//বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা

বাংলাদেশে শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা

আলোকচিত্র তাসলিমা আখতার

মে দিবস আসে। মে দিবস যায়। তাতে বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর ভাগ্য কদাচিৎই বদলায়।

বাংলাদেশে শ্রমিকের সংখ্যা ৫ কোটি ৩৭ লাখ। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠই দিনমজুর ও ক্ষেতমজুরের কাজে নিয়োজিত। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো, সেই প্রতিবেদন অনুসারে, এই দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৩৯.৮৭% নারী শ্রমিক। অর্থাৎ গার্হস্থ্য পরিসরের বাইরে কারখানাতেও এই দেশে শ্রমের নারীকরণ (Feminization of Labor) ঘটেছে। এর একটা কারণ হয়তো এই যে, সামন্ত-পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীকে সাত চড়ে রা না কাড়ার শিক্ষা দেয়া হয়, পুঁজিবাদী মালিকরা তাই নারীদেরকে তাদের কারখানায় নিয়োগ দিতে পছন্দ করে। অর্থাৎ এখানে পুঁজিবাদ সুপরিকল্পিতভাবে পিতৃতন্ত্রের সুযোগ নেয়। ফলে পুঁজিবাদ সামন্ত-পিতৃতন্ত্রকে উৎখাত করে বিকশিত হয়, ইওরোপের ক্ষেত্রে এই বিশ্লেষণ অনেকটা সঠিক হলেও, উপনিবেশিক ও নয়াউপনিবেশিক সমাজগুলোতে পুঁজিবাদ জীবনের সর্বক্ষেত্রেই সামন্ত-পিতৃতন্ত্রের সাথে খাপ খাইয়েই টিকে থাকে।

বিবিএসঃ রিপোর্ট অন মনিটরিং অফ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভে (এমইএস) ২০০৯, অর্থ মন্ত্রণালয়, এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১১, জুন প্রকাশিত নানা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,

বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা ২ কোটি ৩৩ লাখ, হোটেল রেস্তোরাঁ ও দোকানে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ৮২ লাখ, কারখানা শ্রমিকের সংখ্যা ৭২ লাখ, পরিবহন শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ লাখ, এবং নির্মাণ শ্রমিকের সংখ্যা ২১ লাখ।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০এ বলা হয়েছেঃ

“সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি – মানুষের ওপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে

অনুচ্ছেদ ১৪ বলছেঃ

 “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে – কৃষক ও শ্রমিককে – এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি প্রদান করা

অনুচ্ছেদ ১৫ বলছেঃ

 “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়ঃ

 (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;

(খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার

(গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং

(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার

এই সবই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের জন্য এসব ঐচ্ছিক কিছু নয়। আবশ্যিক হওয়ার কথা।

১৯৬৯এর গণঅভ্যুত্থানের সময় অব্যাহত শ্রমিক আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার গঠিত নূর খাঁ কমিশন জাতীয় নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ করেছিল ১৫৫ টাকা। ১৯৭১এর পর থেকে কিছু খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হলেও জাতীয় নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় নি। আবার যেসব খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেসব খাতের ক্ষেত্রেও, ন্যূনতম মজুরি বাজারের দ্রব্যমূল্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কীনা এবং শ্রমশক্তি উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের জন্য যথেষ্ট কীনা এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমলে নেয়া হয় নি।

বাংলাদেশে একসময় পাট, সুতা, বস্ত্র, ইস্পাত, কাগজ ইত্যাদি শিল্প বেশ শক্তিশালী অবস্থায় ছিল। আশির দশক থেকে এসব উৎপাদনশীল খাতকে ঠাণ্ডা মাথায় ধবংস করে তা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে পোষাক শিল্পের মাধ্যমে। তাই বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমিকরা শ্রেণীগতভাবে সবচে ঘনীভূত ও সংগঠিত অবস্থায় আছেন পোষাক শিল্পেই। এই দেশের মোট ৫১৫০টি কারখানায় কর্মরত আছেন ৪০ লাখ শ্রমিক যার ৮০%ই নারী। পোষাক শিল্প নিয়ে উচ্ছ্বসিত ব্যক্তিবর্গ দেশে বিদেশে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বলে থাকেন এই শিল্প বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক রফতানি আয়ের উৎস, যদিও, এখানে খুব বড়ো একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। আপাতদৃষ্টিতে রফতানি আয়ের ৭৮.১৫% আসে পোষাক শিল্প থেকে, কিন্তু নিট বা মোট রফতানি আয় যদি হিসেব করা হয়, তাহলে এটা ৩০%এ নেমে আসবে। কারণ পূর্বোল্লিখিত পাট-সুতা-বস্ত্র-ইস্পাত-কাগজের মতো শিল্পগুলোর কাঁচামাল ছিল দেশী, বিপরীতে পোষাক শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, ফলে রফতানি আয়ের বড়ো অংশ সেখানেই খরচ হয়ে যায়।

মাছের তেলে মাছ ভাজা, এই আর কি!

এই শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আশির দশক থেকেই সরকার পোষাক শিল্পমালিকদেরকে বিভিন্ন সুযোগসুবিধা প্রদান করে আসছে। যেমন কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর মুক্তির সুযোগ, কোনো শুল্ক ও কর না দিয়ে উৎপাদন সংক্রান্ত মেশিনারি আমদানি, দেশের ভেতরে কাঁচামালের ভ্যাট ফেরত, রফতানি এলসির বিপরীতে কাঁচামাল এলসি (ব্যাক টু ব্যাক এলসি) অনুমোদন, বিশেষ ক্ষেত্রে রফতানি মূল্যের ২৫ ভাগ ঋণ সহায়তা, রফতানি আয়ের ৭.৫% সরাসরি ফরেন কারেন্সিতে কনভার্ট করার সুযোগ, রফতানিকারকদের জন্য আয়কর রেয়াত, ইপিজেড এলাকায় অবস্থিত কারখানার জন্য বিশেষ শুল্ক ও রেয়াত সুবিধা, বিদ্যুৎ বিলে ১০% ভর্তুকি ইত্যাদি ইত্যাদি। এতো সুযোগসুবিধা এই দেশে আর কোনো শিল্পমালিকদেরকে প্রদান করা হয় না।
এতো সুযোগসুবিধার শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা কী পান?

২০১০এ প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে,

ঘন্টা প্রতি তুরস্কের শ্রমিকরা পান ২.৪৪ ডলার, মেক্সিকোর শ্রমিকরা পান ২.১৭ ডলার, চিনের শ্রমিকরা পান ১.৮৮ ডলার, শ্রীলংকা-ভিয়েতনামের শ্রমিকরা পান ০.৪৪ ডলার, বাংলাদেশের শ্রমিকরা পান ০.১৮ ডলার। টাকায় হিসেব করলে ঘন্টা প্রতি তুরস্কের শ্রমিকরা পান ১৯৫.২০ টাকা, মেক্সিকোর শ্রমিকরা পান ১৭৩.৬০ টাকা, চিনের শ্রমিকরা পান ১৫০.৪০ টাকা, শ্রীলংকা-ভিয়েতনামের শ্রমিকরা পান ৩৫.২০ টাকা, বাংলাদেশের শ্রমিকরা পান ১৪.৪০ টাকা। ২৬ দিনের হিসেব ধরে তুরস্কের শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ৪০,৬০২ টাকা, মেক্সিকোর শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ৩৬১০৯ টাকা, চিনের শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ৩১২৮৩ টাকা, শ্রীলংকা-ভিয়েতনামের শ্রমিকদের মজুরি ৭৩২২ টাকা, বাংলাদেশের শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ২৯৯৫ টাকা।

বিশ্বের সবচে শস্তা শ্রমিক বাংলাদেশের পোষাক শ্রমিক।

মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা যেসব পোষাক মালিকরা ১৫-২০ ডলারে বিক্রি করছেন তা ইওরোপ-আমেরিকায় বিক্রি হচ্ছে ১০০ ডলারে। এর মধ্যে সেই রাষ্ট্র নিচ্ছে ৩০ ডলার, বিদেশি কোম্পানি নিচ্ছে ৫০-৬০ ডলার, এবং বাংলাদেশের পোষাক শ্রমিকের কপালে জুটছে আধা ডলারেরও কম। এই শোষণকে শতকরায় প্রকাশ করতে ভয় লাগে, পৃথিবীর আর কোথাও, শ্রমিকরা এই মাত্রার শোষণের শিকার হয় না।

বর্তমানে পোষাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রায় ৩০০০ টাকা। এর মধ্যে বেসিক ২০০০ টাকা, বাসা ভাড়া ৮০০ টাকা, আর চিকিৎসা ২০০ টাকা। এই দেশে ৮০০ টাকা ভাড়ার বাসা কই পাওয়া যায় আর ২০০ টাকায় চিকিৎসা কোথায় করানো যায় সেটা অবশ্য আমি জানি না, আমার মনে হয়, কেউই জানে না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (International Labor Organization, or, ILO) এক হিসেব অনুসারে শ্রমিকদেরকে যে দারিদ্র্য সীমার উর্ধবে রাখতে হয় তাহলে তাদের মাসিক মজুরি হওয়া উচিত ২০০০০ টাকার কাছাকাছি। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি মাসিক মজুরি দাবি করে ১২০০০ টাকা, আর বাংলাদেশের শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন ১৬০০০ টাকা। তোতা ভাতে বিলাই বেজার হয়, এসব ন্যায়সঙ্গত দাবিদাওয়ায় বেজার হয় প্রচুর সুযোগসুবিধা পাওয়া পোষাক মালিকেরা এবং তাদের পক্ষের সরকার, তারা এসব দাবিদাওয়ায় “গার্মেন্টস শিল্প ধবংসের ষড়যন্ত্র” দ্যাখে।

কেটিএস, ফিনিক্স, তাজরিন, রানাপ্লাজা, ট্যাম্পাকোসহ আরো অসংখ্য কারখানায় শ্রমিক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জন্য একটি স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কখনো আগুনে পুড়িয়ে আর কখনো ভবন ধবসিয়ে নৃশংসতম উপায়ে শ্রমিকদেরকে হত্যা করা হয়। মালিকপক্ষ ও সরকারি পত্রিকাগুলো এইসব কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডকে ট্র্যাজেডি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১০,১৪,১৫কে যদি সিরিয়াসলি নেই, কেউ সিরিয়াসলি নেয় কীনা জানি না, তাহলে এই সাংবিধানিকভাবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার ‘অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব’ পালন করতে নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হয়েছে।

এহেন শ্রমিকবিরোধী পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে প্রতিবছর মে দিবস উপলক্ষ্যে যেসব সুন্দর সুন্দর বাণী প্রদান করা হয় তা নির্মম রসিকতা আর সুপরিকল্পিত ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এইসব বাণীকে প্রত্যাখ্যান করাই মে দিবসের শিক্ষা। শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য জীবনধারণ মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা, আর দূরবর্তী লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে মজুরি দাসত্বের অবসান ঘটানো, শ্রমিকদের মধ্যে এই শ্রেণীসচেতনতা শাণিত করাই সমাজপরিবর্তনকামীদের কাজ।

মে দিবস পালন করার এটাই একমাত্র উপায়।

এই লেখায় প্রদত্ত বিভিন্ন তথ্যের জন্য আমি সাধারণভাবে বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট এবং বিশেষভাবে তাসলিমা আখতারের কাছে কৃতজ্ঞ।

(১ মে ২০১৭য় প্রথম ইস্টিশনে প্রকাশিত হয়েছিলো)

Please follow and like us: