//যশোর রোডের দু’পাশের বৃক্ষকর্তন ও পরিবেশ ন্যায়বিচার

যশোর রোডের দু’পাশের বৃক্ষকর্তন ও পরিবেশ ন্যায়বিচার

আকৃ রাতুল মুহাম্মদ

যশোর রোড শুনলেই দুটো নাম মাথায় আসে। একটা অ্যালেন গিন্সবার্গ। অন্যটা মৌসুমী ভৌমিক।

“Millions of souls nineteenseventyone
homeless on Jessore road under grey sun
A million are dead, the million who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan”

(September on Jessore Road, Allen Ginsberg)

“ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ী দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায় একাত্তর যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।”

(যশোর রোড, মৌসুমী ভৌমিক)

কিন্তু এগুলো তো পুরনো কথা, ‘৭১এর কথা। East Pakistan বা পূর্ব বাংলা আর নেই। আছে স্বাধীন বাংলাদেশ।

সেই স্বাধীন বাংলাদেশে কী হয় যশোর রোডে?

“যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে শেষ পর্যন্ত দুই পাশের ২ হাজার ৩১২টি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল দুপুরে যশোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে যশোর-বেনাপোল রাস্তা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বৃক্ষ অপসারণবিষয়ক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যশোরের জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় যশোর-৩ আসনের এমপি কাজী নাবিল আহমেদ, যশোর-১ আসনের এমপি শেখ আফিল উদ্দিন, যশোর-২ আসনের এমপি মনিরুল ইসলাম, যশোর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব বেলায়েত হোসেন ও আব্দুল মালেক, স্থানীয় সরকার বিভাগ খুলনার পরিচালক হোসেন আলী খন্দকার, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হোসাইন শওকত, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুন-উজ্জামান, প্রেস ক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সভা সূত্রে জানা যায়, মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণে এরই মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। শিগগিরই কাজ শুরু হবে। কিন্তু মহাসড়কটির দুই পাশে রেইন ট্রি প্রজাতির শতবর্ষী গাছও রয়েছে। সেগুলো অক্ষত রেখে মহাসড়ক চার লেন করা সম্ভব না। এ কারণে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।”

(‘যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ অবশেষে ২ হাজারের বেশি গাছ কাটার সিদ্ধান্ত’, দৈনিক বণিকবার্তা, ৭ জানুয়ারি ২০১৮)

“সড়ক উন্নয়নের জন্য সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গের যশোর রোডেও প্রাচীন গাছগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে বলে জানা গেছে।”

(‘চার লেনের জন্য কাটা পড়বে যশোর রোডের গাছ’, বাংলা ট্রিবিউন, ৬ জানুয়ারি ২০১৮)

বাংলা ট্রিবিউন সীমান্তের ওপারের খবরটা অর্ধেক দিয়েছে, অই খবরের বাকি অংশ হচ্ছে এটাঃ

“১৫ এপ্রিল, বাংলা বছরের প্রথম দিন, বনগাঁ থেকে হাবড়া – যশোর রোড ধরে ৩০ কিলোমিটার রাস্তা হাঁটলেন রাহুল৷ ‘যশোর রোড গাছ বাঁচাও কমিটি’-র একজন প্রচারক হিসেবে৷ কারণ ভয়ংকর এক পরিবেশবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ৷ রাস্তা চওড়া করতে, রাস্তার দু’ধারের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলার৷ ব্রিটিশ আমলে তৈরি, কলকাতার সঙ্গে বাংলাদেশের যশোরের সংযোগরক্ষাকারী যশোর রোড চওড়া করা হবে, ফ্লাইওভার, ওভারব্রিজ তৈরি হবে, আর সেই উন্নয়ণযজ্ঞে আহুতি দেওয়া হবে প্রায় ৪০০০ গাছ৷ সুপ্রাচীন বৃক্ষ সব, যাদের গড় বয়স ৩০০ বছর৷ কাজেই রাহুল এবং তাঁর মতো অনেকেই পথে নেমেছেন প্রতিবাদ জানাতে৷”

(‘যশোর রোডের লড়াই’, ডয়চে ভেলে, ১৭ এপ্রিল ২০১৭)

অর্থাৎ আমরা পশ্চিমবঙ্গের কর্তাদের সংবাদই শুধু পাই আমাদের (ক্লাস) মিডিয়ার কাছ থেকে, ওখানকার লড়াকু জনগণের সংবাদটা সন্তর্পণে হাপিস করে দেয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গের জনগণ একটা পিটিশনও করেছেন, সেটা পড়ুনঃ

https://www.change.org/p/national-green-tribunal-save-trees

কিন্তু তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ, বন্দর, বাঘ, হরিণ, কমিটির মতো খালি গাছপালানদীনালাঘাসফুলপ্রজাপতি নিয়ে হাউকাউ করলেই হবে? উন্নয়ন লাগবে না? রাস্তাঘাট না বানালে কী করে উন্নয়ন হবে?

জনৈক জাহিদ হোসেন তার উপায়ও বাতলেছেন একটাঃ

“রাস্তা বড় করতে হলে গাছ কাটতে হবে- এই চিন্তা হয় বোকামি নয় চালাকি। গাছ বিক্রি করার ধান্দা। রাস্তা বড় করতে হলে গাছ কাটতে হবে- এই চিন্তা হয় বোকামি নয় চালাকি। গাছ বিক্রি করার ধান্দা। রাস্তার দুই পাশ চওড়া করে নয় বরং এক পাশের গাছের পাশ দিয়ে নতুন রাস্তা বানিয়ে রাস্তা বড় করা যায় । এতে পুরাতন রাস্তার দুই পাশেরই গাছের জীবন বাঁচে, রাস্তার পাশে barrier দেয়ার খরচ বাঁচে, নতুন রাস্তার অপর পাশে নতুন করে গাছ লাগানো যায়; ফলে তিন সারি গাছ নিয়ে রাস্তা নয়নাভিরাম ও প্রাকৃতিক হয়।”

পুরো বিষয়টা নিয়ে একটু ভিন্নভাবে ভাবা যাক। মনে করুন এটি যশোর রোডের ব্যাপার নয়। এর সাথে আমাদের জাতীয় আবেগের সম্পর্ক নেই। মনে করুন এটি ময়মনসিংহ বা মানিকগঞ্জ রোড। তাহলেও কী নির্বিচার বৃক্ষকর্তন সমর্থনযোগ্য হয়ে যায়? যশোর রোড বলেই কী প্রতিবাদ করতে হবে? অন্য কোন রোড হলে হাসিমুখে মেনে নিতাম?

আমি নিতাম না।

সারা দুনিয়াতেই জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়াচ্ছে। খুব আশঙ্কাজনকভাবেই বাড়াচ্ছে। আমাদের তথাকথিত সভ্যতাই আমাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে।

অল্প কিছু মানুষ এই বিষয়টা নিয়ে ভাবেন। ক্যানাডিয়ান লেখক-সমাজকর্মী-চলচ্চিত্রকার নাওমি ক্লেইন (১৯৭০-) তাঁদের একজন। তাঁর একটি বই আছে, ‘This Changes Everything: Capitalism vs. the Climate’ নামে, ২০১৪য় বেরিয়েছিলো। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন আমরা আসলে কই যাচ্ছি। ব্যক্তিগতভাবে নয়, এমনকি জাতিগতভাবেও নয়, একেবারে প্রজাতি হিসেবে। কয়েকশো বছর ধরে আমরা যেভাবে জীবনযাপন করছি, যা আমাদের উন্নয়নভাবনা, তা আমাদের প্রজাতিকেই বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যশোর রোডের গাছ কাটার সিদ্ধান্তটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না, এমনকি শুধু বাংলাদেশ-ভারতের ঘটনাও না, এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সেই উন্নয়ন দর্শন থেকে এসেছে যা কয়েকশো বছর ধরে আমাদের প্রজাতিকে বিলুপ্ত হওয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

ক্লেইন সম্প্রতি একটি বক্তৃতায় মোদ্দা কথাটা বলেছেনঃ

“We can give up — wait for the apocalypse. That’s one option. The other option is to stand up in a truly unprecedented way.”

আপনি কী করবেন?

Please follow and like us: