//গুটেনবার্গের মুদ্রণালয়, স্বৈরতন্ত্র ও সৃষ্টিশীল ধবংসের ভয়

গুটেনবার্গের মুদ্রণালয়, স্বৈরতন্ত্র ও সৃষ্টিশীল ধবংসের ভয়

আলোকচিত্র ফ্রানসেসকো লোলি

১৪৪৫এ জার্মান শহর মেইঞ্জে জোহানেস গুটেনবার্গ নামের এক লোক একটা আশ্চর্য আবিষ্কার করলেন। আবিষ্কারটা হচ্ছে মুদ্রণালয়, যার টাইপগুলো ছিলো স্থানান্তরযোগ্য। এর আগ পর্যন্ত সারা দুনিয়ায় বইপত্র হয় স্ক্রাইবরা হাতে লিখে কপি করতেন, যা ছিলো খুবই ধীর ও পরিশ্রমসাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া, অথবা প্রতি পৃষ্ঠার জন্য আলাদা আলাদা কাঠের টুকরো ব্যবহার করে ব্লক-প্রিন্ট করা হত। বইপত্র ছিলো দুর্মূল্য। আর দুষ্প্রাপ্যও বটে। গুটেনবার্গের এই আবিষ্কার সবকিছু চিরতরে বদলে দিলো। বই আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ছাপা হতে লাগলো, বেশ সহজলভ্যও হয়ে উঠলো তা।

পশ্চিম ইওরোপে এই আবিষ্কার সহজেই স্বীকৃতি পায়। ১৪৬০এ সীমান্ত পেরিয়ে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে পৌঁছালো মুদ্রণালয়। পরবর্তী এক দশকে তা ছড়িয়ে পড়লো ইতালি জুড়ে, প্রথম রোম আর ভেনিসে, তারপর ফ্লোরেন্স, মিলান, আর তুরিনে। ১৪৭৬এ উইলিয়াম কাক্সটন লন্ডনে একটা মুদ্রণালয় বসান। দুই বছর পরে আরেকটা মুদ্রণালয় বসে, অক্সফোর্ডে। এই সময়টায় ইওরোপের অন্য দিকেও ছড়িয়ে যাচ্ছে নতুন এই প্রযুক্তি, স্পেন হয়ে চলে যাচ্ছে পূর্ব ইওরোপের দেশগুলোতে। ১৪৭৩এ বুদাপেস্টে একটা মুদ্রণালয় চালু হলো, আর এর ঠিক এক বছর পরেই, ক্র্যাকাওয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো আরেকটা।

কিন্তু সবাই এই আবিষ্কারকে ইতিবাচকভাবে নেয় নি।

১৪৮৫তে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ একটা ফরমান জারি করলেন, যাতে, মুসলমানদের জন্য আরবিতে কিছু মুদ্রণ করা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। ১৫১৫তে সুলতান প্রথম সেলিম ফরমানটাকে পুনঃবলবৎ করেন। ১৭২৭এর আগে অটোমান শাসনাধীন ভূখণ্ডগুলোতে মুদ্রণালয় প্রবেশাধিকার পায় নি, সে-বছর সুলতান তৃতীয় আহমেদ একটা ডিক্রি জারি করে ইব্রাহিম মুতেফেরিকাকে ছাপাখানা বসানোর অনুমতি দেন।

ইতোমধ্যেই অনেক দেরী হয়ে গেছিলো, কিন্তু এই অনুমতি যে শেষ পর্যন্ত এলো, সেটাও আসলে অবাধ ছিল না।

ডিক্রিতে বলা হল, ছাপানো বইগুলো প্রকাশিত হওয়ার আগে, পড়ে দেখবেন ইস্তানবুল, সেলানিকি, আর গালাতার তিনজন শ্রদ্ধেয় কাজী। এই ধর্মীয়-আইনী বিশেষজ্ঞরা বইয়ের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করবেন। বিশ্লেষণ শেষে যদি তাঁদের মনে হয় বইটিতে আপত্তিকর কিছু নেই, তাহলেই কেবল, তা প্রকাশের জন্য ছাড়পত্র পাবে।

১৭২৯এ মুদ্রণালয় চালু হওয়ার পর থেকে ১৭৪৩এ মুতেফেরিকা অবসরে যাওয়া পর্যন্ত মাত্র সতেরোটা বই ছাপা সম্ভব হয়েছিলো। তাঁর পরিবার ব্যবসাটা চালিয়ে গেছিলো ১৭৯৭ পর্যন্ত। পাঁচ দশকে সাতটা বই ছাপতে পেরেছিলো তাঁরা।

এরপর তাঁরা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়।

মিশরে প্রথম মুদ্রণালয় বসে আরো পরে, ১৭৯৮এ। এটা বসিয়েছিলো সেই ফরাশিরা, যারা নেপোলিয়ান বোনাপার্তের সাথে মিশরে গেছিলো, যখন তিনি দেশটি দখল করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। চেষ্টাটা ব্যর্থ হয়, তবে মুদ্রণালয় রয়ে যায়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যে বই প্রকাশের ব্যাপারটা হাতে লিখে কপি করা স্ক্রাইবদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই শতকটির শুরুর দিকে, এক ইস্তানবুলেই আট হাজার নামকরা স্ক্রাইব বেশ সক্রিয় ছিলেন। মুতেফেরিকার মুদ্রণালয় তেমন কোনো প্রভাবই ফেলে নি।

সাক্ষরতা, শিক্ষা, আর অর্থনৈতিক সাফল্যের ওপর এই বিরোধিতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক।

১৮০০তে, অটোমান সাম্রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে, মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ লিখতে পড়তে জানতেন। সেই একই বছরে, ইংল্যাণ্ডে সাক্ষরতার হার প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ক্ষেত্রে ছিলো ৬০ শতাংশ, প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ। নেদারল্যান্ডস আর জার্মানিতে সাক্ষরতার হারটা ছিলো আরো বেশি, এমনকি যে-পর্তুগাল ছিলো ইওরোপের মধ্যে সবচে কম শিক্ষিত দেশ, সেখানেও প্রাপ্তবয়স্কদের ২০ শতাংশ ছিলেন সাক্ষর।

অটোমান প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বৈরতন্ত্রী ও নিষ্কাশনমূলক চরিত্রের কারণে মুদ্রণালয়ের প্রতি তাদের এই শত্রুতাপূর্ণ মনোভাবের কারণটা সহজেই বোঝা যায়। বই চিন্তাবিস্তার ঘটায়। জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজটা কঠিনতর করে তোলে।

এসব বই থেকে পাওয়া কিছু চিন্তা হয়তো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মূল্যবান সব নতুন পথ বাতলে দেয়, কিন্তু অন্য চিন্তাগুলো বিধবংসী হয়ে উঠতে পারে, চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে অস্তিত্বশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক স্ট্যাটাস কো-কে।

বই জ্ঞানের ওপর থাকা অভিজাতদের নিয়ন্ত্রণ কমায়।

এ-থেকে যে সৃষ্টিশীল ধবংস* উৎসারিত হবে, দীর্ঘ মেয়াদে তাতে ক্ষমতা হারানোর ভয় ছিলো অটোমান সুলতান আর ধর্মীয় এস্টাবলিশমেন্টের, তাঁদের সমাধান ছিলো মুদ্রণালয়ের মাধ্যমে বই ছাপানো নিষিদ্ধ করা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্য স্বৈরতন্ত্রী রয়ে যায়, আর এই সময়কালে, সে সফল হয়েছিলো সৃষ্টিশীল ধবংস উৎসারিত করতে পারে মুদ্রণালয়ের মতো এমন সব আবিষ্কারের বিরোধিতা করতে বা তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে।

নোট

সৃষ্টিশীল ধবংসঃ অস্ট্রিয় অর্থনীতিবিদ জোসেফ শামপিটারের (১৮৮৩-১৯৫০) একটি কনসেপ্ট, যা সমাজের আর্থনীতিক বিকাশকে দেখে জৈবিকভাবে, নতুনের জন্মের জন্য পুরনোর মৃত্যু জরুরী এই জৈববাস্তবতাকে অর্থনীতির এলাকায় প্রয়োগ করে।

অনুবাদ ও তথ্যসূত্র

আসেমোগলু, দ্যারন, ও রবিনসন, জেমস এ. (২০১৩) “নট অন আওয়ার টার্ফঃ ব্যারিয়ারস টু ভেভলাপমেন্ট”, ইনহোয়াই নেশনস ফেইলঃ দি অরিজিনস অফ পাওয়ার, প্রসপারিটি, অ্যান্ড পভার্টি, লন্ডনঃ প্রোফাইল বুকস, পৃ. ২১৩-১৮

Please follow and like us: