//হুমায়ূন আহমেদ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রঃ একটি বিবেচনা

হুমায়ূন আহমেদ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রঃ একটি বিবেচনা

হুমায়ূন আহমেদ শুভ্রের মতো শুদ্ধতম মানুষ না। তিনি হিমুর মতো মহাপুরুষ প্রকল্পের গিনিপিগও না। তিনি এমনকি মিসির আলির মতো যুক্তিবাদীও না।

তিনি হুমায়ূন আহমেদ।

শুভ্রকে তৈরি করেছিলেন তিনি, কারণ শুভ্র নিষ্পাপ, বাঙালি মধ্যবিত্ত নিষ্পাপ না হলেও সে নিজেকে নিষ্পাপ ভাবতে ভালোবাসে। যদিও প্রাপ্তবয়স্কদের পক্ষে নিষ্পাপ হওয়া সম্ভব নয়। শুভ্র বাঙালি মধ্যবিত্তের নিজেকে নিষ্পাপ ভাবার বাসনা থেকে তৈরি হওয়া একটা চরিত্র মাত্র।

মিসির আলি লজিকের প্রতীক আর হিমু এন্টিলজিকের। এটা সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের বিজ্ঞানবিদ্যা থেকে আসা, একজন বিজ্ঞানের শিক্ষকের, ম্যাটার আর এন্টিম্যাটার দিয়ে দুনিয়া বোঝার প্রচেষ্টা। হিমুর দ্বিতীয় প্রহরে দুজনের দেখা হয়েছিলো, সেখানে স্পষ্টতই হিমু হেরে গেছে, এতো অসহায় তাকে কখনো লাগে নি।

কিন্তু এখান থেকে এই সিদ্ধান্ত টানা খুব কঠিন হবে যে হুমায়ূন আহমেদ স্বয়ং নিজেকেই মিসির আলি ভাবতেন। মিসির আলি হিমুর সৃষ্টিকর্তা হতে পারেন না। কেননা মিসির আলি যুক্তিবিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেন না।

তাহলে হুমায়ূন আহমেদ আসলে কী ছিলেন?

জীবনের শেষদিকে এসে তিনি বাদশাহ নামদার লিখেছেন। সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে। নামের দিক থেকে যিনি তাঁর মিতা হন।

আমার ধারণা এটা হঠাৎ করে ল্যাখেন নাই। দীর্ঘদিন ধরেই এটা লেখার পরিকল্পনা ছিলো তাঁর। হয়তো প্রস্তুতিও ছিলো। গোপন। যথেষ্ট খ্যাতিমান হয়ে ওঠার আগে এই উপন্যাস প্রকাশ করা তাঁর জন্য বিপজ্জনক ছিলো। এমনও হতে পারে হয়তো অনেক আগেই লিখেছেন। পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রেখেছেন, হয়তো, সংশোধনও করেছে অজস্রবার।

যারা হুমায়ূন আহমেদ খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, তাঁরা তাঁর সামন্ত মেজাজ সম্পর্কে ওয়াকেফহাল। হুমায়ূনের বিভিন্ন উপন্যাসে ও চলচ্চিত্রেও যে-জমিদার বা সাবেক জমিদার চরিত্রগুলো আসে, তাঁদের ব্যাপারে লেখকের/নির্মাতার কিছু ছোটোখাটো সমালোচনা থাকলেও, মোটাদাগে জমিদারিকে একটা আভিজাত্যপূর্ণ ভালো ব্যাপার হিসেবেই দ্যাখা হয়। নামের মিল যদি নাও থাকতো, লেখক হুমায়ূনের সম্রাট হুমায়ূনকে পছন্দ হতো, বোধগম্য কারণেই।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের বাদশাহ নামদার ছিলেন, অন্তত তিনি নিজেকে সেভাবেই দেখতে ভালোবাসতেন।

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন উচ্চতর অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে। পুঁজিবাদী সমাজও দেখেছেন। কিন্তু বুর্জোয়া সংস্কৃতি তাকে তেমন টানে নি, রক্তেমাংসে সামন্ত কাউকে টানার কথাও না।

হুমায়ূন আহমেদ জীবনানন্দ দাশকে খুব পছন্দ করতেন, তাঁকেই সবচে বেশি উদ্ধৃত করেছেন, তাঁর উপন্যাসে ও অন্যান্য লেখায়। কিন্তু নিজে জীবনানন্দ হওয়ার চেষ্টা করেন নি। একটা জীবন ভয়াবহ দারিদ্র্য আর অসহায়তায় কাটিয়ে দিয়ে, মরার পঞ্চাশ বছর পর জনপ্রিয়তা আর স্বীকৃতি পাওয়ায়, তাঁর কোনো আগ্রহ ছিলো না।

রূপা তাঁর সবচে অনন্য নারী চরিত্র, কারণ তাঁর উপন্যাসের অন্য নারী চরিত্রগুলোর সাথে রূপাকে মেলানো যায় না। অন্য যেসব নারী তাঁর উপন্যাসে আসে, তাঁরা হয় অগভীর, আর না হয় মধ্যবিত্ত নারীর যাবতীয় সংকটে পর্যুদস্ত। কিন্তু রূপা আলাদা, সে উচ্চবিত্ত, এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। হিমুর জীবনে প্রচলিত অর্থে কোনো প্রেম নেই। এবং বিয়েও নেই। কিন্তু রূপা একজন রহস্যময় নারী হয়ে আছে, যে নাগালের মধ্যেই আছে, কিন্তু যাকে কখনো ছোঁয়া যাবে না। এটা উচ্চবিত্ত নারীকে নিয়ে মধ্যবিত্ত পুরুষের ফ্যান্টাসি, হিমু ‘অন্যরকম’ হলেও, শেষ পর্যন্ত সে মধ্যবিত্ত পুরুষের সমাজেরই অংশ।

হুমায়ূন আহমেদ সচেতনভাবে সাম্প্রদায়িক লোক ছিলেন না, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে ঘৃণা ছড়ান নি। কিন্তু বাঙালি মুসলমানের ইগো তাঁর ভেতর ছিলো, অর্থাৎ তিনি ঠিক সেকুলারও ছিলেন না। ১৯৭১এ যে-রাষ্ট্রটি গঠিত হল, সেটা নানা অর্থেই বাঙালি মুসলমানের ইগোর বহিঃপ্রকাশ, হুমায়ূন আহমেদ এ-রাষ্ট্রের পক্ষের একজন লেখক। তাঁর লেখায় বাঙালি মুসলমান সমাজের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য যে-সব শব্দ আসে, তার তাৎপর্য স্রেফ সাহিত্যতাত্ত্বিক নয়, সমাজতাত্ত্বিকও। তিনি সম্পূর্ণ সচেতনভাবে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যভাষা পরিহার করেছেন, অংশত এই কারণে যে, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যভাষা বাঙালি হিন্দু সমাজ প্রভাবিত। কবিতার ক্ষেত্রে একই কাজ করেছেন আল মাহমুদ। প্রবন্ধে আহমদ ছফা।

হুমায়ুন আজাদ হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসকে অপন্যাস বলেছিলেন, কথাটা ঠিক না ভুল, সেটা তর্কসাপেক্ষ। তবে হুমায়ুন আজাদ কিশোর সাহিত্যিক ও গবেষক হিসেবে অসাধারণ হলেও তিনি যে-সব উপন্যাস লিখেছেন সেগুলো খুবই সাধারণ মানের। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহিদুল জহির, কায়েস আহমেদ, বা মাহমুদুল হকের লেখা কোনো উপন্যাসের পাশে স্থান পাবার যোগ্য নয়।

সাহিত্যের হুমায়ূন আহমেদ আর বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রায়-সমানবয়সী। আর এই দু’য়ের মধ্যে আরেকটা মিলও আছে। দীর্ঘমেয়াদে হুমায়ূন অনেককে হতাশ করেছেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিও, বাঙালি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সম্ভাবনাও ফুরিয়ে আসছে।

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ইতিহাস-নির্ধারিত ভূমিকা যা ছিল, তার কিছুটা পালন করে এবং অনেকটাই না করে, চলে গেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিও যাবে। ইতোমধ্যেই তার মৃত্যুর নানান লক্ষণ দ্যাখা যাচ্ছে।

১৪ নভেম্বর ২০১৭

Please follow and like us: