//১৯৮৭ : দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে গণতান্ত্রিক হয়ে উঠলো

১৯৮৭ : দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে গণতান্ত্রিক হয়ে উঠলো

আলোকচিত্র আইএমডিবি

১৯৮৭, দক্ষিণ কোরিয়া।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাশিস্তদের পরাজয়ের কারণে কোরিয়ায় কয়েক দশকের জাপানি উপনিবেশবাদের পতন ঘটলেও উপদ্বীপটিতে সহসা শান্তি আসে নি। পুঁজিবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে-স্নায়ুযুদ্ধ চলছিলো, কোরিয়ায় তা বাস্তব যুদ্ধের রূপ নেয়। ফল ৩৮তম সমান্তরালের দুই দিকে দুটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া, উত্তরে সোভিয়েতপন্থী ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অফ কোরিয়া (ডিপিআরকে, উত্তর কোরিয়া হিসেবে পরিচিত), আর দক্ষিণে মার্কিনপন্থী রিপাবলিক অফ কোরিয়া (আরওকে, দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে পরিচিত)।

১৯৫৩তে দুই পক্ষের ভেতর যুদ্ধবিরতি সাক্ষরিত হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোরীয় যুদ্ধের পরিসমাপ্তি কখনোই ঘোষিত হয় নি, অর্থাৎ টেকনিক্যালি, কোরীয় যুদ্ধ এখনো চলছে। কিন্তু, কার্যত, যুদ্ধটা আসলে ১৯৫৩তেই থেমে গেছিলো। অন্তত অধিকাংশের জন্য।

ওয়েল, অধিকাংশের জন্য, তবে সবার জন্য নয়।

১৯৮৭র দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্ষমতায় ছিলো সামরিক স্বৈরতন্ত্রীরা। এদের অধীনে কাজ করতো তথাকথিত এন্টি-কমিউনিস্টরা, যাদের কাজ ছিলো ‘উত্তর কোরিয়ার গুপ্তচর’ ধরা। তবে এটা তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য, আসল উদ্দেশ্য ছিলো, শাসকদের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত যে-কাউকে ‘কমি’ বানিয়ে ফেলে দেয়া।

সেদিনের দক্ষিণ কোরিয়ায় কেউ আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা, ও মানবাধিকারের মতো মৌলিক গণতান্ত্রিক দাবিদাওয়া তুললেও তাঁকে ‘কমি’ বানিয়ে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো এবং তার সাথে যে-কোনো ধরণের আচরণ বৈধ করা হতো। এন্টি-কমিউনিস্টরা নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক দাবি করতো, আর সর্বত্র দেখতে পেতো ‘কিম ইল সুং-এর ষড়যন্ত্র’। যদিও তারা ফ্যাশিস্ত ছাড়া ছিলো না কিছুই, কমি ঠেকানোর নামে, স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রাখাটাই ছিলো তাদের সত্যিকার অভিপ্রায়।

সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এসএনইউ) ভাষাতত্ত্বের ছাত্র পার্ক জং-শুলকে এই এন্টি-কমিউনিস্ট অফিসাররা ধরে নিয়ে গেছিলো ক্যাম্পাসের এক র‍্যাডিকাল নেতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। এটা জানা কথা যে এই ধরণের জিজ্ঞাসাবাদে বলপ্রয়োগ করা হয়, কিন্তু অফিসাররা সেদিন একটা ভুল করে ফেলে, উত্তেজনার বশে বলপ্রয়োগের আইন-অনুমোদিত মাত্রা অতিক্রম করে জং-শুলকে মেরে ফেলে। যখন বুঝতে পারে টর্চার করে মেরে ফেলে কতো বড়ো ভুল করেছে, তখন সেটাকে ধামাচাপা দেয়ার প্রচেষ্টা চালায়।

সামরিক স্বৈরতন্ত্রীরা তখন দেশটিকে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ চালাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার মতো সবকিছুর ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানা না থাকলেও সিভিলিয়ান পরিসরে ব্যাপক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় আছে। উন্নয়ন আর কমিদের হাত থেকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার ধোঁয়া তুলে এই ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণকে জাস্টিফাই করা হয়েছে।

গণতন্ত্রের জন্য খুব দুর্বল একটা আন্দোলন চলছে, দমনপীড়ন করে যা দাবিয়ে রাখা হয়েছে।

সাংবাদিকরা আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন, তবে পত্রিকাগুলো রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে কী লিখতে পারবে, সে-ব্যাপারে তাদেরকে মিলিটারির দিকনির্দেশনা মেনে চলতে হয়। ডাক্তাররা আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন, তবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর হাতে কেউ মারা গেলে মেডিকেল প্রতিবেদনে কী লিখবে হবে, সেটা মিলিটারি ঠিক করে দেয়। আইনজীবী-বিচারকরাও আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন, তবে কোন কেইস কীভাবে ডিল করতে হবে আর কাকে কী ধরণের আইনী অনুমতি দিতে হবে, সেটাও মিলিটারি নির্ধারণ করে দেয়া।

পার্ক জং-শুলের ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলো। সরকারি প্রজিকিউটর অটোপসি করার আগে শবদেহ সৎকারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালেন, সরকারকে বাধ্য করলেন আইন মেনে চলতে। গা বাঁচাতে পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে বললো ছাত্রটি জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন সময়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে। সাংবাদিকরা এই প্রেসনোট মুখস্ত করতে অস্বীকৃতি জানালেন, গোপনে ছাত্রমৃত্যুর আসল কারণ খুঁজতে লাগলেন। মিলিটারি একটা পত্রিকা অফিসে ঢুকে সবাইকে পেটালো, তারপরও সম্পাদকরা বললেন, ভয়ের কাছে আর তারা পরাজিত হবেন না। ডাক্তার বললেন, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কারণে নয়, ছেলেটার ফুসফুসে প্রচুর পানি ঢোকার কারণে সে মারা গেছে। একটি মৃত্যু যেনো ঘুমন্ত জনপদটিকে জাগিয়ে তুললো।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরেও তখন ব্যাপক আলোড়ন চলছে। নিয়মিত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আর নিরাপত্তা বাহিনীর অনেকে বিরক্ত এই তথাকথিত এন্টিকমিউনিস্টদের কর্মকাণ্ডে। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই গণতন্ত্রকামী ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল। পেটের দায়ে প্রকাশ্যে আন্দোলনে নামতে পারে না। কিন্তু গোপনে গণতন্ত্রকামীদেরকে নানা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। খোদ ব্যবস্থার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা। বেরিয়ে আসার জন্য একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছে।

পার্ক জং-শুলের মৃত্যু সেই সুযোগটা এনে দিলো।

ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গও গণতন্ত্রের জন্য লড়াকুদের পক্ষ নিলেন। সামরিক স্বৈরতন্ত্রীদের কাছে বিকোতে তাদের বিবেকে বাঁধলো। জং-শুলের মৃত্যুর আসল কারণ শেষ পর্যন্ত প্রচারিত হলো একটা চার্চ থেকে, মুহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে গেলো ও ক্ষুব্ধ করে তুললো জনসাধারণকে, খুনীদেরকে বিচারের আওতায় আনতে বাধ্য হল রাষ্ট্র।

এরপর যা হল, ইতিহাসে তা জুন ডেমোক্রেটিক আপরাজিং নামে খ্যাত, যা দক্ষিণ কোরিয়ার ষষ্ঠ লোকতন্ত্রের পত্তন ঘটায়। অতীতের কয়েকটা লোকতন্ত্র নামকাওয়াস্তে গণতান্ত্রিক, আদতে বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রী হলেও, এই প্রথমবারের মতো সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশটি আর কখনোই পিছু ফিরে তাকায় নি।

এই বাস্তব ঘটনা অবলম্বনেই নির্মিত দক্ষিণ কোরীয় মুভি ১৯৮৭ ওয়েন দা ডে কামস।

গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের এই সিনেমাটি দেখা উচিত।

Please follow and like us: