//ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি স্বৈরতন্ত্রের আগ্রাসন / আসা উইনস্ট্যানলি

ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি স্বৈরতন্ত্রের আগ্রাসন / আসা উইনস্ট্যানলি

আলোকচিত্র Faro Sul Mondo

অনুবাদকের নোটঃ লন্ডনে বাস করা অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদার সহযোগী সম্পাদক আসা উইনস্ট্যানলি জ্যাকোবিন ম্যাগাজিনে ২০১৫র ১৫ মে এই লেখাটি লেখেন। সে’বছর মার্চে ইয়েমেনে স্বৈরতন্ত্রী হাদি সরকারের গদি রক্ষা করতে সৌদি-নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের সূচনা ঘটে। সৌদি জোটের পক্ষে আগ্রাসনে অংশ নেয় MENA অঞ্চলভুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার (২০১৭ পর্যন্ত, সাম্প্রতিক সংকটের কারণে জোটবহির্ভূত হয়েছে), মিশর, জর্দান, মরক্কো, সেনেগাল, ও সুদান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ক্যানাডা, তুরস্ক, চিন, ও জার্মানি সৌদি আগ্রাসনে রাজনৈতিক সমর্থন দেয়। জিবুতি, ইরিত্রিয়া, সোমালিয়া, ফ্রান্স দেয় লজিস্টিকস সহায়তা। হুদি বিদ্রোহীদের নেতৃত্বাধীন সুপ্রীম রেভল্যুশনারি কমিটি এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, যাঁদের সমর্থন দেয় ইরান ও হেজবুল্লাহ। ২০১৫র ডিসেম্বর নাগাদ ২৫ লক্ষ মানুষ এই সংঘাতের কারণে আভ্যন্তরীণভাবে স্থানচ্যুত (আইডিপি) হয়েছেন। ১০ লক্ষ মানুষ ইয়েমেন ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে শরণার্থীর জীবন যাপন করছেন। ২০১৭র সেপ্টেম্বর নাগাদ মোট ৩৪০৭২ জন সিভিলিয়ান মারা গেছেন বা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এই সময়কালে যে ১২৯০৭ জন সিভিলিয়ান মারা গেছেন তাঁদের ভেতর ২৭৬৮ জন শিশু। উইনস্ট্যানলি এই লেখায় দেখিয়েছেন সৌদি আগ্রাসনে সবচে বেশি লাভবান হয়েছে আল-ক্বায়েদার ইয়েমেন শাখা আনসার আল-শরিয়া ইন ইয়েমেন। উইনস্ট্যানলি আরো দেখিয়েছেন এই আগ্রাসনের ঠিক আগ মুহূর্তে ইয়েমেনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ক্ষমতা-ভাগাভাগি নিয়ে একটা ডিলের প্রান্তে পৌঁছে গেছিলো, হুদি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের বৃহত্তর স্বার্থে এমনকি হাদি সরকারের সাথে সমঝোতাতেও রাজি হয়েছিলো। ঠিক সেই সময় এই আগ্রাসন চালানো হয় এবং একটি গণতান্ত্রিক বোঝাপড়ার সমূহ সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দেয়া হয়। হুদি বিদ্রোহীদেরকে ইরান সমর্থন দিলেও ইয়েমেনের মাটিতে যে তাঁদের শক্ত ভিত্তি আছে এটাও উইনস্ট্যানলি এই লেখায় দেখিয়েছেন। ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশে আলাপ সামান্যই হয়। জানি না কেনো। লেখাটি ব্লগের পাঠকদের জন্য অনুবাদ করা হল।

ইয়েমেনে সৌদি-নেতৃত্বাধীন আক্রমণ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিরতিহীনভাবে চলছে। সংগ্রামের একটি নতুন “রাজনৈতিক” পর্যায়ের ব্যাপারে সৌদিদের কাছ থেকে আসা প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও, ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ অব্যাহত আছে। সম্প্রতি রেড ক্রস জানিয়েছে, ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি বর্তমানে একটি ‘সর্বনাশা’ রূপ পরিগ্রহ করেছে।

জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী, বোমাবর্ষণে এক সহস্রাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে , যাঁদের মধ্যে ৫৫১ জনই সিভিলিয়ান। ইউনিসেফ জানিয়েছে, ভিকটিমদের মধ্যে ১১৫ জন শিশু।

ইয়েমেনি সিভিলিয়ানদেরকে ব্যাপকভাবে হত্যা করতে সমর্থ হওয়ার পাশাপাশি, আজ পর্যন্ত সৌদি রাজতন্ত্রের প্রধান অর্জন হচ্ছে, আল-ক্বায়েদার ইয়েমেন শাখাকে শক্তিশালী করা, আনসার আল-শরিয়া ইন ইয়েমেন। এর কর্মকাণ্ড হয়তো দায়েশকেও ইয়েমেনে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করেছে।

আনসার আল-শরিয়া ইন ইয়েমেন বর্তমানে দেশটিতে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা সম্প্রসারিত করেছে, বেশ কিছু বন্দরের দখল নেয়ার মাধ্যমে, সৌদি বোমাবর্ষণের সহায়তায়। আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হলেও, সৌদিরা বস্তুত আনসার আল-শরিয়া ইন ইয়েমেনের সাথে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ আছে, ঠিক যেমনটা আছে তারা সিরিয়ায়।

বিদ্রোহী হুদি আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার মূল সৌদি উদ্দেশ্য অবশ্য ব্যর্থ হয়ে গেছে। দেশটির ভবিষ্যত প্রসঙ্গে নিজেদের মত দেয়ার ব্যাপারে অতীতের যে-কোনো সময়ের তুলনায় হুদিরা অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সৌদিরা আর তাদের প্রতিক্রিয়াশীল উপসাগরীয় মিত্ররা প্রধান যে-সমস্যাটার সম্মুখীন হয় সেটা হচ্ছে, ইয়েমেনে “ইরানের অনধিকার চর্চা” বিষয়ক যাবতীয় বাকোয়াজ সত্ত্বেও, হুদিরা ইয়েমেনি। তাঁদের অধিকাংশই আরব, ইরানি নয়, আর তাঁরা ইয়েমেনের ভূমিপুত্র। হুদিরা বিদেশী দখলদার নয়; আন্দোলনটি একটি ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিকীকৃত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা তাঁদের দেশটা কিভাবে চলবে সে-ব্যাপারে মত প্রদানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইয়েমেন যখন শিরোনাম তৈরি করে, যা হয় আর কি, তখন হুদিরা যে একটা “ইরানি-মদদপুষ্ট দল” তা রীতিমতো চিৎকার করে পাঠককে জানানো হয়।

কথাটা খুব সীমিত অর্থে সত্য, কিন্তু এটা এই অধিকতর সত্যকে অস্পষ্ট করে যে, হুদি আন্দোলন যে-সংখ্যালঘু জায়েদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে – ইরানি সরকার চর্চিত শিয়া ইসলামের সাথে যাঁদের চর্চিত শিয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফারাক আছে – তাঁরা ইয়েমেনে ভূমিপুত্র এবং বোমাবর্ষণ করে তাঁদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যাবে না। হুদিদেরকে অন দি গ্রাঊণ্ড মোকাবেলা করার জন্য সৌদিরা গোত্রীয় যোদ্ধাদেরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, এ’সংক্রান্ত  সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়, সৌদিরা হুদিদের ভূমিপুত্র হওয়ার বিষয়টা ধরতে পেরেছে।

হুদিদেরকে সরলভাবে ইরানের প্রক্সি বলা যায় না। গত বছর, উদাহরণস্বরূপ, ইরানিরা ইয়েমেনের রাজধানি সানা দখল করে নেয়ার ব্যাপারে হুদিদেরকে নিরুৎসাহিত করেছিলো। তাঁরা অবশ্য এগিয়ে যায় এবং রাজধানির কর্তৃত্ব দাবি করে, যা পরবর্তীতে তাঁদেরকে রাজনৈতিক আলাপআলোচনায় অধিকতর সুবিধা প্রদান করে।

সুতরাং ইরানের প্রভাব যদি আসল ব্যাপার না হয়, তাহলে সৌদিরা ইয়েমেনে যুদ্ধ করছে কী কারণে? ইয়েমেনে জাতিসংঘের সাবেক দূত, অতি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত তিনি দেশটিতে আলাপআলোচনার দায়িত্বে ছিলেন, উদঘাটন করেন যে যুদ্ধরত পক্ষগুলো যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে একটা ক্ষমতা-ভাগাভাগি ডিলের প্রান্তে ছিলো। দেশটিতে সৌদি-নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ এইসব আলাপের অকাল গর্ভপাত ঘটিয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে যেমনটা বলেছেন জামাল বেনোমার, “যখন এই বোমাবর্ষণ শুরু হয়, একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সব চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলো, সেটা হচ্ছে ইয়েমেনিরা এমন একটি ডিলের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলো, যা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সাথে ক্ষমতা-ভাগাভাগিকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, হুদিরাও যার অন্তর্ভুক্ত হবে।”

হুদিরা এমনকি আবদরাব্বুহ মনসুর হাদিকে একটি প্রেসিডেনশল কাউন্সিলের অংশ হিসেবে থেকে যেতে দিতেও ইচ্ছুক ছিলো, যা একটি অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ হিসেবে, রাষ্ট্রপতির ভূমিকার জায়গাটা নেবে। জায়েদিরা যেহেতু একটি সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়, তাই দেশ শাসন করা হুদি আন্দোলনের উদ্দেশ্য নয়। তাঁরা স্রেফ ক্ষমতা-ভাগাভাগি ডিলে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব রাখার ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে চায়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাথে কথা বলা একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদিরা [ইয়েমেনে] হস্তক্ষেপ করেছে একটি ক্ষমতা-ভাগাভাগি ডিলকে ঠেকানোর জন্য, যা হুদিদের অন্তর্ভুক্ত করতো, এবং মন্ত্রীসভা ও সংসদে নারীদের ৩০% প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতো।

হাদি, অপরদিকে, এমন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন যাতে তিনি একমাত্র প্রার্থী ছিলেন।

যা-কিছু দেখলে মনে হয় যে তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের মতো কিছু একটার দিকে নিয়ে যাবে, তাই এই এলাকায় সৌদি স্বৈরতন্ত্র, এর উপসাগরীয় মিত্রগণ, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একটি হুমকি বলে বিবেচিত হয়। তাঁরা ইয়েমেন সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধানের যে-কোনো প্রয়াসকে রুখে দেয়াটা অব্যাহত রাখবে। এই প্রক্রিয়ায় সহস্র মানুষের মৃত্যু নিশ্চিতকরণের বিনিময়ে।

Please follow and like us: