//কোর্কোরোঃ নাজিদের অধিকারে যাওয়া ফ্রান্সে জিপসিদের জীবন

কোর্কোরোঃ নাজিদের অধিকারে যাওয়া ফ্রান্সে জিপসিদের জীবন

১৯৪৩, নাজি-অধিকৃত ফ্রান্স।
 
জিপসিদের একটা দল কিছুদিনের জন্য গ্রামে এসেছে। যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের বিশেষ কোনো মাথাব্যথা নাই। তাঁরা কোনো পক্ষ নয়, ‘সভ্য’ মানুষের মতো তাঁরা যুদ্ধ করে না, ইওরোপে যাযাবর সম্প্রদায় হিসেবে ঘুরে বেড়ায়। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র নিয়েও তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নাই, তাঁরা বিশ্বাসই করে না সীমান্তে, কাঁটাতারে। তাঁরা নীল আকাশের মতো সীমাহীন প্রকৃতির সন্তান। গ্রামে এক পশুচিকিৎসক থাকেন, নতুন এসেছেন এক ইশকুলশিক্ষিকা, তাঁরা জানেন ইওরোপের পরিস্থিতি কী। তাঁরা এই জিপসিদের সতর্ক করার চেষ্টা করেন।
 
ফরাশি একটা বাচ্চা অজানা কারণে বাপমাকে হারিয়েছে, পথে ঘুরতে ঘুরতে সন্ধান পেয়েছে জিপসিদের। জিপসিরা শুরুতে বাচ্চাটাকে ঠাঁই দিতে চায় না, তবে পরে সে তাদের একজন হয়ে যায়। এটাই একদিন এই বাচ্চাটার মৃত্যু ডেকে আনবে।
 
এক ফরাশি ‘ভদ্রলোক’, যাকে এতোদিন জিপসিরা নিজেদের বন্ধু জেনে এসেছিলো, নাজিদের আগমনে তার আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। সে রাজাকাররূপে আবির্ভূত হয়, নাজিদের সাথে হাত মেলায়, যারা তখন তছনছ করছে ফ্রান্সকে। তাঁর সহায়তায় নাজিরা জিপসিদের একটা ক্যাম্পে ঢোকায়, জিপসিদের ঘোড়া লুঠ করে, এবং নিষিদ্ধ করে দেয় মুক্ত চলাচল।
 
এক জিপসি যখন আহতগলায় জিজ্ঞেস করে কেনো কুকুরবেরালের মতো ট্রিট করা হচ্ছে তাঁদেরকে, লোকটা শীতল কণ্ঠস্বরে বলে, ফ্রান্সকে বিষমুক্ত করার জন্য।
 
অন্তত একটি জিপসি পরিবারকে বাঁচাতে পশুচিকিৎসক নিজের বাড়ি সেই পরিবারের নামে লিখে দেন। পরিবারটি ক্যাম্প থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি পায়। পশুচিকিৎসকের ফ্ল্যাটে ওঠে।
 
কিন্তু তারা ফ্ল্যাটে অভ্যস্ত হতে পারে না। এটাকে তাদের কাছে আরেকটা ক্যাম্প মনে হয়। প্রকৃতির পরিসরের বাইরের সবকিছুই তাঁদের কাছে বন্দিশিবির।
 
এক জিপসি মুখ ধোয়ার জন্য ওয়াশরুমে যায়। পানির কল খুলে সে প্রথমে অবাক হয়। তারপর হয় বিরক্ত।
 
মানুষ কী করে পারে পানিকে আটকে রাখতে?
 
জিপসি বেসিনের কল ছেড়ে দেয়। পানি উপচে পড়তে থাকে। সে খুশীতে চিৎকার করে বলেঃ ফ্রি দা ওয়াটার!
 
ইশকুলশিক্ষিকা আর পশুচিকিৎসক গোপনে আরেকটা কাজ করে। জাল কাগজপত্র বানানো। নাজিদের থেকে কিছু মানুষের জীবন রক্ষা করতে।
 
কিন্তু একদিন দু’জনেই নাজিদের হাতে ধরা পড়ে, দু’জনের ওপরই চালানো হয় হিমশীতল অত্যাচার।
 
জিপসি পরিবারটি এক রাতে ফ্ল্যাট ছেড়ে পালায়, কিন্তু তারা বেশিদূর যেতে পারে না। নাজি সৈন্যরা আর ফরাশি পুলিশ তাঁদেরকে খুঁজছিলো। ভোরবেলা ধরে ফেলে।
 
জিপসি এক পুরুষ কিছুতেই ক্যাম্পে যাবে না। সে দৌড় দেয়। এক নাজি সৈন্য তার পেছন পেছন দৌড়ায়। লোকটা জান বাঁচানোর জন্য একটা গাছে ওঠে। সৈন্যটা গুলি করলে গাছ থেকে পড়ে যায়। নিচে একটা জলাশয়, তার পানিতে পড়ে যায়, শেষ রক্ষা হিসেবে সেখানে লুকোতে চায়। নাজি সৈন্যটা গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
 
ফরাশি বাচ্চাটাকে এক জিপসি যুবক বাঁচাতে চায়, ফরাশি পুলিশকে বলে সে আমাদের কেউ না, তাকে ছেড়ে দিন। কিন্তু জিপসিদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে রোদে পুড়ে ও বিষ্টিতে ভিজে ফরাশি বাচ্চাটার গায়ের রঙও আর আগের মতো শাদা নাই, অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। ফলে ফরাশি পুলিশ কথাটা বিশ্বাস করে না।
 
জিপসিদের টেনেহিঁচড়ে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদেরকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তাঁরা কোথায় হারিয়ে গেলো, সে যেনো জেনে রাখে, তাঁদেরকে আকাশ আর আলোর পৃথিবী থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিলো।
 
যে জিপসি পরিবারটি টনি গাতলিফের ২০০৯-এ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি কোর্কোরোর [অ্যালোন/নিঃসঙ্গ] অনুপ্রেরণা, তাঁদেরকে অন্তরীণ করা হয়েছিল বেলজিয়ামের মেশেলেনে। ১৯৪৪এর ১৫ জানুয়ারিতে এঁদেরকে আউশউইৎজে পাঠানো হয়। ইশকুলশিক্ষিকার চরিত্রটিও বাস্তব। ফরাশি প্রতিরোধ যোদ্ধা ভেতে লুন্ডির দ্বারা এ চরিত্রটি অনুপ্রাণিত, যাকে রাভেন্সব্রুকে পাঠানো হয়েছিলো, যিনি ১৯৪৫এ মুক্তি পান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইওরোপে বাসরত জিপসিরা সংখ্যা ছিলো ২ মিলিয়ন, অর্থাৎ, ২০ লাখ। নাজিরা আড়াই থেকে পাঁচ লাখ জিপসিকে হত্যা করে, অর্থাৎ গড়ে প্রতি চারজনের একজনকে। রঙবেরঙের জাতীয়তাবাদের পতাকা ওড়াতে ওড়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্যে, ফ্রান্সে, জার্মানিতে, হাঙ্গেরিতে, পোল্যাণ্ডে, ইন্ডিয়ায়, তুরস্কে… নাজিরা আবার ফিরে আসছে।
Please follow and like us: