//আমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস / স্টিফেন হকিং – ধারাবাহিক অনুবাদ ১

আমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস / স্টিফেন হকিং – ধারাবাহিক অনুবাদ ১

১ শৈশব

আমার বাবা, ফ্রাঙ্ক, ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের বর্গা চাষীদের ভেতর থেকে এসেছিলেন। তাঁর দাদা – আমার দাদার দাদা জন হকিং – খুব ধনী কৃষক ছিলেন। কিন্তু তিনি অসংখ্য খামার খরিদ করেন এবং এই শতাব্দীর শুরুর দিকের কৃষি মন্দায় দেউলিয়া হয়ে যান। তাঁর ছেলে রবার্ট – আমার দাদা – তাঁর বাবাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি নিজেই দেউলিয়া হয়ে পড়েন। সৌভাগ্যক্রমে, বোরোব্রিজে রবার্টের বৌয়ের মালিকানাধীন একটা বাড়ি ছিল, যাতে তিনি একটি ইশকুল চালাতেন। আর এতে অল্পস্বল্প আয়রোজগারও হত। তাঁরা তাই তাঁদের ছেলেকে অক্সফোর্ডে পাঠাতে পেরেছিলেন, যেখানে সে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলো।

আমার বাবা ধারাবাহিকভাবে বৃত্তি আর পুরস্কার পেয়ে এসেছেন, যা তাঁকে সমর্থ করে তুলেছিলো, বাড়িতে বাপমার কাছে কিছু টাকা পাঠাতে। তারপর তিনি গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের চিকিৎসাশাস্ত্রীয় গবেষণায় চলে যান, আর ১৯৩৭এ, সেই গবেষণাকার্যের অংশ হিসেবে পূর্ব আফ্রিকা সফর করেন। যখন যুদ্ধ শুরু হল, কঙ্গো নদী যেদিকে বয়ে গেছে ঠিক সেদিকে আর আফ্রিকার ভেতর দিয়ে তিনি যাত্রা করলেন, যাতে ইংল্যান্ডগামী একটা জাহাজ ধরা যায়, যেখানে তিনি সামরিক সার্ভিসে স্বেচ্ছাসেবামূলকভাবে অংশ নিয়েছিলেন। যা-হোক, তাকে বলা হল, যে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রীয় গবেষণার জন্যই বেশি মূল্যবান ছিলেন।

আমার মা জন্মেছিলেন স্কটল্যাণ্ডের ডানফের্মলিনে। তিনি ছিলেন এক পারিবারিক চিকিৎসকের আট সন্তানের তৃতীয়টি। সবচেয়ে বড়ো বোনটি ছিলেন ডাউন সিনড্রোমের রোগী, যিনি একজন সেবাপ্রদানকারীর সাথে আলাদাভাবে থাকতেন, তেরো বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত। আমার মায়ের বয়স যখন বারো, তখন পরিবারটি দক্ষিণে ডেভনে চলে আসে। ঠিক আমার বাবার পরিবারের মতো, তাদের পরিবারটাও স্বচ্ছল ছিলো না। তথাপি, তারাও আমার মাকে অক্সফোর্ডে পাঠাতে সমর্থ হয়। অক্সফোর্ড থেকে পাশ করে বেরোনোর পরে, আমার মা বেশ কিছু চাকরিতে ঢোকেন। এর মধ্যে একটা ছিল কর পরিদর্শকের চাকরি। যেটা তার পছন্দের ছিলো না। তিনি সেক্রেটারি হবেন বলে সে-চাকরিটা ছেড়ে দেন, আর এভাবেই, যুদ্ধের শুরুর দিকের বছরগুলোতে আমার বাবার সাথে দেখা হয় তার।

আমার জন্ম ১৯৪২এর ৮ জানুয়ারিতে, গ্যালিলিওর মৃত্যুর ঠিক ৩০০ বছর পরে। যা-হোক, আমার হিসেব অনুযায়ী, অই দিনটিতে আরো ২০০০০০ শিশু জন্ম নিয়েছিলো। তাদের কেউ পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলো কিনা, সেটা আমার জানা নেই।

আমার জন্ম হয়েছিলো অক্সফোর্ডে, যদিও আমার বাপমা তখন লন্ডনে বাস করছিলেন। এর কারণ ছিলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা একটা বিনিময় চুক্তিতে এসেছিলো যে তারা অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে বোমা ফেলবে না, ব্রিটিশরা যদি হেইডেলবার্গ ও গতিনজেনে বোমা না ফেলে। এই ধরণের সভ্য আয়োজন যে আরো অনেক শহরে সম্প্রসারিত করা যায় নি সেটা একটা করুণার বিষয়।

আমরা উত্তর লন্ডনের হাইগেটে থাকতাম। আমার বোন ম্যারির জন্ম হয়েছিলো আমার জন্মের আঠারো মাস পর, এবং এটা আমাকে বলা হয়েছে, যে আমি তার আগমনটা ভালোভাবে নেই নি। আমাদের বয়সের ব্যবধানটা খুব কম হওয়ায় পুরো শৈশব জুড়ে আমাদের ভেতর নির্দিষ্ট একটা বিরোধ চলে এসেছে। যা-হোক, আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এই বিরোধটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, যেহেতু আমরা হেঁটে গেছি যে যার পথে। সে ডাক্তার হয়েছে, যা সন্তুষ্ট করেছে আমার বাবাকে।

আমার বোন ফিলিপা জন্মায় যখন আমার বয়স প্রায় পাঁচের কাছাকাছি, এবং চারপাশটায় কী ঘটে চলেছে, সেটা বোঝার অধিক সামর্থ্য রাখি। আমার মনে আছে, আমি তার আগমনের জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলাম, যেনো খেলা করার মানুষের সংখ্যা তিন হয়। সে ছিলো খুবই সংবেদনশীল আর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এক শিশু, আর আমি সবসময়ই তার মূল্যায়ন আর মতামতকে শ্রদ্ধা করে এসেছি। আমার ভাই এডওয়ার্ডকে দত্তক নেয়া হয়েছিলো অনেক পরে, যখন আমার বয়স ছিল চৌদ্দ, ফলে আমার শৈশবে তার তেমন কোনো ভূমিকা ছিলো না। বাকি তিনটা বাচ্চার চেয়ে সে খুবই আলাদা ছিল, পুরোপুরি অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং অবুদ্ধিজীবী, যা আমাদের জন্য সম্ভবত ভালোই ছিলো। সে ছিলো জটিল আবেগসম্পন্ন এক শিশু, কিন্তু তাকে পছন্দ না করে থাকাটাও কঠিন ছিল। ২০০৪এ সে মারা যায়, মৃত্যুর কারণটা কখনোই যথাযথভাবে নির্ধারণ করা যায় নি। সবচে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটা হচ্ছে, তার ফ্ল্যাটের সংস্কারকাজের জন্য সে যে আঠা ব্যবহার করছিলো, তা থেকে উদগিরীত বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণেই সে মারা যায়।

(চলবে…)

Please follow and like us: