//রামপালের বাঘ ও আধখাওয়া কয়লা চায়ের গল্প

রামপালের বাঘ ও আধখাওয়া কয়লা চায়ের গল্প

আলোকচিত্র ডেইলি স্টার

রামপালে একটি বাঘের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলুম। বাঘ বললো, হালুম; আমি জবাব দিলাম, ওয়ালাইকুম। তখন সন্ধ্যার সময়। খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। কেমন একটা মন খারাপ মন খারাপ ভাব। আশেপাশে অবশ্য কোনো রূপবতী কন্যা ছিলো না। বাঘেদের জীবন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মতো নয়।

বাঘটা পশুর নদীতে ডুবে যাওয়া কয়লা দিয়ে তৈরি করা বিশেষ কয়লা চায়ে টোস্ট বিস্কুট চুবিয়ে চুবিয়ে খাচ্ছিলো। আমাকে বললো, খাও। আমি বললাম, না। সে বললো, লক্ষীটি, প্লিজ একটা বিস্কুট খাও। আমি বললাম, না, আমি বিস্কুট খাবো না। সে বললো, তাহলে চা খাও, কয়লা চা। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাপটার দিকে হাত বাড়ালুম।

বাঘটাকে বললুম, দেশেবিদেশে কিছু উন্নয়নবিরোধী লোক চেঁচামেচি করছে, বলে কিনা “সুন্দরবন ধবংস করে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না”। সে কি চায়? নাকি চায় না?

সে বললো, চায়না।

আমি অবাক হয়ে গেলুম, তুমিও চিঙ্কু, বাঘ? সে হেসে ফেললো, আরে না, তা না। আমি বললুম, তাহলে কেনো তুমি বললে, চায়না!

বাঘ চোখ টিপ দিলো, পত্রিকা পড়ো না? খুবই অসভ্য বাঘ। নিয়মিত সাজু খাদেমের প্রোগ্রাম দেখে মনে হয়!

সে যাই হোক, অসভ্য বাঘের অসভ্যতাটা কোনো মতে হজম করে বললুম, পড়ি তো! বাঘ বললো, কোন পত্রিকা পড়ো, দৈনিক মোসাহেবকণ্ঠ? আমি বললাম, না না, দেশিবিদেশি অনেককিছুই পড়ি।

তাহলে তো জানার কথা তোমার, বললো বাঘ, চীনের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

আমি বললাম, ও এই কথা, হে হে। জ্ঞান অর্জনের জন্য কে চীন দেশে যাবে? এই রামপাল পর্যন্ত যে এসেছি এই কতো!

সে বললো, শুধু কি চীন, ইওরোপেও দেশে দেশে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। কয়লা উনিশ শতকের প্রযুক্তি, বর্তমান দুনিয়ায় অচল। এইটা একুশ শতক, নবায়নযোগ্য জ্বালানিই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ।

এইবার কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। বাঘটা নিতান্তই মূর্খ। ওর দেখি কোনো ধরণের বাস্তব জ্ঞানই নেই।

তুমি জানো বাঘ, আমি বললুম, আমাদের দেশে এমনকিছু আছে যা অইসব দেশে নেই?

হ্যাঁ জানি তো, বাঘ বললো, শেখ হাসিনা।

আমি বললুম, আরে আহাম্মক বাঘ, আমি তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা বলছি না। আমি বলছি আলট্রা সুপার ক্রিটিকাল টেকনোলজির কথা। বিজ্ঞাপনে দেখিয়েছে এই প্রযুক্তি দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে, কোনো ক্ষতি হবে না, সুন্দরবন সুন্দর থাক বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।

বাঘ আড়চোখে তাকালো, আলট্রা সুপার নাকি সুপার? আমি বললাম, মানে! এবার বাঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, আচ্ছা, থাক।

আমি বললুম, তো, তুমি কি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে?

বাঘ বললো, না।

আমি বললুম, কিন্তু রামপাল আর সুন্দরবনের মধ্যে তো বিশাল দূরত্ব, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে কেনো?

বাঘ গম্ভীরমুখে বললো, জাতীয় সংসদ ভবন থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত যেতে কতোক্ষণ লাগবে তোমার, জানো?

আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললাম, না তো, কেনো?

বাঘ বললো, ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে ধরে গেলে ১৩.৫ কিলোমিটার, আর যদি টঙ্গি ডাইভার্শন রোড ধরে যাও ১৬.৮ কিলোমিটার।

তো?

সুন্দরবন থেকে রামপালের দূরত্ব ঠিক ১৪ কিলোমিটার। কালকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বানালে নিঃসন্দেহে তাতে জাতীয় সংসদ ভবনের লোকজনের ক্ষতি হবে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র বানালে সুন্দরবনের পশুপাখির ক্ষতি হবে।

এইবার শেষ চেষ্টা করলুম, তাতে সমস্যা কি? মানুষের জন্য মায়া নাই বাঘের জন্য কান্নাকাটি। ইউনূইস্যার টাকা খেয়ে এরা দাভোসেও ক্যাওম্যাও করেছে!

কি বললে তুমি, বাঘটা হুংকার দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলো, বুঝতে পারলাম কতো বড়ো ভুল করে ফেলেছি।

পড়ি মরি করে ওখান থেকে দৌড়ে পালালুম।

আমার কয়লা চা আধখাওয়া অবস্থায় পড়ে থাকলো।

Please follow and like us: