//ন্যায্যতাঃ তিনটি শিশু ও একটি বাঁশির গল্প

ন্যায্যতাঃ তিনটি শিশু ও একটি বাঁশির গল্প

আলোকচিত্র গেটি ইমেজেস

অমর্ত্য সেনকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই, আমি ধরে নিচ্ছি, আমরা সবাই তাঁর ব্যাপারে কমবেশি জানি। ২০০৯এ তিনি The Idea of Justice (ন্যায্যতার ধারণা) নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি চমৎকার একটি গল্প বলেছেন, যার মর্মবস্তু মর্মান্তিক শোনালেও সত্যঃ ন্যায্যতা সম্পর্কে সর্বজনসম্মত কোনো নৈতিকতা নেই।

বক্তব্য অবিকৃত রেখে গল্পটি সরলীকৃত-সংক্ষেপিত করে বলি।

আপনার গ্রামে একটি কাঠের বাঁশি পাওয়া গেলো। আপনি দেখতে পেলেন, তিনটি শিশু তর্ক করছে, বাঁশিটি কার পাওয়া উচিত তা নিয়ে। ধরা যাক আপনাকে তারা ন্যায়বিচারক সাব্যস্ত করলো, অর্থাৎ আপনি যাকে বাঁশিটি দেয়ার রায় দেবেন, সেই সেটি পাবে।

মার্কিন রাজনীতিতাত্ত্বিক ডেভিড স্ক্লোসবার্গের মনে করেন, ন্যায্যতার তিনটি দিক থাকেঃ বিতরণ (Distribution), প্রক্রিয়া (Procedure), ও স্বীকৃতি (Recognition)। অমর্ত্য সেন-বর্ণিত গল্পে আমরা শুধু বিতরণের দিকটি নিয়ে মাথা ঘামাবো, যদিও কেউ বিস্তারিত বিশ্লেষণে গেলে বাকি দুটো দিকও চলে আসতে পারে। যা-হোক, গল্পে ফিরি।

শিশু তিনজন একে একে তাঁদের নিজ নিজ দাবির পক্ষে যুক্তি দেবে আপনার কাছে। আপনি সবারটা শুনবেন, তারপর আপনার রায় দেবেন। মনে করি তারা তিনজনঃ আন্নি, শাকিব, তাহিয়া।

আন্নি প্রথমে বললো, তিনজনের মধ্যে সেই একমাত্র বাঁশি বাজাতে জানে, এবং অন্য দুজন মাথা নেড়ে সায় দিলো। তাই আন্নিকে বাঁশিটি দিলে সে সুখী হবে, বাঁশি বাজিয়ে গ্রামবাসীকেও আনন্দ দিতে পারবে। যেহেতু সে সবচে উপযুক্ত, তাকেই দেয়া হোক।

তারপর শাকিব বললো, উপস্থিত তিন শিশুর মধ্যে সেই সবচে গরিব, অন্য দুজন স্বীকার করলো তারা অপেক্ষাকৃতভাবে স্বচ্ছল। শাকিব এতোটাই গরিব যে তার নিজের কোনো খেলনা নেই, সুতরাং বাঁশিটি তাকে দিলে সে খেলা করতে পারবে। যেহেতু সে সবচে বঞ্চিত, তাকেই দেয়া হোক।

সবশেষে তাহিয়া বললো, এই বাঁশি সে তৈরি করেছে শ্রম দিয়ে, অন্য দুজন নিশ্চিত করলো সে সত্য বলছে। তাহিয়া শ্রম দিয়ে এই বাঁশি বানিয়েছে, তাই এর ওপর তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেহেতু সে বাঁশির মালিক, তাকেই দেয়া হোক।

কী রায় দেবেন?

আপনি যদি উপযোগবাদী (Utilitarian) হন, তাহলে আপনি বিশ্বাস করেন সুখের সর্বোচ্চীকরণ (the Maximization of Happiness) ও বৃহত্তর উপকারে (Greater Good)এ। সে-ক্ষেত্রে আপনি সম্ভবত আন্নির পক্ষেই রায় দেবেন। কারণ একদিকে বাঁশিটি তার সুখ বৃদ্ধি করবে, আর অন্যদিকে তার বাজানো বাঁশি শুনে গ্রামবাসীও আনন্দ লাভ করবে।

কিন্তু যদি আপনি সমতাবাদী (Egalitarian) হন, তাহলে আপনি বিশ্বাস করেন ধনি-গরিবের বৈষম্য হ্রাসে (Reducing the Wealth Gap)। সে-ক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবেই আপনি শাকিবের পক্ষে রায় দেবেন। কারণ সে বাঁশি বাজাতে জানুক আর নাই জানুক, তার বঞ্চনা হ্রাস করা দরকার, বাঁশিটি পেলে যা ঘটবে।

ধরি, আপনি মুক্তিবাদী (Libertarian), আপনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার অধিকারে (Protecting the Right of Personal Property) বিশ্বাস করেন। সে-ক্ষেত্রে কিন্তু আপনি তাহিয়ার পক্ষে রায় দেবেন। কারণ তার নিজের শ্রমের ফসল ভোগ করার অধিকার, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার, শুধু তারই আছে।

তো, এই তিন সম্ভাব্য রায়ের মধ্যে কোনটি নৈতিকভাবে ন্যায্য (morally Just) আর কোনটি নৈতিকভাবে অন্যায্য (morally Unjust)?

অমর্ত্য সেন বলছেন,

“The general point here is that it is not easy to brush aside as foundationless any of the claims based respectively on the pursuit of human fulfilment, or removal of poverty, or entitlement to enjoy the products of one’s own labour. The different resolutions all have serious arguments in support of them, and we may not be able to identify, without some arbitrariness, any of the alternative arguments as being the one that must invariably prevail. I also want to draw attention here to the fairly obvious fact that the differences between the three children’s justificatory arguments do not represent divergences about what constitutes individual advantage (getting the flute is taken to be advantageous by each of the children and is accommodated by each of the respective arguments), but about the principles that should govern the allocation of resources in general. They are about how social arrangements should be made and what social institutions should be chosen, and through that, about what social realizations would come about. It is not simply that the vested interests of the three children differ (though of course they do), but that the three arguments each point to a different type of impartial and non-arbitrary reason. […] As was mentioned earlier, theorists
of different persuasions, such as utilitarians, or economic egalitarians, or labour right theorists, or no-nonsense libertarians, may each take the view that there is one straightforward just resolution that is easily detected, but they would each argue for totally different resolutions as being obviously right. There may not indeed exist any identifiable perfectly just social arrangement on which impartial agreement would emerge.” (Amartya Sen, ‘Introduction’, The Idea of Justice, (Cambridge: Harvard University Press, 2009), pp 14-15.)

তাঁর কথাগুলোর সংক্ষিপ্ত ভাবানুবাদ করলে দাঁড়ায়, তিন শিশুর স্বপক্ষেই সিরিয়াস যুক্তি আছে, এর কোনোটিকেই ভিত্তিহীন বলে বাতিল করে দেয়া সম্ভব নয়। এই গল্পটি সম্পত্তি বিতরণের নীতির সাথে সম্পর্কিত, কোন ধরণের সামাজিক আয়োজন থাকবে, এবং কী ধরণের সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে কেমন সমাজ তৈরি করা হবে এসবের সাথে সম্পর্কিত। এমন কোনো শনাক্তিসম্ভব আদর্শভাবে ন্যায্য সামাজিক আয়োজন সম্ভবত কোথায় অস্তিত্বশীল নেই, যেখানে পক্ষপাতহীন চুক্তি আবির্ভূত হতে পারে।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, এমন কোনো সর্বজনসম্মত অবস্থান থাকতে পারে না, যা একক নৈতিক ন্যায্যতার মাপকাঠি তৈরি করবে। ন্যায্যতার ধারণা অদ্বৈতবাদী (Unitarian) নয়, নানাত্ববাদী (Pluralist)। ন্যায্য সমাজ (Just Society) আমরা সবাই চাই, কিন্তু ন্যায্যতার ক্ষেত্রে যেহেতু বহু ধারণা ক্রিয়াশীল, তাই বিভিন্ন আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের জন্য কাঙ্খিত ন্যায্য সমাজের চেহারা বিভিন্ন রকমের হবে।

Please follow and like us: