//মানব প্রাগ্রসরতায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

মানব প্রাগ্রসরতায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

আলোকচিত্র গবেষকের নিজস্ব

Cato Institute একটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক পাবলিক পলিসি গবেষণা সংস্থা, HumanProgress.org যার একটি প্রকল্প। HumanProgress.orgএর একটি উদ্যোগ Your Life in Numbers। যে-কোনো সময়কালে সারা দুনিয়াতে বা কোনো দেশে কতোটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা ৬টি Indicator ব্যবহার করার মাধ্যমে এরা হিসেব করে, এসব Data ও Information থেকে সহজেই এক দেশের সাথে আরেক দেশের তুলনা করা যায়।

এই Indicatorগুলো হচ্ছেঃ জীবনপ্রত্যাশা (Life Expectancy), শিশু মৃত্যু হার (Child Mortality Rate), মাথাপিছু আয় (Income Per Person), খাদ্য সরবরাহ (Food Supply), গড় শিক্ষার বছর (Mean Years of Schooling), এবং গণতন্ত্রের সূচক (Index of Democracy)

১৯৯২ থেকে ২০১৫ – এই সময়কালে বাংলাদেশের অগ্রগতির সাথে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোর অগ্রগতির একটা তুলনা করে দেখলাম।

১। জীবনপ্রত্যাশা (Life Expectancy)

১৯৯২এ বাংলাদেশের মানুষের গড় জীবনপ্রত্যাশা ছিল ৫৯.৭ বছর, ২০১৫তে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছর, অগ্রগতির হার ২১%। মালদ্বীপ এ-ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কাছাকাছি, সেখানে হারটা ২২%। যুদ্ধবিধবস্ত দেশ আফগানিস্তানে এই অগ্রগতির হার ১৮%। ইন্ডিয়া এই ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে আছে, সেখানে এই অগ্রগতির হার ১৬%। পাকিস্তানের অবস্থা করুণ, সেখানে এই অগ্রগতির হার মাত্র ৯%। নেপালে এ-ক্ষেত্রে অগ্রগতির হার অনেক বেশিঃ ২৫%, তবে ভুটানের অগ্রগতি ইম্প্রেসিভ, সেখানে হারটা ২৯% যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। আরেক গৃহযুদ্ধে ছিন্নভিন্ন হওয়ায় দেশ শ্রীলঙ্কায় এই হার দক্ষিণ এশিয়ায় সবচে কম, মাত্র ৭%।

২। শিশু মৃত্যু হার (Child Mortality Rate)

১৯৯২এ বাংলাদেশে জন্মানো প্রতি ১০০০ শিশুর মধ্যে ৯২.১ জন মারা যেতো, ২০১৫তে এই শিশু মৃত্যু হার অনেক কমে এসে মাত্র ৩০.৭ জনে ঠেকেছে, অগ্রগতির হার ৬৭%। নেপাল এ-ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমান, সেখানেও হারটা ৬৭%। বাংলাদেশ আর নেপালের চেয়ে ভুটান এই ক্ষেত্রে সামান্য এগিয়ে আছে, সেখানে হারটা ৬৮%। যথাক্রমে আগ্রাসী যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের শিকার আফগানিস্তানে এই অগ্রগতির হার ৪২%, শ্রীলঙ্কায় ৫৪%। এ-ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ার অগ্রগতির হার মোটামুটি, ৫৫%। পাকিস্তানের অবস্থা এ-ক্ষেত্রেও করুণ, অগ্রগতির হার মাত্র ৩৬%। মালদ্বীপের সাফল্য এই ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয়, ১৯৯২এ যেখানে প্রতি ১০০০ শিশুতে ৬২.৫ জন মারা যেতো ২০১৫তে সেখানে প্রতি ১০০০ শিশুতে মাত্র ৭.৪ জন মারা যায়, অগ্রগতির হার ৮৮% যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

৩। মাথাপিছু আয় (Income Per Person)

১৯৯২এ বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ১,২২৪.২ ইউএস ডলার, ২০১৫য় সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,০৮৬ ইউএস ডলারে, অগ্রগতির হার ১৫২%। আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটান, আর মালদ্বীপের ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ১৯৯২এ ইন্ডিয়ার মানুষের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে সামান্যই বেশি ছিল ১৯১২.৯ ইউএস ডলার, ২০১৫ নাগাদ সেটা ২৩৯% হারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪৭৬.২ ডলারে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে অগ্রগতির হার ইন্ডিয়া আর বাংলাদেশের চেয়ে বেশ কম। ৫৭%। তবে ১৯৯২এই পাকিস্তানিদের মাথাপিছু আয় ছিল ৩৪১০.৮ ডলার যা ২০১৫য় বাংলাদেশিদের মাথাপিছু আয়ের চেয়ে বেশি। শ্রীলঙ্কানরা মাথাপিছু আয়ের বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ায় সবচে ধনী দেশের মানুষ, ১৯৯২এ ওদের মাথাপিছু আয় ছিল ৫৭০৪.৪ ইউএস ডলার যা ২০১৫ নাগাদ ১৮৭% বেড়ে ১০,৬০১ ইউএস ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

৪। খাদ্য সরবরাহ (Food Supply)

১৯৯২এ বাংলাদেশের মানুষের গড়ে খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ছিলো দৈনিক ২১১১ ক্যালোরি, ২০১৫তে এসে এটা মাত্র ১৬% বেড়ে দৈনিক ২৪৫০ ক্যালোরি হয়েছে। ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের অবস্থা এ-ক্ষেত্রে রীতিমতো শোচনীয়, দুই দেশেই খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ এই সময়কালে মাত্র ৫% হারে বেড়েছে, ইন্ডিয়ায় দৈনিক ২৩৩৩ ক্যালোরি থেকে দৈনিক ২৪৫৯ ক্যালোরি আর পাকিস্তানে ২৩২৫ ক্যালোরি থেকে ২৪৪০ ক্যালোরি। অর্থাৎ এই তিনটি দেশেই মাথাপিছু আয় উচ্চ হারে বৃদ্ধি পেলেও খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ সেই তুলনায় বাড়ে নি বললেই চলে। শ্রীলঙ্কায় এ-ক্ষেত্রে অগ্রগতির হার ১৮%, কিন্তু তাঁদের মাথাপিছু আয় এই সময়কালে অস্বাভাবিক রকমের উচু হারে বেড়েছে, সেই তুলনায় খাদ্য গ্রহণের পরিমাণের এই অতি সামান্য হারে বৃদ্ধিটা একেবারেই সন্তোষজনক নয়। মালদ্বীপে গড় খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ এই সময়কালে বাংলাদেশের সমান হারেই বেড়েছে, অর্থাৎ ১৬%। নেপাল এ-ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় এগিয়ে আছে, সেখানে এই সময়কালে অগ্রগতির হার ২০ শতাংশ। আফগানিস্তানে এই হার বাংলাদেশ, মালদ্বীপ আর নেপালের চেয়ে কম হলেও ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের চেয়ে ভালো করেছে তারা, অগ্রগতির হার ১১%।

৫। গড় শিক্ষার বছর (Mean Years of Schooling)

১৯৯২এ বাংলাদেশের মানুষ গড়ে মাত্র ৩.৪ বছর কাটাতো বিদ্যালয়ে, ২০১৫তে এটা ১০২% হারে বেড়ে ৬.৮ বছর হয়েছে। ইন্ডিয়ায় এই হার ৯৭%, আর পাকিস্তানে ৯০%। আফগানিস্তানে এই হার ১৩৭%, তবে ১৯৯২এ গড়ে মাত্র ২ বছর বিদ্যালয়ে কাটাতেন আগফানরা, তাই অগ্রগতির হার সন্তোষজনক হলেও ২০১৫তে সেটা ৪.৮ বছরের চেয়ে বেশি হতে পারে নি। নেপালে হারটা ১১৩%, তারাও ১৯৯২এ গড়ে মাত্র ২.৬ বছর কাটাতেন বিদ্যালয়ে, ২০১৫তে এসে সেটা ৫.৪ বছর হয়েছে। মালদ্বীপের ক্ষেত্রে যদি অগ্রগতির হার অপেক্ষাকৃত কম, মাত্র ৭৬%, কিন্তু ১৯৯২এই গড়ে ৪..৫ বছর বিদ্যালয়ে কাটাতেন মালদীভানরা আর ২০১৫তে এসে সেটা ৭.৬ বছর হয়েছে। ভুটানের ক্ষেত্রে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। শ্রীলঙ্কানদের অগ্রগতির হার সবচেয়ে কম, মাত্র ১৪%, এর কারণ হচ্ছে এ-ক্ষেত্রে আগেই তারা এতো অগ্রসর হয়ে গেছে যে নতুন করে অগ্রসর হওয়ার তেমন স্কোপ নাই; ১৯৯২এই তারা গড়ে ৮.৮ বছর কাটাতেন বিদ্যালয়ে, ২০১৫তে এসে সেটা ১০.১ বছর; ফলে, চোখ বুজে শ্রীলঙ্কাকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচে শিক্ষিত মানুষের দেশ বলা যায়।

৬। গণতন্ত্রের সুচক (Index of Democracy)

নোটঃ -১০ থেকে ১০এর স্কেলে হিসাব করা হয়, যার স্কোর যতো কম সে ততো স্বৈরতন্ত্রী, যার স্কোর যতো বেশি সে ততো গণতন্ত্রী।

এই সেকশনটা আফগানিস্তানকে দিয়ে শুরু করা যাক। ১৯৯২এ তাঁদের স্কোর ছিলো ০। ২০১৫তে তারা -১এ নেমেছে, অবনতি হয়েছে -৯%।

ইন্ডিয়ার স্কোর ১৯৯২এ ছিলো ৮, ২০১৫তে ৯, ৫% উন্নতি হয়েছে। পাকিস্তানের স্কোর ১৯৯২এ ছিলো ৮, ২০১৫তে ৭, -৫% অবনতি হয়েছে। অর্থাৎ এ-ক্ষেত্রে পাকিস্তান ঠিক ততোটাই পিছিয়ে গেছে যতোটা এগিয়ে গেছে ইন্ডিয়া।

নেপাল আর শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি এই ক্ষেত্রে আইডেন্টিকাল। ১৯৯২এ উভয়ের স্কোর ছিল ৫, ২০১৫তে উভয়ের স্কোর হয়েছে ৬। উন্নতির হার উভয়ের ক্ষেত্রে ৬%। মালদ্বীপের ক্ষেত্রে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

বাকি থাকল দুটো দেশঃ বাংলাদেশ আর ভুটান।

১৯৯২এ ভুটানের স্কোর ছিল -১০। ২০১৫তে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫। উন্নতির হার মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো, ১৫০০%।

১৯৯২এ বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬। ২০১৫তে এসে ১এ নেমে এসেছে। অবনতির হার -২৯%। ণতন্ত্রের সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়া আর মাত্র দুইটা দেশেরই অবনতি ঘটেছে, তার একটা পাকিস্তান, অন্যটা আফগানিস্তান। পাকিস্তানের অবনতি ঘটলেও তারা নেপাল আর শ্রীলঙ্কার চেয়ে সামান্য এগিয়েছে, পিছিয়ে আছে স্রেফ ভুটান আর ইন্ডিয়ার থেকে। বাংলাদেশ সামান্য এগিয়ে আছে স্রেফ আফগানিস্তান থেকে, যে-আফগানিস্তান যুদ্ধবিধবস্ত, সোভিয়েত আর মার্কিন আগ্রাসনে ছিন্নভিন্ন হওয়া দেশ। তাও ভালো, দেশটা এখনো আফগানিস্তান হয় নি!

*

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যা-তা অবস্থা বোঝা গেলো, কিন্তু অন্যান্য Indicatorএ যে-অগ্রগতিটুকু আসলেই হয়েছে, সেটাও এমন আহামরি কিছু নয়।

জীবনপ্রত্যাশার ক্ষেত্রে নেপাল-ভুটান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।

শিশু মৃত্যু হার হ্রাসে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে খুবই ভালো করেছে, কিন্তু সে-ক্ষেত্রেও মালদ্বীপ বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে।

ইন্ডিয়া-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মানুষের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশিদের চেয়ে অনেক বেশি, তবে খাদ্য গ্রহণ পরিমাণের ক্ষেত্রে তারাও আমাদের মতোই অতি সামান্যই অগ্রসর হয়েছে।

শিক্ষার ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য যে-কারো চেয়েই অনেক এগিয়ে আছে, মালদীভানরাও এ-ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।

*

এটা বাংলাদেশের তথাকথিত গণতান্ত্রিক আমলের একটা আমলনামা। এই সময়কালে বাংলাদেশ চালিয়েছে বিএনপি-জামাত জোট সরকার, আওয়ামি লিগ-নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার, এবং মাঝখানে কিছুদিন সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এদের শাসনের ফল, যে-পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশ ১৯৭১এ স্বাধীন হয়েছিলো, আজকে তারাও গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। একমাত্র শিশু মৃত্যু হার ব্যাপকভাবে হ্রাস করা ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ বলার মতো কোনো অগ্রসরতা অর্জন করতে সমর্থ হয় নাই। আবার সেটাও রাষ্ট্রের কৃতিত্ব, নাকি চিকিৎসাশাস্ত্রে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বৈশ্বিক অগ্রগতির কৃতিত্ব, তা বিবেচনার দাবি রাখে। উন্নয়নের নামে ব্যয়বহুল ও চোখধাঁধাঁনো প্রকল্প নির্মাণ করা সম্ভব হলেও টেকসই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই। দক্ষিণ এশিয়ার আড়াই দশকের অভিজ্ঞতা তাই বলে।

Please follow and like us: