//মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে খোলা চিঠি

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে খোলা চিঠি

আলোকচিত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফেসবুক পেইজ

জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন আছে। আমার মতো অতি নগণ্য একজন মানুষ, দেয়ার মতো তেমন কোনো পরিচয় যার নেই, তার কথা আপনার কাছে পৌঁছুনোর কোনো কারণও নেই। আপনি সম্ভবত আমার এই লেখা পড়বেন না, তারপরও লিখছি, লিখতে আমি বাধ্য হচ্ছি।

আপনি মরহুম আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার শিষ্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আওয়ামিকরণ বহু আগে সম্পন্ন হয়েছে। তাই আওয়ামি বলয় এবং এমনকি মস্কোপন্থীদের বাইরেও চিনপন্থীদের একটা অংশ যে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এটা অনেকেই জানে না।

তাই এরা জিজ্ঞেস করে, “কোন সেক্টরে ছিলেন?”

এটা শুধু আওয়ামি লিগের দোষ না আসলে। ইতিহাসের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আপামর বামপন্থীদের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার খেসারত বাংলাদেশের বামপন্থীরা অতীতে দিয়েছে, আমার ধারণা ভবিষ্যতেও দেবে, আরো বহুদিন।

আমি সাংবাদিক আহমেদ মূসার ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সূচনাপর্বঃ ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামি লিগ’ পড়েছি। আলতাফ পারভেজের ‘ইতিহাসের পুনর্পাঠঃ মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী’ পড়েছি। মহিউদ্দিন আহমদের ‘বিএনপি সময়-অসময়’ পড়েছি।

ফলে আপনি কেনো জিয়াউর রহমান সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সহকারী হয়েছিলেন আর এরশাদশাহির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় কেনো বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন, এইসব প্রশ্ন আমি তুলবো না। আওয়ামি লিগ নিয়ে আমার কোনো অবসেশন নাই। ২০০৮এর দিকে ছিলো, দশ বছরে সেই সবকিছু ধুয়ে মুছে গেছে, বয়সের সাথে মানুষের চিন্তাভাবনায় তো পরিবর্তন আসে!

আমি মনে করি, ২০১৪ থেকে আওয়ামি লিগ সরকার যে নজিরবিহীন ফ্যাসিজমের রাজত্ব কায়েম করেছে, সেটার অবসান দরকার।

শক্তির বিচারে এই মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়া আর কারো সেটা করার সামর্থ্য নেই।

কিন্তু কামাল সাহেব ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় যে-সাক্ষাৎকারটি দিলেন, প্রথম আলোও দেখলাম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাত দিয়ে ছাপিয়েছে, সেটা পড়ে আমি অবাক হয়েছি। তাঁর ভাষ্যমতে, আপনি তাঁর কাছে একটি ফ্রন্টের প্রস্তাব নিয়ে গেছিলেন, এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি রাজি হয়েছিলেন। তবে তিনি আপনাকে একটা শর্ত দিয়েছিলেন, জামায়াতে ইসলামিকে এই ফ্রন্টে রাখা যাবে না।

আপনারা ঐক্যফ্রন্ট করলেন, নিশ্চয়ই শর্ত মেনে নিয়েই। আবার বিশদলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামীকেও সাথে রাখলেন। তারপর যখন দেখা গেলো জামায়াতের নিবন্ধন নাই, তখন তাদেরকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ দেয়া হল।

এর মানে কী?

আপনি আমার চেয়ে অনেক ভালো করেই জানেন, ১৯৭১এ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা কী ছিলো। ইন্দোনেশিয়ার ১৯৬৫র গণহত্যায় নাহদলাতুল উলামার ছাত্র সংগঠন পেমুদা আনসরের ভূমিকা ছিলো, কিন্তু ২০০০এ তাঁদের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুর রাহমান ওয়াহিদ প্রকাশ্যে ও আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ভূমিকার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা আজ পর্যন্ত ১৯৭১এ তারা যে ভূমিকা রেখেছিলেন সে-জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চান নাই।

১৯৭১এর কথা যদি বাদও দেই, তাহলেও জামায়াতে ইসলামি যে ইসলামের লেবাসের আড়ালে ফ্যাসিস্ট রাজনীতির চর্চা করে, শুধু সেই কারণে কি তাদেরকে নিয়ে আওয়ামি ফ্যাসিজমের বিরোধিতা করা যায়? এক ফ্যাসিজম দিয়ে আরেক ফ্যাসিজম ঠেকানো যায়? এইটা কি সম্ভব?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের লোকজন সারা দেশে মার খাচ্ছেন। এই মাত্রায় নির্বাচনী সহিংসতা বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব। আপনাদের প্রতি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের সহানুভূতি আছে।

জামায়াতে ইসলামির ভোট ৫ শতাংশও না, তাদেরকে ছাড়াই আপনারা জিততে পারবেন, ট্রাস্ট মি।

জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন আছে। এখনো সময় আছে। এলিভেন্থ আওয়ারেও মানুষ ক্রুশিয়াল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অনুরোধ করছি, আপনি কামাল সাহেবের সাথে বসেন। জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে একটা বোল্ড ডিসিশন নেন। খোদ আপনার দলেই এমন বহু তরুণ আছেন, যাঁরা সর্বান্তঃকরণে জামায়াতবিরোধী, আমি নিশ্চিত আপনি তাঁদের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। আমি এই দেশের অতি সাধারণ একজন তরুণ, একজন সিনিয়র সিটিজেনের কাছে অনুরোধ করছি, আমার এই অনুরোধটা রাখেন।

বিনীত,
মুহাম্মদ ইরফানুর রহমান

Please follow and like us: