আগোরাঃ হেলেনিজমের শেষ আলো নিভে যাওয়ার গল্প

চতুর্থ শতক, আলেক্সান্দ্রিয়া।

এককালের পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার উপক্রম, দিন দ্রুত বদলাচ্ছে, পাগানিজমের প্রতাপ কমছে আর জনপ্রিয়তা বাড়ছে ক্রিশ্চিয়ানিটির। নগরীর রাজপথে প্রায়শই পাগান আর ক্রিশ্চানদের মধ্যে বিরোধ বেঁধে যাচ্ছে, ইহুদিরা দুইদলের মাঝখানে পড়ে স্যান্ডউইচড হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একজনকে এই বিরোধ স্পর্শও করছে না।

তিনি দার্শনিক হাইপেশিয়া। অসামান্য তাঁর সৌন্দর্য আর অদ্ভূত তাঁর জ্ঞান। শিক্ষার্থীদের যিনি সাম্প্রদায়িক লাইনে বিভক্ত করেন না। তাঁর কাছে পাগান, ইহুদি, ক্রিশ্চান সবাই সমান। সবাই প্রকৃতির অংশ। ক্রিশ্চান দাসদের ওপর অত্যাচারে তাঁর হৃদয় কাঁদে। তিনি প্রতিবাদ করেন, গোপনে আহতদের শুশ্রুষা করেন।

সুদিনের সম্ভাবনার আশায় উন্মত্ত ক্রিশ্চানরা যখন ঢোকে আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে, পুরনো পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞানের আধার গ্রন্থকে পাপপুস্তক হিসেবে চিহ্নিত করে ছিন্নভিন্ন করতে, তখনও হাইপেশিয়া নিজের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করতে চান গ্রন্থগুলোকে।

তাঁকে গোপনে ভালোবাসে তাঁর বিশ্বস্ত দাস দাভুস। সে ক্রিশ্চান হয়েছে, প্রচারক আম্মোনিয়াস তাকে বুঝিয়েছে ক্রিশ্চিয়ানিটি দয়ার ধর্ম, পরম ভ্রাতৃত্ববোধে রুটি ভাগ করে খায় ক্রিশ্চানরা। এক ঘটনায় হাইপেশিয়া তাকে মুক্ত করে দেয়।

ক্ষমতার পটপরিবর্তনে তাঁর শিক্ষার্থীদের অনেকেরই কপাল খোলে, যারা ক্রিশ্চান হয়েছে, তাঁর প্রতি যাদের আপাত অনুরাগের খামতি নেই।

কিন্তু তাঁকে সহ্য করতে পারে না একজন। সে বিশপ সিরিল। সে পবিত্রগ্রন্থ খুলে মানুষ ক্ষ্যাপায়, কোনো নারী চর্চা করতে পারে না জ্ঞানের, ঈশ্বর বলেছেন তাঁরা নীরব থাকবে।

সে ঘোষণা করে হাইপেশিয়া এক ধর্মদ্রোহী ডাইনি। সরকার চালায় অরিসটিস, সে ক্রিশ্চান, ছাত্র হাইপেশিয়ার। সে বাঁচাতে চেষ্টা করে হাইপেশিয়াকে, ব্যর্থ হয়।

রোমান সৈনিকরা বিশেষ নিরাপত্তা দিতে চায় হাইপেশিয়াকে। তিনি প্রত্যাখান করেন। মানুষের ওপর তাঁর বিশ্বাস শিশুর মতোই সীমাহীন।

তারপর একদিন তিনি রাজপথে বেরোন, তাঁকে খুঁজে পায় একদল উন্মাদ, তারা তাঁকে টেনে একটা চার্চে নিয়ে যায়। দাভুস এই উন্মাদদের ভিড়ে ঢুকে যায় সন্তর্পণে। উন্মাদরা তাঁকে বিবস্ত্র করে, ছুরি খুঁজতে থাকে একে অপরের কাছে, ইশ্বরের ঘরে এই পাপিনীর চামড়া জ্যান্ত ছালিয়ে নেবে।

দাভুস ওদেরকে বলে এই ধর্মদ্রোহীর অপবিত্র রক্তে হাত নোংরা করে লাভ নেই, তোমরা কিছু পাথর নিয়ে এসো।

উন্মাদের দল পাথর খুঁজতে যায়, দাভুস হাইপেশিয়াকে বাঁচাতে পারবে না, তবে সে চায় মহিলার যন্ত্রণা যথাসম্ভব কমাতে। হাইপেশিয়াকে হত্যা করে দাভুস, শ্বাসরোধ করে, যাতে পাথরের আঘাতে তিলে তিলে যন্ত্রণা সয়ে মরতে না হয়। ফিরে এসে মহিলার মৃতদেহের ওপর পাথর ছুঁড়তে থাকে উন্মাদরা, তাঁর মৃতদেহ আগুনে পোড়ায়, এই হত্যাকাণ্ডটির জন্য চার্চ বিশপ সিরিলকে সেইন্টহুড দিয়ে সম্মানিত করে। অদ্ভুত শোনালেও সত্য, ক্রিশ্চানরা যেই সেইন্ট ক্যাথরিনকে শহিদ হিসেবে দেখেন, অনেকেই মনে করেন তিনি আসলে দার্শনিক হাইপেশিয়া! জাস্ট পাগান আর ক্রিশ্চানদের অবস্থানটা উল্টে দেয়া হয়েছে, ক্ষমতার স্বার্থে উল্টে দেয়া হয়েছে পার্পিট্রেট্রর আর ভিকটিমদের অবস্থান। কৌম-ক্বওম-কমিউনিটির বিশ্বাস হিসাবে ধর্ম এক জিনিশ, পুরোহিতদের হাতিয়ার হিসাবে ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিশ। কৌম-ক্বওম-কমিউনিটির বিশ্বাস ছাপিয়ে গিয়ে পুরোহিতদের হাতিয়ার হয়ে উঠলে ধর্ম মানুষকে কতোটা ধর্ষকামী করে তুলতে পারে, হাইপেশিয়া হত্যাকাণ্ড তারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ, সিরিলেরা আজো দেশে দেশে সক্রিয় আছে।

আগোরা (২০০৯) নির্মিত হয়েছে হাইপেশিয়ার রক্তাক্ত স্মৃতিতে, নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাসেল ওয়েইজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *