//আমি এরদোগানের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি – আমার কারাকক্ষ থেকে / সেলাহাত্তিন দেমিরতাস

আমি এরদোগানের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি – আমার কারাকক্ষ থেকে / সেলাহাত্তিন দেমিরতাস

আমি আপনাদের কাছে এই লাইনগুলো লিখছি তুরস্কের একটি সর্বোচ্চ-নিরাপত্তা কারাগার থেকে — যাকে নিঃসন্দেহে একটি অদ্ভূত ধারণা মনে হবে এমন যে-কারো কাছে যিনি একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্রে বাস করেন। সংসদীয় গণতন্ত্র যথাযথভাবে কার্যকর এমন যে-কোনো দেশে, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে তাঁদের নীতির জন্যে জেলে ভরে রাখা হয় না। সরকারের ব্যাপারে তাঁরা যতো সমালোচনামুখরই হোক না কেনো, সরকারের বিরোধিতা করতে তাঁরা যতো সক্রিয়ভাবেই কাজ করে চলুক না কেনো, নির্বাচিত লোকদেরকে তাঁদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গ্রেফতার করা হয় না।

কিন্তু আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো, ২০ মাস আগে, যখন আমি সংসদ সদস্য এবং তুরস্কের সংসদে তৃতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক দল এইচডিপির (পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি) সহ-সভাপতি ছিলাম। যে-পার্টি ৬০ লক্ষ ভোটারের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে। আমাকে গ্রেফতার করার প্রায় এক বছর পর আমি একজন বিচারকের সাক্ষাৎ পাই। আমার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যে-সব অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে আমাকে এমন সব অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে, যার সম্মিলিত শাস্তি ১৮৩ বছর জেল খাটা।

সংসদ সদস্য হওয়ার আগে, আমি একজন মানবাধিকারবিষয়ক উকিল হিসেবে বিভিন্ন কারাগার পরিদর্শন করেছি, কারাবন্দীদের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো প্রতিবেদন করার জন্য। যা-হোক, আইনজীবী হিসেবে জেলের দেয়ালগুলো দেখা এক কথা, রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে সেগুলোকে দেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। গত ২০ মাসে আমি এক মুহূর্তের জন্যেও তুরস্কের গণতান্ত্রিক বিরোধী রাজনীতির ওপর থেকে নিজের বিশ্বাস হারাই নি। রাজনৈতিক বন্দী হওয়ার অর্থ কি সে-ব্যাপারে নেলসন ম্যান্ডেলা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “জেলখানা নিজেই ধৈর্য আর দৃঢ়তার প্রয়োজনীয়তা শেখার একটা মহান ইশকুল। সর্বোপরি, এটা মানুষের জন্য আস্থা/স্থিতিশীলতার একটা পরীক্ষা।” তুরস্কের জেলখানাগুলোতে বন্দী হয়ে থাকা আরো হাজার হাজার মানুষের মতো আমিও এই প্রশিক্ষণ আর স্থিতিশীলতার পরীক্ষার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, স্রেফ মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংগঠিত হওয়ার চর্চা করায়।

আগামীকালের (মূল ইংরেজি লেখাটি ২৩ জুন ২০১৮য় প্রকাশিত) নির্বাচনে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি পদে যে-ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য দাঁড়াচ্ছেন, আমি তাদের একজন। আমি আমার নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছি সরাসরি আমার কারাকক্ষ থেকে। এই সিদ্ধান্তটি এসেছে এই বিশ্বাস থেকে যে, রাষ্ট্রপতি রেসিপ তাইয়েপ এরদোগানের নেতৃত্বে যে-স্বৈরাচারী সরকার দেশ চালাচ্ছে, তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করাই তুরস্কে শান্তি ও গণতন্ত্র পুনর্বহাল করার একমাত্র পথ। আমি অবশ্যই আইনজীবীদের মারফত বাইরে বার্তা সরবরাহের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল, কিন্তু আমার হাতে এই একটাই উপায় আছে। তবু, এইসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, এবং মূলধারার মিডিয়ার শতকরা ৯০ শতাংশ সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও, জনগণ, বিশেষত তরুণেরা ও নারীরা, প্রাণবন্ততার সাথে প্রচার চালাচ্ছেন আমার পক্ষে।

এরদোগানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানো আর সব প্রার্থীরা দারুণ প্রচারণা চালাচ্ছেন। এবং মতাদর্শের প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে ফারাক থাকলেও, তাঁরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দ্বারা তাড়িত।

প্রথমটা হচ্ছে, এক ব্যক্তি কর্তৃক পরিচালিত হওয়ার জন্য তুরস্ক খুব বড়ো একটা দেশ, বিশেষত এর গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির কথা মাথায় রাখলে। এরদোগান যে ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন, তার ফল গত তিন বছর ধরে আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। আমরা যে শুধু পশ্চিমের সাথে শেষ-না-হওয়া সংঘাতেই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছি তাই নয়, দেশের ভেতরেও একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটও মোকাবেলা করতে হচ্ছে আমাদের।

দ্বিতীয়ত, এরদোগানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সকলেই বিশ্বাস করেন রাষ্ট্রপতি আমার সাথে সমানে সমান হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ভয় পাচ্ছেন, এবং এঁদের প্রত্যেকেই আমাকে কারাগারে নিঃক্ষেপ করার নিন্দা জানিয়েছেন।

তৃতীয়ত, এবং এটা সবচে গুরুত্বপূর্ণ, তাঁরা এটা শনাক্ত করতে পারেন যে তুরস্কের জনগণ একটা পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছে। তাঁরা যে পার্টির সমর্থকবলয় থেকেই আসুন না কেনো, ভোটারদের সামষ্টিকভাবে অসুখী থাকার ব্যাপারটা গভীরভাবে অনুভূত হয়, জনমত জরিপের মাধ্যমে যা যাচাই করা সম্ভব না হলেও স্বৈরাচারী ব্যবস্থাতেই যে-দৃশ্যটা দেখা যায়।

এরদোগানের একেপি সরকার সুকৌশলে জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল ভোটারদেরকে বিভ্রান্ত করেছেন তুরস্কের সব সমস্যার জন্য পশ্চিমকে দায়ী করে। এরদোগানের নির্বাচনী প্রচারণার ব্যাপারে বহু তুর্কি যে উদাসীনতা দেখিয়েছেন, তা পরিবর্তনের হাওয়ার পক্ষে পরিষ্কারতম প্রমাণ। আমি বিশ্বাস করি, তুরস্কের সমস্যাগুলোর জন্য আসলে কাকে দোষারোপ করা দরকার, তা কালকের (মূল ইংরেজি লেখাটি ২৩ জুন ২০১৮য় প্রকাশিত) নির্বাচনী ফলাফলেই প্রতিফলিত হয়ে যাবে।

আসুন আমরা এটা ভুলে না যাই যে, স্বৈরাচারের পতন অনিবার্য। কখনো কখনো এটা খুব দ্রুত ঘটে, আবার কোনো কোনো স্বৈরাচারের ক্ষেত্রে এতে অনেক সময় লাগে।

ব্রিটিশ পত্রিকা দি গার্ডিয়ানে ২৩ জুন ২০১৮য় প্রকাশিত মূল ইংরেজি লেখাটি পড়তে চাইলে এই লাইনে ক্লিক করুন।

Please follow and like us: