//দায়েশের পরেঃ সাইরুন অ্যালায়েন্স ও ইরাকের ভবিষ্যৎ

দায়েশের পরেঃ সাইরুন অ্যালায়েন্স ও ইরাকের ভবিষ্যৎ

আলোকচিত্র অনলাইনে পাওয়া

মুকতাদা আল-সদরের জন্ম ইরাকের এক শিয়া পরিবারে, আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে, শিয়া আলেম পরিবারে। তাঁর বাবা মোহাম্মদ সাদেক আল-সদর ছিলেন ইরাকের গ্র্যান্ড আয়াতোল্লাহ, তিনি সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কঠোর সমালোচক ছিলেন। ১৯৯৯এ নাজাফের এক মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় তাকে খুন করা হয় [১], মুকতাদা বিশ্বাস করতেন, এই হত্যাকাণ্ডে সাদ্দাম হোসেনের হাত ছিলো।

ইরাকের নাজাফ শহরটি একটি ঐতিহাসিক কারণে বিখ্যাত। এখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা। শিয়া মুসলমানদের কাছে হযরত আলীর বিশেষ গুরুত্ব থাকায় মক্কা-মদিনার পরেই নাজাফ একটি পবিত্র তীর্থস্থান বলে বিবেচিত হয়। [২]

আর মুকতাদার জন্ম হয় এই নাজাফেই, ১৯৭৪এ। তাঁর আব্বা মোহাম্মদ সাদেক আল-সদর আর তাঁর শ্বশুর আব্বা আয়াতোল্লাহ মোহাম্মদ বাকির-আল সদরের চিন্তাভাবনা দ্বারা তিনি প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর শ্বশুর ইসলামিক দাওয়াহ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরোধিতা করায় ১৯৮০এ যাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আল-সদর মিডল স্কুলের পাঠ সমাপ্ত করে একটা রিলিজিয়াস সেমিনারিতে ঢুকেছিলেন, কিন্তু কখনোই তাঁর পড়া শেষ করেন নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩এ ইরাকে আগ্রাসন চালালে ও সাদ্দাম হোসেন সরকারকে উৎখাত করলে আল-সদর ছায়া থেকে উঠে আসেন। তাঁর বাবার নামে অফিস খোলেন বাগদাদ, নাজাফ, কারবালা, বসরা, এবং অন্যান্য ইরাকি শহরে (যা সামগ্রিকভাবে শহিদ সদর অফিস হিসেবে পরিচিত ছিল)।  তিনি দ্রুত সাফল্য লাভ করেন মদিনাত আল-থাওরায় (বিপ্লবের শহর), বাগদাদের এক শহরতলী যেখানে বাস করতেন দুই লক্ষ হতদরিদ্র শিয়া, যে শহরের নাম তিনি নতুন করে সদর সিটি রাখেন তাঁর খুন হওয়া বাবার নামে। সেই বছরের শেষে মুকতাদা সাদরিস্ট মুভমেন্ট নামে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান যা ইরাকের তরুণ ও গরিব শিয়াদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তিনি কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন এবং শরিয়াহ (ইসলামি আইন) ভিত্তিক আদালত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেকে মার্কিন আগ্রাসনবিরোধী একজন ইরাকি জাতীয়তাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করেন, এর পাশাপাশি জাইশে মাহদী (মাহদীর সেনাবাহিনী) নামে একটি শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করেন, যারা সশস্ত্র সংগ্রামে নামে। মুকতাদার সমালোচকরা এই মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে সুন্নীদের ওপর অত্যাচার করার ও সুন্নী সম্পত্তি ধবংস করার অভিযোগ আনেন। তাঁর প্রশংসাকারীরা বলেন, মুকতাদা আল-ক্বায়েদা অ্যাফিলিয়েটেড সুন্নী বিদ্রোহীদের প্রতিহত করেছেন, এবং তাদের হাত থেকে শিয়াদেরকে রক্ষা করেছেন। ২০০৫এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে সাদরিস্টরা ইউনাইটেড ইরাকি অ্যালায়েন্সের একটি পার্টি হিসেবে অংশ নেয় এবং সংসদে ৩২টি আসন পায়। নূরী আল-মালিকী প্রধানমন্ত্রী হলে মুকতাদা তাকে সমর্থন করেন, কিন্তু ২০০৭এর এপ্রিলে ৬ জন সাদরিস্ট মন্ত্রী মালিকীর কেবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন, কারণ ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য তাদের বেঁধে দেয়া সময় পেরিয়ে গেছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীসমূহের কাছ থেকে আসা প্রচণ্ড চাপের মুখে মুকতাদা সে-বছরেই ইরান চলে যান। ২০১০এর নির্বাচনে জিততে নূরী আল-মালিকীর সমর্থন প্রয়োজন হলে তিনি সাদরিস্টদেরকে কিছু ছাড় দেন। আর সে-বছরই মুকতাদা অপ্রত্যাশিতভাবে ইরাকে ফিরে আসেন। [৩]

বিকল্প একটি সূত্রানুসারে, তিনি ইরাকে ফেরেন ২০১১য়। ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য সরানোর কয়েকহপ্তা আগে। বাগদাদ আর ওয়াশিংটনের মধ্যে তখন মতবিনিময় চলছিলো, ইরাকে মার্কিন উপস্থিতি আরো প্রলম্বিত করা যায় কিনা সেটা নিয়ে, মুকতাদা হুমকি দেন এ-রকম কিছু হলে তিনি সেই সময় অকার্যকর থাকা জাইশে মাহদী আবার পুনর্জীবিত করবেন। [৪]

জাইশে মাহদীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। ২০০৬-৭এর গৃহযুদ্ধের দিনগুলিতে, শিয়া আর সুন্নিদের মধ্যে যে-সহিংসতা দেখা দেয়, তাতে ইরাকের হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী এটা থামাতে ব্যর্থ হয়, সুন্নিদের ওপর আক্রমণের জন্য জাইশে মাহদীকে দায়ি করে একাধিক মন্ত্রণালয়। [৫]

২০০৮এ ইরানের মধ্যস্ততায় গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং আল-সদর জাইশে মাহদীকে একটি সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠনে রূপান্তরিত করার দাবি করেন। [৬]

২০১৪তে গ্র্যাণ্ড আয়াতোল্লাহ আল-সিস্তানি শিয়া মিলিশিয়ার প্রতি দাওলাত আল-ইসলামিয়াহ (ইসলামিক স্টেট, মধ্যপ্রাচ্যে যারাদায়েশ নামেও পরিচিত) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার ডাক দেন। জাইশে মাহদী এই আহবান সাড়া প্রদান করে। ইরাকের রাস্তায় রাস্তায় শিয়া মিলিশিয়ার শ্লোগান শোনা যায়, “আমরা ওদেরকে (দায়েশ) জবাই করবো!” [৭]

এবার দায়েশ সম্পর্কে একটু আলাপ করা দরকার।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন চালানোর পরের বছর, ২০০৪এ, জর্দানিয়ান সুন্নি জিহাদি আবু মুসাব আল-জারকাওয়ি ওসামা বিন লাদেনের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েআল-ক্বায়েদা ইন ইরাক (AQI) প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬এ বাকুবার সেফহাউজে এক মার্কিন বিমান হামলায় আল-জারকাওয়ি খুন হওয়ার পরে AQI দাওলাত আল-ইরাক আল-ইসলামিয়াহ (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক, সংক্ষেপে ISI) নামে একটি আমব্রেলা সংগঠন তৈরি করে। তবে সুন্নি আরব গোত্রপতিদের সাহওয়া (জাগরণ) কাউন্সিলগুলো এদের নৃশংসতাকে প্রত্যাখ্যান করায় ও আমেরিকান সৈন্যদের তৎপরতায় তখন এরা বিশেষ সুবিধা করতে সমর্থ হয় নি, এদের প্রভাব সামান্যই ছিলো। এদের পুনর্জাগরণ ঘটে ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আল-বদরি আল-সামারাই, আবু বকর আল-বাগদাদি নামেই অধিক পরিচিত, তার নেতৃত্বে। ২০১০ থেকে এরা শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। ২০১৩র এপ্রিলে বাগদাদি ইরাক ও সিরিয়ায় তার অনুসারীদেরকে মার্জ করে আদ-দাওলাত আল-ইসলামিয়াহ ফিল-ইরাক ওয়াশ-শাম (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দি লেভান্ত, এরা ইসলামিক স্টেট দায়েশ আইসিল আইসিস আইএস বিভিন্ন নামে পরিচিত) নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। আল-ক্বায়েদা ও এর সিরিয়া শাখা জাবহাত আল-নুসরা (নুসরা ফ্রন্ট) এর বিরোধিতা করলেও বাগদাদির প্রতি অনুগত যোদ্ধারা জাবহাত আল-নুসরা  থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাগদাদীকে সিরিয়ায় শক্তিশালী হতে সহায়তা করে।

নূরী আল-মালিকী সরকারের সাথে ইরাকের সুন্নি সম্প্রদায়ের যে-বিরোধ চলছিলো সেটার সুযোগ নেয় দায়েশ। ২০১৩র ডিসেম্বরে তারা ফাল্লুজাহ দখল করে নেয়। ২০১৪র জুনে এরা মসুল দখল করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। [৮]

২০১৫র মে অফেন্সিভের মাধ্যমে ইরাকের আনবার প্রদেশের রাজধানি রামাদি দখল করে নেয় দায়েশ। দায়েশের অনেক একনিষ্ঠ কমান্ডার, উপদেষ্টা, ও যোদ্ধা; অবিশ্বাস্য শোনালেও; অতীতে সাদ্দাম হোসেনের অনুগত ছিলেন, অর্থাৎ এরা সাবেক-বাথিস্ট। [৯] এরা বাথিস্টদের আপাতসেকুলার আদর্শ পাল্টে দায়েশে যোগ দিয়েছিলেন নাকি দায়েশের স্রেফ শক্তিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে একটা নয়া-বাথিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করে ক্ষমতায় ফেরার উদ্দেশ্যে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন।

এই সাবেক-বাথিস্টদের সাথে সুন্নি জিহাদীদের দেখা হয়েছিলো ইরাকের একটি মার্কিন কারাগারেঃ ক্যাম্প বুকায়।

২০০৪এ বাগদাদের আবু ঘারিবে ইরাকি বন্দিদের ওপর মার্কিন সেনাবাহিনীর অবর্ণনীয় অত্যাচারের সংবাদ ও ছবি প্রকাশিত হলে বিশ্বব্যাপী  নিন্দার ঝড় বয়ে যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রচণ্ড সমালোচনার শিকার হয়। তখন আমেরিকা হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে ক্যাম্প বুকা নামে একটি আদর্শ কারাগার প্রতিষ্ঠা করে ইরাকের উম্মে কসরে। এখানে বন্দিরা পড়াশোনা করতে পারতো, ভালো ব্যবহার করলে এমনকি ছোটোখাটো পুরস্কার পেতো, এবং সময় সময় আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করার সুযোগও মিলতো। ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত এটা চালু ছিলো। আবু বকর আল-বাগদাদি এই কারাগারেই বন্দি ছিলেন। এখানেই ভবিষ্যতের দায়েশের সাংগঠনিক ভিত্তিটা তৈরি হয়, আর সেটা মার্কিন সৈন্যদের নাকের ডগায়। আর এখানেই ‘সেকুলার’ আর ‘ইসলামিস্টের’ মিলন ঘটে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান দি সুফান গ্রুপের বরাত দিয়ে লিবিয়াপ্রবাসী লেখক মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা লিখেছেন,

“ক্যাম্প বুকা পাশাপাশি বন্দী চরমপন্থী আল-কায়েদা সদস্য এবং সাদ্দামের বাথ পার্টির জেনারেলদের মধ্যে এক অদ্ভুত মৈত্রী গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে দেয়। আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বিপরীত বৈশিষ্ট্যধারী দুটো দল কাছাকাছি লক্ষ্য নিয়ে উভয়ের সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে একত্রিত হয়। সুফানের মতে, চরমপন্থীদের মধ্যে বাথিস্ট জেনারেলরা খুঁজে পায় উদ্দেশ্য, আর বাথিস্ট জেনারেলদের মধ্যে চরমপন্থীরা খুঁজে পায় সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সামরিক প্রক্রিয়া।” [১০]

দায়েশ মানুষের ইতিহাসের সবচে নৃশংস সংগঠনগুলোর একটি। ভাইস নিউজের সংবাদ প্রতিবেদক মেদইয়ান দাইরিয়েহ তিন সপ্তাহ দায়েশের কথিত খেলাফতের ভূখণ্ডে থেকেছেন। এবং এ-বিষয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। [১১]

ইয়াজিদিরা মধ্যপ্রাচ্যের একটি ছোটো ধর্মীয় সম্প্রদায়, দায়েশ যাদেরকে শয়তানের উপাসক হিসেবে গণ্য করে। দায়েশের সবচে আলোচিত নৃশংসতা এই ইয়াজিদি গণহত্যা, বিশেষত ইয়াজিদি নারীদের ওপর চালানো ধর্ষণনিপীড়ণ। The United Nations Independent International Commission of Inquiry on the Syrian Arab Republicএর ২০১৬য় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের এই অকল্পনীয় নৃশংসতার গা শিউরে ওঠা বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। [১২]

২০১৭র অক্টোবরে মার্কিন-সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) হাতে দায়েশের কথিত খেলাফতের পতন ঘটে। [১৩] ঠিক দু’মাস পর ইরাকের বাগদাদে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি জানান ইরাকেও দায়েশের কথিত খেলাফতের পতন ঘটেছে। [১৪] এভাবেই সুন্নি জিহাদের একটি অধ্যায় শেষ হয়।

কুর্দি নামে ইরাকে একটি জাতি আছে যারা অটোমান সাম্রাজ্যের আমলে বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। এরা মূলত পাহাড়ি। অধিকাংশই সুন্নি সম্প্রদায়ের। সাইকস-পিকো চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ ও ফরাশি উপনিবেশিক শক্তি যখন মধ্যপ্রাচ্যকে জন্মদিনের কেকের মতো পিস পিস করে কেটে নেয়, তখন কুর্দিদের আবাসস্থল কুর্দিস্তান চারটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়। কুর্দিরা তাঁদের অটোমান আমলের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেন। এক ইরান ছাড়া ইরাক, সিরিয়া, ও তুরস্কের জাতীয়তাবাদী শাসকদের হাতে এরা ভয়ংকর নিষ্ঠুর স্বৈরতান্ত্রিক নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন দশকের পর দশক ধরে। তুরস্কে এখনো এদের ওপর জাতিগত নিপীড়ণ চলছে, ইসলামপন্থী শাসক এরদোগান এ-ব্যাপারে তার সেকুলার পূর্বসূরীদের উত্তরাধিকার বজায় রেখেছেন।

দায়েশের পতনে এই কুর্দিরা বড়ো ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু দায়েশের পতনের পরে ইরাক-সিরিয়ায় তাঁদের ভবিষ্যৎ কী হবে সেটা বলা খুব মুশকিল। [১৫] ২০১৭র সেপ্টেম্বরে ইরাকি কুর্দিরা স্বাধীনতার জন্য গণভোট ডেকেছিলেন, এবং তাতে শতকরা ৯৩ ভাগ ভোট পড়েছিলো, স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু বাগদাদ এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয় নি। তারা সৈন্য পাঠিয়ে ইরাকি কুর্দিস্তান দখলে নেয়, দায়েশের খেলাফতের সময়ে, যা একটা ডি ফ্যাক্টো  স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ছিলো। ইরান-সমর্থিত প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি নেতৃত্বাধীন আল-হাশদ আল-শাবির (পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স, সংক্ষেপে পিএমএফ) একজন উর্ধবতন কর্মকর্তা বলেছেন, “আমরা কোনোদিনও কোনো জায়নিস্ট প্রকল্পকে কিরকুক দখল করতে দেবো না।” [১৬] কুর্দিদের স্বাধীনতার স্পৃহাকে জায়োনিস্ট প্রকল্প হিসেবে দেখাটা তাত্ত্বিকভাবে সমস্যাজনক, কারণ ইজরায়েল ইওরোপিয়ান ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনের জমি চুরি করে গড়ে তোলা রাষ্ট্র [১৭], কিন্তু কুর্দিরা মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বহিরাগত নয়। [১৮]

 

যা-হোক, বর্তমানে ফিরি।

২০১৮ ইরাকের জন্য অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটা বছর। এ-বছরই ২৭টি রাজনৈতিক জোটের মোট ১৪৩টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে। [১৯] দায়েশের পতনের পর এই নির্বাচন ইরাক কোনদিকে যাবে তা অনেকটাই নির্ধারণ করে দেবে।

সুন্নি আরব ও কুর্দি আইনপ্রণেতারা নির্বাচন পেছাতে চেয়েছিলেন, কারণ, যুদ্ধের কারণে এই দুই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ তাঁদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। এরা ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হোক, তারপর নির্বাচন করলে তা সত্যিকার অর্থে জনগণের সকল অংশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে, এটাই ছিলো তাদের যুক্তি। ইরাকের সর্বোচ্চ বিচারালয় আবেদন খারিজ করে দেয়। [২০]

মে-তে জাতীয় নির্বাচনের দিন ঠিক করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি আর উপরাষ্ট্রপতি নূরী আল-মালিকি উভয়েই একই পার্টির সদস্য হলেও আলাদা জোটের অধীনে নির্বাচন করেছেন। [২১] এরা ছাড়া আছে হাদি আল-আমিরির ফাতাহ অ্যালায়েন্স। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়েছে চতুর্থ অ্যালায়েন্সঃ সাইরুন। এই সাইরুন (সংস্কারের পথে এগিয়ে চলো) অ্যালায়েন্স গঠিত হয়েছে মুকতাদার অনুসারী অর্থাৎ সাদরিস্ট, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনস, আর ইরাকি কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে। ভোটের দৌড়ে এরা সবচে বেশি এগিয়ে আছে। পেয়েছে ৫৫ সিট। অন্য জোটগুলো শিয়া আধিপত্য ও ইরানের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখার চিন্তা করলেও সাইরুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান থেকে সমান দূরত্বে থাকার ও ইরাকের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার নীতি ঘোষণা করেছে, আর তাঁদের জনপ্রিয়তার পেছনে আছে দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া। [২২]

যা-হোক, সাইরুন এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পারবে না। কারণ এককভাবে সরকার গঠন করতে হলে যতো সিট লাগবে নির্বাচনে কেউই তার ধারেকাছেও যেতে পারে নি এখনো।  তাকে অন্য কারো সাথে জোট বাঁধতে হবে।

আবার সাইরুনের ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকানো কঠিন কিছু না, বাকি ইরান-সমর্থিত জোটগুলোকে সাইরুনের বিরুদ্ধে এক হয়ে যেতে হবে। সেই প্রক্রিয়া সম্ভবত ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। এএফপির বরাত দিয়ে সিএনএন জানাচ্ছে, প্রভাবশালী ইরানি জেনারেল কাশেম সোলেমানি এই সপ্তাহেই আবাদি ও অন্যান্য ইরান-সমর্থিত নেতাদের সাথে দেখা করছেন, কী করে এমন একটা বিশাল ব্লক তৈরি করা যায় যা মুকতাদাকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখবে তা নিয়ে আলোচনা করতে। [২৩] মুকতাদার একটা শক্তির জায়গা আছে অবশ্য, সেটা হচ্ছে কুর্দিদের কাছে, তিনিই এই মুহূর্তে সবচে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নেতা। [২৪] কিন্তু সুন্নি আরবদের সাথে তাঁর যে ঐতিহাসিক তিক্ত সম্পর্ক সেটাকে স্বাভাবিক করা তাঁর সামনে সবচে বড়ো চ্যালেঞ্জ। তাঁর জোট সাইরুন যদি ক্ষমতায় নাও যায়, খুবই শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে থাকবে। তিনি যদি আসলেই সাম্প্রদায়িক ভেদনীতির উর্ধবে উঠতে পারেন, তাহলে ইরাকের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

তথ্যসূত্র

[১] http://www.newsweek.com/who-moqtada-al-sadr-firebrand-cleric-who-once-fought-us-holds-balance-power-924025

[২] http://www.sacred-destinations.com/iraq/najaf

[৩] https://www.britannica.com/biography/Muqtada-al-Sadr#ref988287

[৪] http://www.bbc.com/news/world-middle-east-12135160

[৫] ঐ

[৬] ঐ

[৭] http://www.dw.com/en/the-mahdi-army-turbans-kalashnikovs-and-plans-to-slaughter/a-17728487

[৮] http://www.bbc.com/news/world-middle-east-29052144

[৯] https://theintercept.com/2015/06/03/isis-forces-exbaathist-saddam-loyalists/

[১০] https://roar.media/bangla/main/world-news/camp-bucca-birthplace-of-isis/

[১১] https://news.vice.com/video/the-islamic-state-full-length

[১২] https://www.thecairoreview.com/essays/the-yazidi-genocide/

[১৩] https://www.haaretz.com/middle-east-news/syria/isis-capital-falls-u-s-backed-rebels-take-full-control-of-raqqa-1.5458338

[১৪] https://www.npr.org/sections/thetwo-way/2017/12/09/569607362/isiss-last-stand-falls-in-iraq-prime-minister-says

[১৫] https://www.albawaba.com/news/defeating-isis-syria-may-bring-more-chaos-kurds-1114230

[১৬] https://www.theguardian.com/world/2017/oct/22/kurds-bitter-defeat-iraq-reclaims-kirkuk

[১৭] https://interactive.aljazeera.com/aje/2017/50-years-illegal-settlements/index.html

[১৮] https://www.institutkurde.org/en/institute/who_are_the_kurds.php

[১৯] https://www.aa.com.tr/en/middle-east/27-electoral-coalitions-approved-for-iraq-polls/1032488

[২০] https://www.reuters.com/article/us-mideast-crisis-iraq-election/iraqs-supreme-court-rules-against-election-delay-idUSKBN1FA0KS

[২১] http://www.rudaw.net/english/middleeast/iraq/130120182

[২২] https://www.economist.com/middle-east-and-africa/2018/05/19/a-cleric-who-once-tormented-america-seems-to-have-won-iraqs-election

[২৩] https://edition.cnn.com/2018/05/16/politics/sadr-iraq-us-election/index.html

[২৪] http://www.rudaw.net/english/analysis/16052018

Please follow and like us: