//টার্টলস ক্যান ফ্লাইঃ যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের…

টার্টলস ক্যান ফ্লাইঃ যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের…

আলোকচিত্র উইকিপিডিয়া থেকে

ইরাকের একটা সৈন্য বাচ্চা মেয়েটির পেছনে দৌড়াচ্ছে। কুর্দি মেয়ে, ছোটো মেয়ে, এখনো নারী না। মেয়েটার সমস্ত পরিবারকে খুন করে ফেলা হয়েছে। বাকি আছে শুধু তার একমাত্র বড়ো ভাই। যার দুহাত কাটা। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। মেয়েটি মনে করছে চিৎকার করলে বাঁচা যাবে।

ভুল মনে করছে।

মেয়েটিকে সৈন্যটা ধর্ষণ করলো, একা না, সদলবলে।

সেই ধর্ষণের ফলে একটি শিশু পৃথিবীতে আসলো। দেবদূতের মতো, ফুলের মতো, নিষ্পাপতার মতো সুন্দর। কিন্তু, মেয়েটি শিশুটিকে ভালবাসে না, ঘেন্না করে।

মেয়েটি শিশুটিকে বাস্টার্ড ডাকে, কারণ সে মনে করে, এই শিশুটি তার ছেলে না। তার প্রতিপক্ষের ছেলে। তার বড়ো ভাই এতে কষ্ট পায়, বোনকে বোঝায় শিশুটির তো কোনো দোষ ছিলো না, সে তো নিষ্পাপ।

মেয়েটি বোঝে না।

সীমান্তে একটা শরণার্থীশিবিরে থাকে তারা, এখানে বেশিদিন থাকবে না, চলে যাবে অন্য কোথাও।

মেয়েটি তার ছেলেকে এতোটুকু আদর করে না। ভাই আশেপাশে না থাকলে মারে, প্রচণ্ড মারে। বাচ্চাটার নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ে।

বাচ্চাটা ক্যাম্প এরিয়ায় নিজের মনে হাঁটতে থাকে। কুর্দি ভাষায় কাঁদতে থাকে বাবা, বাবা বলে। সাড়া পায় না।

ক্যাম্প এরিয়ার একটি ছেলে মেয়েটির প্রেমে পড়ে। বিয়ে করতে চায়। কিন্তু মেয়েটি ছেলেটির পছন্দকে পাত্তা দেয় না।

এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন চালায়।

মেয়েটি দড়ি কেনে। সে তার ছেলেকে নিয়ে যায় হ্রদের পারে। দড়ি দিয়ে একটা পাথরে পা বাঁধে বাচ্চাটার।

বাচ্চাটি অন্ধ, সে তার মাকেও দ্যাখে না। মৃত্যুর আগে শেষবার তার মাকে স্পর্শ করে, হাত দিয়ে মায়ের মুখ স্পর্শ করে। সেই মুখ অবশ্য এই স্পর্শেও নির্লিপ্ত থাকে।

তারপর মেয়েটি পাথরটা হ্রদের পানিতে ফেলে দেয়।

একটা পাহাড়ের ওপর থেকে ঝাঁপ দেয় মেয়েটি। সে মরে যায়। পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার প্রয়োজন ছিলো না।

মেয়েটির ভাইয়ের ভবিষ্যৎ দ্যাখার সামর্থ্য থাকেঃ ক্ল্যায়ারভয়েন্স। সেই ক্যাম্প থেকে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে যায়। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক, অনেক, দেরী হয়ে গেছে। বাচ্চাটার মৃতদেহ সে জল থেকে উদ্ধার করে। কিন্তু পাথরে পাটা অনেক শক্ত করে বাঁধা, তাই, পাথর থেকে খুলতে পারে না। বোনের মৃতদেহ সে আর খুঁজে পায় না। স্মৃতি হিসেবে পড়ে থাকে মেয়েটির পায়ের জুতা।

ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক বাহমান ঘোবাদির ২০০৪এ মুক্তিপ্রাপ্ত টার্টলস ক্যান ফ্লাই যুদ্ধের নির্মমতার সিনেমা। পুরুষালি সহিংসতার সিনেমা। কঠোর বাস্তবতার কাছে মানুষের হেরে যাওয়ার সিনেমা। এই সিনেমায় কোনো শস্তা উইশফুল থিংকিং নেই। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের মনভোলানো সিনডেরেলা স্টোরি নেই। আছে মানুষের গল্প। যে মানুষের সামনে কোনো মতাদর্শের আফিম নেই, স্বর্গরাজ্যের রূপকথা নেই, যে মানুষের জন্ম হয়েছে হেরে যাওয়ার জন্য।

Please follow and like us: