুখি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, ঢাকাঃসংবেদ, ২০১৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *