অ্যান্থ্রপয়েডঃ রেইনহার্ড হেইড্রিককে আততায়িত করা চেকদের গল্প

Photo Internet Movie Database

১৯৩৮এর সেপ্টেম্বরে মিউনিখে হিটলারের সাথে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, আর ইতালির নেতাদের একটি কনফারেন্স হয়েছিলো। হিটলার হুমকি দিয়েছিলো, যদি তাকে চেকোস্লোভাকিয়া দখল করতে না দেয়া হয়, সে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেবে। এই মামাবাড়ির আবদার মেনে নেয়া হয়েছিলো, একটিও গুলি না ছুঁড়ে, নাজি জার্মানি অনায়াসে দখল করে নিয়েছিলো চেকোস্লোভাকিয়া।

এক বছর পর হিটলার পোল্যাণ্ড দখল করে, এবং পৃথিবী আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের সম্মুখীন হয়। চেকোস্লোভাক কারখানাগুলো জার্মানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু উৎপাদন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলো, নাজি শাসনের বিরুদ্ধে চেক প্রতিরোধের কারণে। হিটলার তার থার্ড-ইন-কমান্ডকে পাঠায় নাজি শাসনের বিরুদ্ধে যে-কোনো ধরণের প্রতিরোধকে নস্যাৎ করে দিতে।

লোকটার নাম রেইনহার্ড হেইড্রিক, তবে তার নৃশংসতার জন্য সে অল্প সময়েই অর্জন করেছে আরেকটি উপাধি… প্রাগের কসাই।

*

নাজিরা এসেছে রেইনহার্ড হেইড্রিকের আততায়ীদের খোঁজে। এক চেক নিজের পরিবারকে বাঁচাতে দলত্যাগ করেছে, নাজিদের কাছে গিয়ে, বলে দিয়েছে আততায়ীরা আশ্রয় পেয়েছে এই বাসায়। ছেলেটা তখন বেহালা বাজাচ্ছিলো।

দরজা ভেঙে ঢুকে বাপ-মা-ছেলেকে দেয়ালের বিপরীতে দাঁড় করালো, খুন করতে নয়, জিজ্ঞাসাবাদ করতে। বোকা মা নাজিদেরকে বললো, আমার ছেলে একজন বেহালাবাদক, ওকে তোমরা জানে মেরো না। আততায়ীরা কোথায় এই প্রশ্নের জবাব না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ঘুষি দিয়ে মহিলাকে মাটিতে ফেলে দিলো এক নাজি। নাকমুখ দিয়ে গলগল করে বেরোতে লাগলো রক্ত। মহিলা কৌশলে ওয়াশরুমে গিয়ে আত্মহত্যা করলো, গোপনে সংরক্ষিত বিষ খেয়ে, সব দেশপ্রেমিক চেকই তখন সাথে বিষ রাখতো। যাতে শত্রুর হাতে ধরা পড়লে কাজে লাগে। মরে যাবে, শত্রুদেরকে কোনো তথ্য দেবে না।

অল্পবয়সী ছেলেটার ওপর শুরু হল অমানুষিক অত্যাচার। মুখে ফানেল ঢুকিয়ে ঢালতে লাগলো মদ, যাতে দম আটকে আসে, জীবন যেনো মৃত্যুর চেয়ে কষ্টকর হয়ে ওঠে। তুই বেহালা বাজাস তাই না, এই বলে এক নাজি হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে দিলো সেই ছেলের হাত।

তোর মাকে দেখবি, ওকে আমরা রক্ষা করেছি।

মাথাটা রক্ষা করেছি।

নাজিরা মহিলার কাটা মাথা এনে দেখালো তার ছেলেকে, সে তখন আর সহ্য করতে পারলো না, কাঁদতে কাঁদতে বললো আততায়ীরা আছে চার্চে।

ওরা সাত জন। ছয় ঘন্টা ধরে চার্চটা দখলে রাখতে পেরেছিলো। প্রত্যেকের পিস্তলে একটা করে গুলি ছিলো, তাই একজনও নাজিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে নি, মাথায় ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো।

*

রেইনহার্ড হেইড্রিক নাজি জার্মানির তৃতীয় প্রধান ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিল, স্বয়ং হিটলার আর হিমলারের পরেই ছিল তার স্থান।

‘ইহুদি প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান’ তার ব্রেইন চাইল্ড।

ইওরোপ থেকে ইহুদিদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পুরো পরিকল্পনা এই লোকের মাথা থেকে বেরিয়েছে।

অ্যান্থ্রপয়েড ছিল হেইড্রিককে আততায়িত করার অপারেশনের কোডনেম। লন্ডনে প্রবাসী চেক সরকার এই উদ্যোগ নেয়। উদ্যোগটা সফল হয়েছিলো।

হেইড্রিকের মৃত্যুতে নাজিদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। তারা ৫০০০ চেককে হত্যা করে শোধ নেয়। নারী, পুরুষ, শিশু।

হেইড্রিকের মৃত্যুপরবর্তী ঘটনাবলী দেখে টনক নড়ে যুক্তরাজ্যের। উইনস্টন চার্চিল মিউনিখ চুক্তিকে বাতিল ঘোষণা করেন। ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামে চেকস্লোভাকিয়া গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে ওঠে।

অ্যান্থ্রপয়েড (২০১৬) সেই সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *