//মেয়ে আমার, এই অশ্রু লড়াই থেকে এসেছে / বাসেম তামিমি

মেয়ে আমার, এই অশ্রু লড়াই থেকে এসেছে / বাসেম তামিমি

২৯ ডিসেম্বর ২০১৭য় Haaretz.com-এ প্রকাশিত আর্টিকেল, মূল ইংরেজি থেকে বাঙলায় ইরফানুর রহমান রাফিন কর্তৃক একই দিনে অনুদিত

আলোকচিত্র হেইম শোয়ার্জেনবার্গ

এই রাতেও, মধ্যরাতে ডজনখানেক সৈন্য আমাদের ঘরে তল্লাশি চালানোর পরের প্রতিটি রাতের মতো, আমার স্ত্রী নারিমান, আমার ১৬-বছর-বয়সী কন্যা আহেদ, এবং আহেদের কাজিন নূর থাকবে গরাদের পেছনে। যদিও আহেদ এই প্রথমবার গ্রেফতার হল, তোমাদের কারাগার তার জন্য অচেনা কোনো জায়গা নয়। আমার মেয়েটা তার সারা জীবন ইজরায়েলি কারাগারের ভারী ছায়ার নিচে কাটিয়েছে – তার শৈশব জুড়ে আমার দীর্ঘ কারাবাস থেকে তার মা, ভাই ও বন্ধুদের বারংবার গ্রেফতার হওয়ায়, আমাদের জীবনে তোমাদের সৈন্যদের চলমান উপস্থিতি থেকে উৎসারিত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নানা হুমকিতে। সুতরাং তাদের নিজের গ্রেফতার হয়ে যাওয়াটা তো সময়ের ব্যাপার ছিলো। ঘটে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক অনিবার্য ট্র্যাজেডি।

কয়েক মাস আগে, দক্ষিণ আফ্রিকায় একটা সফরে, আমরা একটা দর্শকমণ্ডলীকে ইজরায়েলের জোরজবরদস্তিমূলক শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের গ্রাম নবী সালেহ-এর সংগ্রামকে দলিলায়িত করা একটা ভিডিও পর্দায় প্রদর্শন করেছিলাম। যখন আলো ফিরে এলো, আহেদ উপস্থিত লোকসকলকে তাঁদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ দিতে উঠে দাঁড়ালো। যখন সে খেয়াল করলো, দর্শকদের কারো কারো চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছে, সে তাঁদেরকে বললোঃ “হতে পারি আমরা ইজরায়েল সরকারের শিকার, কিন্তু আমরা আমাদের ন্যায্য দাবিতে লড়াইয়ের জন্যও সমানভাবে গর্বিত, মূল্য দিতে হবে এটা জানা থাকা সত্ত্বেও। আমরা জানতাম এই পথ আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কিন্তু আমাদের পরিচয়, জনগোষ্ঠী হিসেবে ও ব্যক্তি হিসেবেও, প্রোথিত আছে এই লড়াইয়ে, এবং অনুপ্রেরণাও নেয় সেখান থেকেই। আহত ও নিহত কারাবন্দীদের পোহানো দৈনন্দিন যন্ত্রণা ও নিপীড়ণ পেরিয়েও, আমরা ওয়াকেফহাল সেই অসাধারণ শক্তি সম্পর্কে, যা একটা প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ হওয়া থেকে আসে; সেই একনিষ্ঠতা, সেই ভালোবাসা, সেই মহিমান্বিত মুহূর্তগুলো, যা নিষ্ক্রিয়তার অদৃশ্য দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত থেকে আসে।”

আমি একজন শিকার হিসেবে চিহ্নিত হতে চাই না, এবং আমি তাদের কর্মকাণ্ডকে সেই ক্ষমতা দিতে চাই না, যা সংজ্ঞায়িত করবে আমি কে ও আমি কী হবো। আপনারা আমাকে কীভাবে দেখবেন সেটা আমি নিজের জন্য নিজেই নির্ধারণ করি। আমরা চাই না আপনারা আমাদেরকে কিছু ফটোজেনিক অশ্রুর জন্য সমর্থন করুন। আমরা চাই আপনারা আমাদেরকে সমর্থন করুন, কারণ আমি লড়াই বেছে নিয়েছি, আর আমাদের লড়াই ন্যায়সঙ্গত। সেটাই একমাত্র পথ, যাতে একদিন আমরা কান্না বন্ধ করতে সমর্থ হবো।”

দক্ষিণ আফ্রিকার সেই ঘটনাটির কয়েক মাস পরে, যখন সে (ইজরায়েলি) সৈন্যদেরকে চ্যালেঞ্জ করলো, যারা পা থেকে মাথা পর্যন্ত সশস্ত্র, তখন অল্প কয়েকদিন আগে ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে, ১৫-বছর-বয়সী মোহাম্মদ তামিমির মারাত্মকভাবে জখম হওয়া দেখে আসা তাৎক্ষণিক রাগই তাকে তাড়িত করে নি। আমাদের ঘরে ঢুকে এই সৈন্যরা যে উসকানি দিচ্ছিলো সেটাও এই তাড়নার কারণ নয়। না। এই সৈন্যরা, বা অন্যরা যারা কর্মকাণ্ড আর ভূমিকায় একইরকম, আহেদের জন্মের পর থেকেই আমাদের ঘরে অনাকাঙ্খিত ও অনাহূত অতিথি হয়েই এসেছে। না। সে সেখানে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো, কারণ এটাই আমাদের পদ্ধতি, কারণ স্বাধীনতা দানখয়রাত হিসেবে পাওয়া যায় না, আর কারণ ভারী মূল্য দিতে হবে জেনেও, আমরা সেটা দিতে প্রস্তুত আছি।

আমার মেয়েটার বয়স মাত্র ১৬ বছর। অন্য কোনো পৃথিবীতে, তোমাদের পৃথিবীতে, তাঁদের জীবনটা সম্পূর্ণরূপে ভিন্নরকমের দ্যাখাতো। আমাদের পৃথিবীতে, আহেদ আমাদের জনগণের একটা নতুন প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি, তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের। এই প্রজন্মকে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধঘোষণা করতে হয়েছে। একদিকে, অবশ্যই তাদের এই দায় আছে, যেই ইজরায়েলি উপনিবেশবাদের ভেতরে তাদের জন্ম হয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করা ও তার বিরুদ্ধে সেই দিন না আসা পর্যন্ত লড়াই জারি রাখা, যেদিন এটা ভেঙে না পড়বে। অপরদিকে, তাদেরকে সেই রাজনৈতিক স্থবিরতা আর অধঃপতনের মুখোমুখি সাহসের সাথে দাঁড়াতে হবে, যা আমাদের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে। তাদেরকে হয়ে উঠতে হবে সেই জীবন্ত ধমনী, যা আমাদের বিপ্লবকে পুনরুজ্জীবিত করবে, এবং তাকে ফিরিয়ে আনবে সেই মৃত্যু থেকে, যা দশকব্যাপী রাজনৈতিক জড়তা থেকে উঠে আসা ক্রমবর্ধবান নিষ্ক্রিয়তার অবধারিত ফল।

আহেদ সেই অসংখ্য তরুণীর একজন, যে আসন্ন বছরগুলোতে, ইজরায়েলি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেবে। সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়ার কারণে তার ওপর যে আলোকপাত করা হয়েছে তাতে সে উৎসাহী নয়, সে সত্যিকার পরিবর্তনে উৎসাহী। সে কোনো পুরনো পার্টি বা আন্দোলনের ফসল নয়, এবং তার কাজের মধ্য দিয়েই সে একটা বার্তা পাঠাচ্ছেঃ টিকে থাকার জন্য, আমাদেরকে অপকটে আমাদের দুর্বলতার মুখোমুখি হতে হবে, আর আমাদের ভয়কে পরাস্ত করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে, আমার ও আমাদের প্রজন্মের মহত্তম দায়িত্ব হচ্ছে, তাকে সমর্থন করা ও জায়গা ছেড়ে দেয়া; নিজেদেরকে সংযত করা, এবং আমরা যেসব পুরনো সংস্কৃতি আর মতাদর্শের মধ্যে বেড়ে উঠেছি সেসবের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে দুর্নীতিগ্রস্ত না করা ও সেসবে তাদেরকে কারারুদ্ধ না করা।

আহেদ, দুনিয়ার কোনো বাপমা চায় না, তাদের মেয়েটি একটা ডিটেনশন সেলে সময় কাটাক। যা-হোক, আহেদ, আমার চেয়ে গর্বিতও আর কেউ হতে পারবে না। তুমি আর তোমার প্রজন্ম যথেষ্ট সাহসী, শেষ পর্যন্ত, জেতার জন্য। তোমার কর্মকাণ্ড আর সাহস আমাতে সমীহ জাগায়। চোখে পানি এনে দেয়। কিন্তু তোমার অনুরোধ অনুসারেই, এই অশ্রু দুঃখবোধ বা অনুতাপের নয়। লড়াইয়ের।

লেখক পরিচিতিঃ বাসেম তামিমি ফিলিস্তিনি অ্যাকটিভিস্ট ও হারেৎজের কন্ট্রিবিউটর।

Please follow and like us: