//আজকের দিনটাঃ ভবিষ্যৎ এখনো লিখিত হয় নাই…

আজকের দিনটাঃ ভবিষ্যৎ এখনো লিখিত হয় নাই…

শিল্পকর্ম কৃতজ্ঞতা মহাকাব্য

আজকের দিনটা গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপদ সড়কের জন্য ও ন্যায়বিচারের জন্য কিশোর শিক্ষার্থীদের বীরত্বব্যাঞ্জক বিদ্রোহ সরকারকে হতভম্ব করে দিতে পেরেছে সন্দেহ নাই।
 
কিন্তু সরকার সেই দিশেহারা দশা কাটিয়ে উঠছে।
 
তারা ভেবেছিলো, বিদ্রোহীরা যেহেতু বাচ্চা, তাই সালমান মুকতাদির আর সাকিব আল-হাসানের মতো নানা কারণে সেলিব্রেটেড ব্যক্তিদেরকে দিয়ে এদেরকে বশে আনতে পারবে।
 
বাচ্চারা এদেরকে পাত্তা না দিয়ে প্রমাণ করেছে, তাঁরা শুধু সাহসীই নয়, রাষ্ট্রের কিশোর নাগরিক হিসেবে বুঝদারও বটে।
 
কিন্তু মিরপুরে ইতোমধ্যেই সহিংসতার ঘটনা ঘটে গেছে। ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনের (১) ভাষ্যমতে এটি ঘটিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ, আর কিছু অচিহ্নিত ব্যক্তি। এইসব দেখে আমরা আশঙ্কা করছি, কো-অপশনের চেষ্টায় কাজ হচ্ছে না যেহেতু, তাই সরকার কোয়ের্শনের লাইন নিতে যাচ্ছে।
 
সে-প্রসঙ্গে আমাদের কর্তব্য কী, বলছি, তবে তার আগে কিছু কথা বলে দেয়া দরকার।
 
একটা বিষয় পরিষ্কার করে বোঝা উচিত আমাদের। এখনো এই আন্দোলনের কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নাই। কিশোরেরা কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প হাজির করে নাই।
 
কিন্তু তারা স্রেফ স্বৈরতন্ত্রী রাজনীতিকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে, জোর যার মুল্লুক তার এই মাৎসন্যায়ের নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এটা অসাধারণ ব্যাপার। ট্রাফিক কন্ট্রোল করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করা, এবং এম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির জন্য ইমার্জেন্সি লেন তৈরি করে তারা অরাজকতার জায়গায় সামাজিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করেছে। তারা মন্ত্রীমিনিস্টার আর পুলিশের গাড়িকেও ছাড় দেয় নি, এর মানে, তারা শাসকদেরকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চায়। পুলিশকে গালি দেয়াটাকে আমি আইনের শাসনের বিরোধিতা হিসেবে দেখছি না, নৈরাজ্য-বিপ্লব হিসেবেও দেখছি না, দেখছি স্রেফ পুলিশ জনগণের পক্ষে কাজ না করে প্রচণ্ড গণবিরোধী বাহিনী হয়ে ওঠায় কিশোরদের ক্ষুব্ধ হওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।
 
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার আগে আইনগুলোকে নিপীড়ণমূলক থেকে জনবান্ধবে রূপান্তরিত করে নেয়া দরকার, নইলে নাজি জার্মানিতেও এক ধরণের আইনের শাসন ছিল, ফ্যাসিস্ট আইনের শাসন দিয়ে কী করবো?
 
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রিম্যান স্পগলি ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অলিভিয়ের নমেলিনি সিনিয়র ফেলো ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, উন্নয়নের রাজনৈতিক দিক তিনটিঃ রাষ্ট্রগঠন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, শাসকদেরকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার আওতায় আনা (২)। বাংলাদেশে স্রেফ প্রথমটি আছে, দ্বিতীয়টি আছে অত্যন্ত বিকৃতভাবে, আর তৃতীয়টি কোনোকালেই ছিল না। এটা স্বৈরতান্ত্রিক উন্নয়নের লক্ষণ, গণতান্ত্রিক উন্নয়নের নয়।
 
কিশোররা শাসকদেরকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাইছে, অন্তত যাতায়াতের ক্ষেত্রে, এটাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। সীমাবদ্ধতা আছে সন্দেহাতীতভাবে। যেই রাষ্ট্রের সরকারি দলটিই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয় নি, জবাবদিহিতার তোয়াক্কা করে না, তাঁরা শুধু যাতায়াতের ক্ষেত্রে কেনো জবাবদিহিতার ধার ধারবে এই প্রশ্ন বিদ্রোহী কিশোরদের কাছে করাই যায়।
 
কিন্তু এটা সীমাবদ্ধতা, এটা ওদের দোষ নয়। সব কিশোররা করবে, আপনি আমি ভেড়েন্ডা ভাজবো? এটা অন্যায় আবদার!
 
সত্যি বলতে নতুন কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প হাজির করার দায়িত্বও একটা দেশের ইউনিফর্ম পরে কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে স্কুল কলেজে যাওয়া কিশোরদের না। ওরা স্রেফ স্বৈরতন্ত্রী রাজনীতিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রকল্প হাজির করা আমাদের কাজ, সেটার প্রক্রিয়াপদ্ধতি কী হবে, তর্ক হতে পারে শুধুমাত্র তা নিয়ে।
 
তবে এসব পরে হবে, আপাতত হাতের কাজ যেটা আছে, সেটা সেরে নেয়া দরকার। সরকার কিশোরদেরকে কোয়ের্স করার পথে এগোতে পারে। যদি তাই হয়, সেটা রুখে দেয়া নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব, মানুষ হিসেবেও আমাদের উচিত কিশোরদেরকে রক্ষা করা।
 
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের কিছু নির্দিষ্ট স্থানকে কেন্দ্র করে নাগরিক প্রতিবাদের একটি সংস্কৃতি গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছে। আমি এটাকে সাধারণভাবে অপ্রয়োজনীয় মনে করি না, কিন্তু লাগামহীন সহিংসতার মুখে, স্রেফ মিছিল-মানববন্ধন-সমাবেশ কোনো কাজে আসে না। তাই সরকার যদি সহিংসভাবে আন্দোলন দমন করতে যায় সেটাকে পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় গণপ্রতিরোধ গড়ে ঠেকাতে হবে, অন্তত সেইসব জায়গায়, যেখানকার কিশোররা সবচে বেশি পরিমাণে রাস্তায় নেমেছে। যাতে তারা নিজেদেরকে একা মনে না করে। কারো অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নামার দরকার নাই। স্রেফ কিশোরদের পাশে আপনারা সাহস নিয়ে দাঁড়ান, মনে রাখবেন পাবলিক না ঠেকলে রাস্তায় নামে না সহজে, কিন্তু একবার নেমে গেলে এমনকি রাষ্ট্রের বাহিনীগুলোও অল্প কিছু স্বৈরাচারীকে বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে বেশিক্ষণ অবস্থান না নিয়ে জনগণের পক্ষে চলে আসে। শেষ পর্যন্ত ইউনিফর্মের নিচে পুলিশ-আর্মির লোকেরাও মানুষ, স্বৈরতন্ত্র ও উগ্র জাতীয়তাবাদের মতো নানা ব্যাধি এদের বৃহত্তর অংশটাকেই তাদের মনুষ্যত্ব ভুলিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ইতিহাসের বাঁকবদলের মুহূর্তগুলোতে মনুষ্যত্ব ফিরে পাওয়ার অনেক অবিশ্বাস্য গল্পই তৈরি হয়।
 
আপনি কিশোরদের ইনোসেন্স দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তো, এবার ওদেরকে ভায়োলেন্স থেকে বাঁচানোর দিন এসেছে, বাপ মা ভাই বোন ও সর্বোপরি মানুষ হিসেবেই সেই দায়িত্ব আমাদেরকে নিতেই হবে। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ কোটা সংস্কার আন্দোলনের ৩ দফা এবং নিরাপদ সড়কের জন্য ৯ দফা দাবিতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজকে সারা দেশে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের ধর্মঘট ডেকেছে (৩)। তাঁরা মানুষ ও নাগরিক হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছে, আপনি আসবেন না?
রেফারেন্স
১ https://www.thedailystar.net/city/protest-for-safe-roads-in-bangladesh-police-and-bcl-attack-on-students-in-dhaka-mirpur-1614967
২ https://profilebooks.com/the-origins-of-political-order.html
৩ http://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1546441/%E0%A6%B6%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%AC-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%A0%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%98%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A1%E0%A6%BE%E0%A6%95-%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87%E0%A6%9B%E0%A7%87
Please follow and like us: