//আমাদের শহরে একদল দেবদূত / এ.টি.এম গোলাম কিবরিয়া

আমাদের শহরে একদল দেবদূত / এ.টি.এম গোলাম কিবরিয়া

আলোকচিত্র নুরুল হক নুরুর পিতা মো. ইদ্রিস হাওলাদার, এই ছবিটি ফেসবুক থেকে নেয়া 

উনিশশো পঞ্চাশের ঢাকা শহর একটা বাড়ন্ত মফস্বল। গোপালগঞ্জের এক পেশকারের ছেলে এই শহরে মেস করে থাকে। পাকিস্তান কায়েমের জন্য সে জান দিয়ে লড়েছে, ছাত্র রাজনীতি করেছে কলকাতায়। মুসলিম লীগের চাপকান পড়া শরিফ নেতাদের মত তার শরীর থেকে দামী কোন আতরের সুবাস বেরোয় না, র ফলা আসেনা তার জিহবায়, প্রধানমন্ত্রীকে বলে সে পোধানমন্তি। ঢাকা ইউনিভার্সিটির চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ত দেয়ায় ভার্সিটি তাকে রাস্টিকেইট করে, সিকি শতাব্দী পরে একটা তরুন দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সেই ভার্সিটিতে প্রত্যাবর্তনের দিনে তার আর ফেরা হয়না, অগাস্টের পনের তারিখে তার রুহ শরীর ত্যাগ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বাহান্ন সনের একুশে ফেব্রুয়ারীতে যারা খুন হয়েছেন, তারা কেউ শহুরে ছিলেন না। তারা কেউ ললিত সুরে “ছিল্প ছাহিত্য” করার তরে মিছিলে যান নাই। তারা ভীত ছিলেন যে উর্দু রাস্ট্রভাষা হলে তারা প্রতিযোগিতামূলক চাকরিগুলোতে পিছিয়ে পড়বেন। জবান থেকে পেট গুরুত্ত্বপূর্ণ। পেট আর চ্যাট জগতের সকল আন্দোলনের জননী। বিখ্যাত ছয়দফাতে তিনটা দফা ছিলো অর্থনীতি নিয়ে, অর্থাৎ পেটসংশ্লিষ্ট। পাকিস্তানীরা আমাদের অর্থনৈতিক ভাবে শোষন করতো আর সেই শোষনকে জাস্টিফাই করতো আমাদের কালচারালি ইনফেরিয়র ডেকে, আমরা কালো আমরা মার্শাল রেইস না আমরা ভালো মুসলমান না এইসব বলে। পূর্ব বাংলার গ্রাম গ্রামান্তরের যেইসব যুবকেরা শহরে এসে এইসব আন্দোলন করেছে, তাদের পেছনে দীর্ঘ দীর্ঘ ছায়া ছিলো তাদের পিতাদের। মনে রাখতে হবে এরা প্রথম প্রজন্ম যারা “শিক্ষিত” হবে, ডিগ্রী পাবে, চাকরি নেবে বলে পুরো পরিবার অপেক্ষায় আছে, ম্যাট্রিকুলেশন পাশের পরে অনেক টাকা দিয়ে একটা রিস্ট ওয়াচ অথবা ফাউন্টেন পেন কিনে দেয়া হয়েছে ওদের, এরাই লজিং এ কিংবা হোস্টেলে থেকে পিতার কাছে অর্থ চাহিয়া পত্র লিখতো, মাসে একটা ম্যাটিনি শো ছিলো বিলাসিতা যাদের জন্য। আপনি যদি কোন একদিন নিশুতি রাতে সকল জড়তা ঝেড়ে আপনার বাবা কিংবা কাকার সাথে গল্প করতে বসেন, জেনে যাবেন আমি কাদের কথা বলছি।

গোপালগঞ্জের যে লোকটার কথা প্রথমে লিখলাম, পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ও তার সমসাময়িক অনেকে তার থেকে বড় ও সম্ভাবনাময় ছিলো নেতা হিসেবে। চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী কিংবা খুলনার খান এ সবুরের সাথে তার পার্থক্য হচ্ছে, সে খাওয়ার পরে হাত মুছে ফেলতে জানতো, সে জানতো রাজনৈতিক সত্য পরিবর্তনশীল। পাকিস্তান কায়েম মানেই গল্পের শেষ না, বরং নতুন গল্পের শুরু। এই হ্যাংঅভার অনেকের কাটে না সারাজীবন। একাত্তরে যারা জনতার প্রতিপক্ষ হয়েছিলো, তারা সাতচল্লিশের হ্যাংওভার থেকে তা করেছে, এখন যারা মুক্তিযুদ্ধ ব্যাবসার ঠিকাদার, তারা আছে একাত্তরের হ্যাংওভারে। এদিকে পৃথিবী চলে গ্যাছে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার। আমরা জেনে গেছি,বর্তমানকে ঢাকার মত বড় কোন সামিয়ানা অতীত থেকে আমদানি করা যায়না।

কোটা আন্দোলনের নেতা বলে যে ছেলে দুইটাকে মারা হলো, এদের একজনের বাবা রাজমিস্ত্রী আরেকজনের বাবা কৃষক। এদের এইভাবে সাপের মতন পিটিয়ে মারার কারণ এরা বর্তমান আওয়ামি লিগের কলিজায় হাত দিয়ে দিয়েছে। আমলা এবং আর্মি, এরা হচ্ছে এই রেজিমের রিটেইনার ক্লাস। এইখানে লয়ালটি নিয়ে কোন কম্প্রোমাইজ করা অসম্ভব। বিভিন্ন ভাবে এদের ডিলেজিটিমাইয করার চেস্টা করা হয়েছে, পাকিস্তানীরা যেভাবে বলতো ভারতের দালাল, সেই ফরম্যাটে বলা হচ্ছে এরা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী। কিন্তু এরা তো বিড়ালের প্রাণ, মাকড়সার অধ্যসবসায় নিয়ে এসেছে। কানেকশন বিহীন এই উষর শহরে এদের একমাত্র অস্ত্র ইতর প্রাণির জেদ। যার হারানোর কিছু নাই, তাকে আজ পর্যন্ত কেউ হারাইতে পারে নাই। আমাকে একটা ছেলে ২০১৪ থেকে প্রতি বছর মেসেজ পাঠায়, “ভাই, কোটা নিয়ে কিছু লেখেন না, প্লিজ।” আমি বিরক্ত হই। আজকে আমার টাইমলাইনে নূরুর পিতার ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে, জমি বিক্রি করে সন্তানের চিকিতসা খরচ মেটাতে ঢাকা শহরে এসেছেন তিনি। আমার মনে পড়ছে শেখ মুজিব বা তাজউদ্দীনের পিতার কথা, আমার মরহুম পিতামহের কথা, আমাদের দূষিত রক্তের বিশুদ্ধ পূর্বপুরুষদের কথা। গুম হওয়ার ভয় মার খাওয়া পশুর মত তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাদের। আমরা ঠিক করেছি, তাকে বা তার সন্তান কাউকেই থাকতে দেবোনা আমরা এই শহরে।

(লেখাটির শিরোনাম হুমায়ুন আজাদের একটি বইয়ের নামে)

অতিথি লেখক পরিচিতিঃ অস্ট্রেলিয়া নিবাসী বাংলাদেশি নাগরিক

Please follow and like us: