//যেই লোকটার কথা সুবর্ণগ্রামের মানুষেরা ভুলে যাবে

যেই লোকটার কথা সুবর্ণগ্রামের মানুষেরা ভুলে যাবে

আলোকচিত্র লেখকের নিজস্ব (প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে)

সেই লোকটার কথা সুবর্ণগ্রামের মানুষেরা ভুলে যাবে। যে অল্পবয়সে পরিবারের সাথেই রেলওয়ে কলোনিতে থাকতো, একটু বড়ো হতেই যে এই গ্রামে এসেছিলো, অবশ্য আসার ইচ্ছে ছিলো না যার এতোটুকুও। বন্ধুবান্ধব ছেড়ে আসতে কি কারো ভালো লাগে?

অলীক অক্ষরে সুবর্ণগ্রামের বাতাসে কেউ লিখে রেখেছিলো, কে জানি না, ছেলেটা কিশোর বয়সে ভীষণ একটা আঘাত পেয়েছিলো। অন্যের অন্যায়ের জন্য শাস্তি পাওয়ার ব্যাপারটা মর্মান্তিক, বিশেষত সেই অন্য যদি নিজের নিকটজন হয়, তখন মাথার সমস্ত রক্ত এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু তা লেখা হয়েছিলো অলীক অক্ষরে, সুতরাং, এ-ব্যাপারে আর কথা না বাড়ালেই ভালো হবে।

সুবর্ণগ্রামের মানুষেরা অবশ্য এই ঘটনাটাও ভুলে যাবে, ছেলেটা ফজরের আজান দিয়ে গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙাতো, আর সেই মায়াজড়ানো কণ্ঠের কথাও ভুলে যাবে।

তার ধর্মনিষ্ঠা দেখে সবার তাক লেগে গেছিলো, সেই ঘোর কাটতে অবশ্য সময় লাগে নি, যখন সে মাতামাতি শুরু করলো রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে। উঠতে রবীন্দ্রনাথের গান, বসতে, শুতে, খেতে, ঘুমাতে। যেনো রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারো গান নেই, এক একটা গান গ্রামবাসীর মুখস্ত হয়ে গেলো, একশ বার করে শুনলে হবে না কেনো?

সুবর্ণগ্রামের লোকদের কারোরই কিন্তু মনে থাকবে না, দশ গ্রামে এমন ছেলে আর ছিলো না, যেমন দেখতে শুনতে ভালো তেমনি তার ব্যবহার।

সেই ছেলে আস্তে আস্তে কেমন হয়ে গেলো!

প্রেমে ব্যর্থ হওয়াটা একেবারেই অসাধারণ কিছু না, কিন্তু, প্রেম না করেই ব্যর্থ হওয়াটা অসাধারণ ব্যাপার। এক মেয়ে তার মাথা খারাপ করে দিয়েছিলো, কিছু করে নি, দেখেই সে সেই মেয়ের প্রেমে পড়ে গেছিলো। প্রথমবার আই.এ ফেল করে মন খারাপ হয়েছিলো, বড়ো ভাইয়ের বৌ বললো আরেকবার পরীক্ষা দাও, রেজাল্ট যাই হোক বিয়ে করার জন্য অন্তত সার্টিফিকেটটা তো লাগবে! টেবিলের বই টেবিলে, সে মনের সুখে প্রেমের কবিতা লিখতে লাগলো, সবই মেয়েটাকে নিয়ে। কবিতা লিখে জগতে কিছুই পাওয়া যায় না, প্রেম তো না-ই, পরীক্ষার নম্বরও না। অতএব আবারো ফেল। মজার ব্যাপার সেই মেয়ে জানেই না ব্যাপারটা, অর্থাৎ ছেলে মনের সুখে কবিতা লিখে যাচ্ছে, যাকে নিয়ে লিখছে তার সাথে বিনা যোগাযোগে।

মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলো এক সৈনিকের সাথে, ট্রেনে করে স্বামীর সাথে কুমিল্লার দিকে যাচ্ছিলো, ইস্টিশন থেকে বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় প্রিয়তমাকে লাল টুকটুকে শাড়িতে দেখে ছেলের মাথা আরো খারাপ হয়ে গেলো। বাড়িতে ফিরে মনের আঁশ মিটিয়ে গালিগালাজ করলো। কাকে সেটা অবশ্য ঠিক বোঝা গেলো না।

সুবর্ণপুরের লোকেরা ভুলে যাবে ছেলেটা ছিলো জিনিয়াস, মানে সে ভাবতো সে একজন জিনিয়াস ছিলো, আমরা অবশ্য এই ব্যাপারে ঠিক নিশ্চিত নই। সে সিদ্ধান্তে এসেছিলো পড়াশোনা সাধারণ মানুষের জন্য, সে অসাধারণ মানুষ, রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল কি পড়াশোনা শেষ করেছিলো? সেও করবে না! বাংলা সিনেমা দেখে দেখে সে বড়ো হয়েছে, “এক মুঠো ভাতের” সমস্ত সংলাপ তার মুখস্ত, সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে নায়ক হবে। জাহান্নামে গেলো পড়াশোনা, চট্টগ্রামে গেলো সে, তার ধারণা দুনিয়া অপেক্ষা করছে তার জন্য। বছরের পর বছর সে দৌড়াতে লাগলো বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রামকেন্দ্রের নানান ধরণের লোকজনের পেছনে, জাস্ট একটা চান্স, একটা চান্স পেলে সে দেখিয়ে দেবে সবাইকে। মাঝখানে ঢাকায় একবার একটা অসাধারণ সুযোগ পেয়েছিলো, জাহিদ হাসানের সাথে হাসিমুখে একটা ছবি তোলার, যদিও তাকে নায়ক বানাতে পারবে কিনা এটা নিয়ে জাহিদ তার সাথে কথা বলতে পারেন নি ব্যস্ততার কারণে।

এই সব লোকজনের ক্ষেত্রে যা হয় সাধারণত, মানুষ মাথায় কাঁঠাল ভেঙে সমানে খেতে থাকলো, খাওয়ারই তো কথা।

বিটিভিতে সেই সময় হতো কিছু অদ্ভূত অনুষ্ঠান, অসংখ্য শিশু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কেনো জানি মাথা একবার ডানদিকে দোলাতে আর একবার বামদিকে, গুণগুণ করে তারা প্রদর্শন করতো তাদের প্রতিভা। এইসব সৃষ্টিশীল শিশু ভাড়া করে আনা লাগতো, যার আনার কথা সে ছেলেটাকে দিয়ে আনাতো, হাতে যেই টাকা ধরিয়ে দিতো তা সে যা পেতো তার শতভাগের এক ভাগ। অসম্ভব আশাবাদ তার, একটা না একটা সৃষ্টিশীলতাকে সে আবিষ্কার করবেই, আর এর পরেই তার জীবন বদলে যাবে। চট্টগ্রাম শহরে এমন কোনো বাড়ি সম্ভবত আর অবশিষ্ট ছিলো না যেখানে সে সৃষ্টিশীলতার খোঁজে পা ফেলে নি। কিন্তু ব্যাপার না, একটা চান্স পেলে দেখিয়ে দেবে সে সবাইকে, জাস্ট একটা চান্স। কুমিল্লা থেকে সারা রাত বাস জার্নি করে ভোরবেলা সে উত্তরায় এলো, একবার, ছোট ভাইয়ের বাসায়। একটা নাটকে নাকি পার্ট করার সুযোগ পেয়েছে, চার দিনের দিন ভাইকে নিয়ে শুটিংয়ে গেলো, সব দেখে শুনে ভাইয়ের মাথায় রক্ত উঠলো।

যৌতুক বিরোধী নাটিকা, নাটকের প্রযোজক আর পরিচালক সম্ভবত ভিনগ্রহের প্রাণী, নায়কের চরিত্রে নয়, সাধারণ চরিত্র নয়, নাটকের শেষে যে যাত্রার বিবেকের মতো কোত্থেকে যেনো চলে এসে দৃপ্ত শপথ ঘোষণা করে যৌতুকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের, এমনকিও সেও নয়, তাহলে পার্টটা কি?

নাটকের শেষে যখন সেই যাত্রার বিবেক আসে, তখন পেছন থেকে কিছু লোক হঠাৎ হাজির হয়ে পুতুলের মতো ‘না! না!! না!!!’ বলে চিৎকার করে ওঠে, সেই পার্টটা করেছে।

এসব কিছুই সুবর্ণগ্রামের মানুষদের মনে থাকবে না। এমনকি এটাও মনে থাকবে না শেষবার কিছু টাকার জন্য ছেলেটা ফিরে এসেছিলো গ্রামে, ঢিল ছুঁড়ে মারছিলো নিজেদের বাড়ির টিনের চালে, নিজের মাকে খুন করার জন্য তাড়া করেছিলো একটা ধারালো বটনি হাতে। তার ভাইয়েরা মিলে অবশ্য তাকে বেঁধে ফেলেছিলো। ছোট দুই ভাইয়ের হাতে সে মার খেয়েছিলো। ইতিহাসে সব বড়ো বড়ো ঘটনা নাকি দুইবার ঘটে এবং প্রথম ঘটনাটা ট্রাজেডি ও দ্বিতীয় ঘটনাটা ফার্স হয়। বড়ো ভাইয়ের বৌ এসে বাঁধন খুলে দেওয়ায় সে পালিয়ে গেছিলো। সুবর্ণগ্রামের মানুষেরা চুক চুক করতে পছন্দ করতো, চুক চুক করে মানুষের জন্য দুঃখ প্রকাশ, বড়ো ভালো লাগে।

“আহারে, ইশ, কী ছেলে কি হয়ে গেলো!”

না, ছেলেটা আসলেই ভালো ছিলো, কথা সত্য।

অনেক বছর পরে নিম্মি যখন বড়ো হবে, মাস্টার্স করার জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে, কোটবাড়ি থেকে ফেরার সময় একটা পাগলকে দেখবে। একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে, গায়ে খয়েরী রঙের রঙ জ্বলে যাওয়া একটা ময়লা কোট আর মুখ ভর্তি দাঁড়ি, কেমন করে যেনো চারপাশে তাকাচ্ছে আর হাসছে। আর তখন একটা অবাক করা ঘটনা ঘটবে, নিম্মির বারবার ইচ্ছা করবে পেছনে ফিরে তাকাতে, কেনো জানি পাগলটার জন্য খুব মায়া লাগবে। ইচ্ছে করবে গিয়ে দুটো পয়সা দিয়ে আসতে, কিন্তু, “যদি কামড়ে দেয়?” এই ভয়ে সে পাগলটার কাছে যাবে না। পাগলটার কথা ভেবে তার খুব কান্না পাবে এবং এ-আবেগের কারণ খুঁজে না পেয়ে সে খুবই বিস্মিত হবে, এর আগেও এই পাগলটাকে কোথায় যেনো দেখেছে, কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছে না বলেই নিজের ওপর রাগ হবে। সেদিন রাতে আরো একটা অবাক ঘটনা ঘটবে, রাতে ঘুমের মধ্যে সে একটা স্বপ্ন দেখবে, দেখবে সে তার ছোটো বেলায় ফিরে গেছে, তার সেই কাকাটা তার মাথায় হাত বুলিয়ে আর গাল টিপে আদর করে দিচ্ছে, ঠিক যেমন আসল ছোট বেলায় আদর করতো, যে একদিন সব কিছু থেকে হারিয়ে গেছিলো, এবং যার কথা সেও প্রায় ভুলেই গেছিলো। হঠাৎ করে নিম্মির স্বপ্নটা একটা কাঁচের গেলাশের মতো ভেঙে যাবে, ঘুম ভেঙে গেলে মানুষের ভীষণ খারাপ লাগে, সেই রাতে নিম্মি আর ঘুমোতে পারবে না…

১২ অক্টোবর ২০১৪

Please follow and like us: