//ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদারের প্রোপাগাণ্ডাঃ হিল ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরাম অফ সিএইচটির বক্তব্য

ব্যারিস্টার নিঝুম মজুমদারের প্রোপাগাণ্ডাঃ হিল ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরাম অফ সিএইচটির বক্তব্য

কল্পনা চাকমা
১২ জুন ১৯৯৬ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিখোঁজ’
আলোকচিত্র-ঋণস্বীকারঃ এড. রিপেল চাকমা, দৃক পিকচার গ্যালারি/দ্য ডেইলি স্টার

জনাব নিঝুম মজুমদার একজন স্বনামধন্য ব্যারিস্টার এবং বাংলাদেশের অনলাইন জগতে খুবই পরিচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকও বটে। লন্ডনে বসে আইন প্র্যাকটিস করেন বর্তমানে। তিনি সম্প্রতি বিলাইছড়ি ধর্ষণ ইস্যু নিয়ে একটি লেখা (https://www.facebook.com/nijhoom.majumder/posts/1641911545897539) তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি ইনিয়েবিনিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে কথা বলে এমন কিছু তথ্য দিতে চেয়েছেন যেটি মূলত তাঁর যৌক্তিক অবস্থানকে নড়েবড়ে করে। তাঁর লেখায় তিনি এমন কিছু কথা বলেছেন যা সরাসরি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর হুমকিস্বরূপ। মিথ্যাচার ও কথার সূক্ষ্মতার ফাঁকতালের মাধ্যমে করা তাঁর এই মিথ্যাচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

তাঁর লেখার কিছু কন্টেন্ট ধরে আলোচনা করছিঃ

১. শুরুতেই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন নারী ধর্ষণ না লিখে “মারমা নারী ধর্ষণ” কেন উল্লেখ করতে হবে। মুসলমান মেয়ে ধর্ষিত হলে ধর্ম লেখা হয় না, অন্য ধর্মের হলে লেখা হয়। এই ‘দ্বৈতনীতি’ দেখে তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

জনাব মজুমদারের কাছ থেকে এই ধরণের বক্তব্য আসা খুবই অপ্রত্যাশিত। আমরা সন্দিহান, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে নারী ধর্ষণ-নিপীড়ন চলে সেটিকে তিনি আদৌ জাতিগত নিপীড়নের হাতিয়ার মনে করেন কীনা! তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোক। তিনি নিশ্চয়ই জানেন ১৯৭১এ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তিন লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত হারানোর কথা এমনি এমনি বলা হয় না। এসব নারী ধর্ষিত-নিপীড়িত হয়েছিলেন বাঙালিদের ওপর পরিচালিত জাতিগত নিপীড়নের কারণে,  এথনিক ক্লিনজিং এর অংশ হিসেবে।

তিনি কথায় কথায় প্রমাণ চাইছেন। জাতিগত নিপীড়নের অসংখ্য প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। গুগলে পর্যাক্রমিকভাবে সাল উল্লেখপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি লিখে সার্চ করলেই অনেকগুলো সংবাদ পাওয়া যাবে যেখানে স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে কোন বছরে কতজন নারী ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন, সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা কোথায় সংঘটিত হয়েছে, কয়টি গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এসব শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান এবং নিঝুম নিশ্চয়ই জানেন যে পরিসংখ্যান একটি আস্ত গাধা!!! এটি শুধুমাত্র সংখ্যাকে প্রকাশ করে, ভয়াবহতাকে নয়।

২. তিনি একজন আইনজীবী,  কথায় কথায় প্রমাণ চান। কিন্তু তিনি নিজে এসে খোঁজ করে প্রমাণ চান নি,  তিনি চেয়েছেন অন্য একজনের সূত্র ধরে। সেটিকে তিনি প্রমাণ হিসেবে দেখাতে চাইছেন। এখানে জনাব মজুমদারের জানাশোনায় প্রচন্ড রকমের ঘাটতি আছে। প্রথমত,  যে মেজর তানভীর রমেল চাকমা হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত সে হাসপাতাল থেকে রানি য়েন য়েনসহ ভলান্টিয়ারদেরকে মেরে ধর্ষিত নারীদেরকে (খেয়াল রাখবেন মারমা নারী লেখা হয় নি!!!) তুলে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, বিলাইছড়ি ক্যাম্পের মতো স্থানে মেজর তানভীরদের পোস্ট দেয়া হয় না, কাজেই ধর্ষণে তানভীরের সংশ্লিষ্টতা কেউ দাবি করেনি। নাম এসেছে বরং ওয়ারেন্ট অফিসার মিজানের কথা।

কাজেই মেজর তানভীর ধর্ষণের সাথে জড়িত এই দাবি সম্বলিত তাঁর বক্তব্যের প্রমাণ আমরা তাঁর কাছে চাইছি।

আর সেইসাথে তিনি প্রমাণ চাইছেন হাসপাতালে মেয়েদের জোর করে তুলে নেয়া ও রাণী-ভলান্টিয়ারদের ওপর হামলার ঘটনায় তানভীরের সংশ্লিষ্টতার। কি অদ্ভুত যুক্তি!!! তিনি একজন আইনজীবী হয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন এবং নিজস্ব যুক্তি দাঁড় করিয়ে খারিজ করে দিলেন সব।

তিনি পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন,  মেজর তানভীরকে কিভাবে চিনতে সমর্থ হলেন প্রত্যক্ষদর্শীরা?  চিন্তার কারণ নেই, উত্তরও দিয়ে দিচ্ছি আমরা। গত কিছুদিন ধরে এই মেজর তানভীর হাসপাতালে যাওয়া-আসার মধ্যে ছিল। হাসপাতালে ভীতসন্ত্রস্ত পরিবেশ সৃষ্টিতে সে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। তার শারীরিক উপস্থিতি,  গলার স্বর দিয়ে তাকে সহজেই চিনে ফেলার কথা। আশা করি উত্তর পেয়েছেন।

৩. জাতি-গোত্র-ধর্মকে হাইলাইট করে খবর প্রচারকে তিনি দেখছেন চালাকি করার একটা প্রচেষ্টা। কিন্তু কেন করা হচ্ছে,  করতে হচ্ছে সেসব কি তিনি একটু বিচার করবেন?  দেশের সংখ্যালঘু জাতিগুলোর কথা বাদ দিলাম,  হিন্দুরা দেশ ছেড়ে কেন চলে যাচ্ছে?  সংখ্যায় কেন কমে যাচ্ছে তারা যদি এ দেশ সত্যই তাদের ধারণে সমর্থ হতো?  দেশের সংখ্যালঘু জাতিগুলোর উপর বৃহৎ জাতির নিপীড়নকে তিনি কিভাবে দেখেন?  বৃহৎ গোষ্ঠীর এই নিপীড়নকে কেন সেভাবে বলা যাবে না?  বরং সেসবকে লুকিয়ে রেখে বলার চেষ্টাটাই এক ধরণের অসততা। নিজের ঘরের ময়লাগুলো যেন প্রকাশ না পায় সেজন্য প্রবলভাবে তা প্রতিরোধের চেষ্টা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৪টি জাতিসত্ত্বার উপর বৃহৎ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে হামলা চালালে কিভাবে সংবাদ পরিবেশন করা দরকার বলে আপনি মনে করেন? “বাঙালি কর্তৃক মানুষের উপর হামলা” নাকি “মানুষ কর্তৃক মানুষের উপর হামলা” নাকি “মানুষ কর্তৃক জংলীদের উপর হামলা”???

৪. আর জনাব মজুমদার,  কিছু লেখার আগে খোঁজখবর নিয়ে লিখতে হয়। আপনার ভাষায় “কোথাকার এক রাণী” (য়েন য়েন) মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক কিছু বলার আগেই এই কথাগুলো সাধারণ মানুষ বলে আসছে। ২২ জানুয়ারি তারিখে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর এ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। আপনি কি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই স্টেটমেন্টে বিশ্বাস করেন যে “এক সদস্য একটি মেয়ের হাত ধরায় সে ভয় পেয়ে যায় এবং চিৎকার করতে শুরু করে” এই কথাটি?  “কোথাকার এক রাণী” হাসপাতালে দেখা করেছিলেন ২৪ জানুয়ারিতে এবং মাইক হাতে কথা বলেছেন গত ১৯ ফেব্রুয়ারিতে। এর আগেই সকল তথ্য মানুষের কাছে পৌছেঁ গিয়েছে। হাসপাতালকে আর্মি-পুলিশ-এজেন্টের মাধ্যমে দুর্গ বানানোর চিত্র আমরা মোবাইলে স্থিরচিত্র হিসেবে রেখে দিয়েছি।

৫. প্রমাণ, তথ্য যদি আপনার প্রয়োজন হয় তবে কেন এত লুকোছাপা?

গত ২৬ তারিখে আমরা যখন হাসপাতালে যাই তখন চার-পাঁচ ভ্যান আর্মি কেন হাসপাতাল পাহারা দিবে?  এসপি, মেজর তানভীর গিয়ে জোরজবরদস্তি করবে মেয়েদের উপর?  সংবাদ সম্মেলনের কথা বলবেন,  দয়া করে সেখানে ছোট বাচ্চাটির কথাগুলো (মারমা ভাষায় বলা। আপনার বিশ্বস্ত লোক দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নিবেন। কারণ আপনি তো আবার আমাদের বিশ্বাস করেন না!!!) শুনুন – সে কী বলেছে,  কী বলতে চাইছে। যেহেতু বোন দুজন মা-বাবার কাস্টডির চাইতে রাজা-রাণীর কাস্টডিতে যেতে চাইছে, অধিকতর নিরাপদ ভেবে, সেখানে আপনি বাধা দেয়ার কে কোন মামলা তো করা হয়নি! কেন সেখানে পুলিশ গিয়ে বাধা প্রদান করবে?

আর বড় বোন প্রাপ্তবয়স্ক,  নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে তাঁর আইন অনুসারে,  সেখানে জোরজবরদস্তি করা হবে কেন??

৬. ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা’ বাঙালি-অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে তাদের মেরে ফেলছে, যুবকদের বাধ্য করছে সন্ত্রাসী হতে এসব কথা লন্ডনে বসে জানতে পেরেছেন এবং এ নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান করছেন। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন রাঙ্গামাটির একজন বিশিষ্ট পাহাড় গবেষক (যদিও কোন আর্টিকেল বা জার্নাল তিনি প্রকাশ করেছেন কীনা জানা নেই, তাঁর নামে কোথাও কিছু পাওয়া যায় না,  এরপরও তিনি গবেষক!) ও সাংবাদিককে,  যিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে দৈনিক ইনকিলাবসহ কিছু পত্রিকায় লিখে নিজেকে উঁচুস্তরের গবেষক বলে ভাবতে শুরু করেছেন। এদের চ্যালেঞ্জ জানাতে চাই,  পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যদি গবেষণা করতে চান তবে আর্টিকেল বা জার্নাল প্রকাশ করুক।

আচ্ছা যা হোক। জনাব মজুমদার যেহেতু জানেন, প্রমাণ তো দেবেন আশা করি। বলেছেন শত শত প্রমাণ দিবেন। শত শত প্রমাণ দেয়া লাগবে না, দুয়েকটা দিলেই হবে, আমরা সেই প্রমাণগুলো একটু দেখতে চাই।

দেখতে চাই এসব প্রমাণের ভ্যালিডিটি কদ্দুর। সেইসব প্রমাণের বিপরীতে আমরাও কোন তথ্য হাজির করতে পারি কীনা সে বিষয়েও আমাদের চেষ্টা থাকবে। আর সেইসাথে তাঁর প্রিয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী-কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত ১৪টি গণহত্যার তথ্যও হাজির করা যায় কিনা সেটারও চেষ্টা আমাদের থাকবে।

৭. সেটেলারদের কেন সেটেলার বলা হয় এই প্রশ্নটা অনেকটা “সারারাত রামায়ণ পড়ে সকালে সীতা কার বাপ” জিজ্ঞেস করার মতো। সেটেলার কাদেরকে বলা হয়,  কেনো বলা হয়,  ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংএর মাধ্যমে কখন এদের পুশইন করা হয়েছে এসব জানার আগ্রহ না থাকলে আসলে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা খুব স্বাভাবিক। তাই এ বিষয়ে আমরা ব্যারিস্টার সাহেবকে একটু পড়াশোনা করার পরামর্শ দিচ্ছি।

১৯৭৯-৮০ সাল থেকে ঘটে চলা সেটেলমেন্টের কারণে আসা সেটেলার বাঙালি আর এর আগে থেকে পাহাড়ে স্বাভাবিকভাবে মাইগ্রেন্ট হওয়া বাঙালিদের মধ্যে পার্থক্য আশা করি নিজ চোখেই পেয়ে যাবেন।

আর সেটেলমেন্ট ও মাইগ্রেশনের মধ্যে ফারাকটা আপনার মতন একজন আইনজীবীকে বুঝিয়ে দেয়ার কোনো দরকার আছে বলে মনে করছি না।

৮. নিঝুম দাবি করেছেন পাহাড়ে রাজার শাসন চলে!!! তাহলে এমপি,  জেলা প্রশাসক,  ইউএনও,  পুলিশ সুপার,  পার্বত্য জেলা পরিষদ এগুলো আছে কেন?  জনাব মজুমদার,  আপনি আইনজীবী মানুষ।

১৯০০ সালের শাসনবিধি,  ১৮৫৪ সালের ক্যাপ্টেন টি এন লুইসের কথা,  এরও আগে ১৭৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহের কাহিনী একটু পড়ে দেখুন। ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে চট্টগ্রামের একটি জেলা ঘোষণার আগ পর্যন্ত সেটি কি ছিল একটু খোঁজ নিন। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিতে কি ছিল সেগুলোও জানুন।

আর রাজতন্ত্র আমাদের এখানে কি হিসেবে চলমান আছে সেটা জানুন আগে। আপনি যথেষ্ট দাম্ভিক ব্যক্তি,  আপনাকে সব গুলে খাইয়ে দিতে হয়, নইলে খান না। একটু দম্ভ ভুলে খেয়ে নিন, নইলে আজেবাজে কথা ছড়িয়েই যাবেন।

৯. পার্বত্য চট্টগ্রামকে কোথায় জুম্মল্যান্ড নামকরণ করা হয়েছে?  আলাদা মুদ্রা কোথায় প্রচলন করা হয়েছে??  প্রমাণ দেখাতে পারবেন???

জুমল্যান্ড নামে কোন লিফলেট কি হাতে পেয়েছেন যারা বলছে তারা বিচ্ছিন্ন দেশ চায়?

পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশনা,  বক্তব্য বা অন্য কোথাও এই জুম্মল্যান্ডের অস্তিত্ব পেয়েছেন কিনা?

অন্ধের হাতি দর্শনের মতো এই কথাগুলো বলা আপনাকে সাজে না।

আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যদি বিচ্ছিন্নতা হয় তবে তাই হোক। কারণ ১৯৭১এ আপনি বা আপনারা কেন আলাদা দেশ চেয়েছিলেন?  পাকিস্তানের সাথে একত্রিতভাবে বাস করলেই তো পারতেন!

নিপীড়িত জাতি সম্পর্কে  মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের একজন গবেষক যদি এমন নিপীড়কসুলভ ধারণা পোষণ করে তবে তার রাজনৈতিক বোঝাপড়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়!

১০. এক ত্রিদিব রায় নিয়ে অনেক কিছু বললেন। গোলাম আযম,  নিজামী,  সাঈদী, মুজাহিদরা যখন দেশে ফিরে মন্ত্রী হয়ে দেশের পতাকা উড়িয়ে বেড়িয়েছে তখন আপনাদের এই দম্ভ আসলে দেখানো উচিত ছিল। ত্রিদিব রায় কোন কারণে,  কোন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েছিলেন সেটা ইতিহাস পর্যালোচনার বিষয়। চোখ বন্ধ করে মুখ দিয়ে যা আসলো তাই বলে দিলাম নিজের ইচ্ছেমতো,  সেটি পারবেন না। এ বিষয়ে ভালোভাবে জানার চেষ্টা করুন এইচ টি ইমাম সাহেবের কাছ থেকে যিনি তৎকালীন রাঙামাটির ডিসি ছিলেন। তেনারা কেন শুরুতে রাজার সাথে বৈঠক করে পরে কিছু না জানিয়েই রাজাকে বিপদের মধ্যে ফেলে পালিয়েছিলেন?  ত্রিদিব রায় পাকিস্তানেই পরে চলে যান,  সেখানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন। আর বাংলাদেশের গণহত্যার হোতাদের যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ও বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টরা দেশে পুনর্বাসন দেয় ও রাজনীতি করার সুযোগ দেয় তখন আপনাদের এই দম্ভ কোথায় থাকে?? যুদ্ধপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রেও টালবাহানা কম দেখি নি। ২০১৩র শাহবাগ আন্দোলন তো তার বড় প্রমাণ। আর রাজাকারের ছেলে রাজাকার,  এই ধারণাগুলো উগ্র জাতীয়তাবাদেরই একটি পরিচায়ক। আর আপনার প্রিয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে তো দুইজন প্রেসিডেন্টসহ (শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান) অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার রক্ত লেগে আছে। বাই দ্য ওয়ে, আপনার শ্বশুর কুখ্যাত ফ্রিডম পার্টির একজন নেতা,  মিল্লাত পত্রিকার একজন সম্পাদক এবং রাজাকারদের সাথে আঁতাতের ইতিহাস তো আছেই। সে বিষয়ে আপনি কোন বক্তব্য দেবেন, নিঝুম?

১১. আপনি অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের বইয়ের রেফারেন্স টেনেছেন।

আমরা নাঈম মোহাইমেন সম্পাদিত Between Ashes & Hopes: Chittagong Hill Tracts in the Blind Spot of Bangladesh Nationalism (Drishtipat Writers’ Collective, 2010), সিএইচটি কমিশনের  LIFE IS NOT OURS:  Land and Human Rights in the Chittagong Hill Tracts Bangladesh (CHT Commission, 1991), হিল উইমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক সম্পাদিত কল্পনা চাকমার ডায়েরি,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মোহসিনের The politics of Nationalism: The Case of the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh (UPL, 1997), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ভিজিটিং স্কলার গবেষক  স্বপন আদনানের Migration, Land Alienation, and Ethnic Conflict: Causes of Poverty in the Chittagong Hill Tracts of Bangladesh (Research and Advisory Services, 2004) এই বইগুলোসহ অসংখ্য জার্নাল, পুরোনো প্রকাশনা, আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বইপত্র রেফারেন্স হিসেবে টেনে আনতে পারবো।

আপনি যেহেতু একজন গবেষক,  তাই আপনার জানার কথা যে গবেষণায় কোন তথ্য সারা পৃথিবী জুড়ে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে, আর আপনি যে রেফারেন্স দিয়েছেন তা এতোই দুর্বল যে তা সহজেই খারিজ করে দেয়া যায়।

১২. আপনি যে দেশে বসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে বুলি কপচাচ্ছেন সে দেশে মানবাধিকার রক্ষাকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রাখা হয়। আপনি আপনার বক্তব্যের মাধ্যমে সোজাসুজি মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন এবং মিথ্যা তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে সাপোর্ট করছেন, যার মাধ্যমে সহজেই আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, CHT Commission সহ অনেক মানবাধিকার সংস্থার বক্তব্যের পুরো উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আপনার প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমরা দায়ের করতেই পারি।

পোস্টস্ক্রিপ্টঃ

ফেসবুকে দেয়া আপনার এই পোস্টের মতো হাজারো প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে। সেসব নিয়ে আমরা অবশ্য মাথা ঘামাই না। আপনি স্বনামধন্য ব্যক্তি হওয়ায় এ নিয়ে আমরা কিছু বললাম।

আপনার লেখাটি আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সেখানে স্পষ্ট জাতিগত ঘৃণা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় নি। যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান তাদেরকে আপনি মিথ্যা তথ্য ও ভুল ধারণা দিয়ে দিলেন খুবই সূক্ষ্ম কূটকৌশলের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ খালি আওয়ামী লীগের নয়,  বাঙালিরও নয়। বাংলাদেশ আমাদেরও, পাহাড়িদেরও। কাজেই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের ন্যায্য অধিকার আমাদেরকে দেয়া হোক।

পার্বত্য চট্টগ্রামে চারদশকব্যাপী সেনাশাসনের অবসান ঘটানো হোক।

আর আমাদের বিরুদ্ধে চালানো প্রোপাগান্ডাগুলোর উচিত জবাব সম্মিলিতভাবে দেয়া হোক। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সবসময় সত্যকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে, তথ্যপ্রবাহের যুগে গায়ের জোরে সত্যকে আর ঢেকে রাখার উপায় নেই।

গণমাধ্যমে অবিরত জাত্যাভিমানী-সাম্প্রদায়িক প্রোপাগাণ্ডা চালানো হলেও সত্য একদিন তার আপন আলোয় উদ্ভাসিত হবে এটি আমরা বিশ্বাস করি।

 

এই লেখায় প্রকাশিত দৃষ্টিভঙ্গি হিল ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ফোরামের নিজস্ব, আর লেখা বিষয়ক সমস্ত দায়ভারও তাদের।

Please follow and like us: