//লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরাঃ হারানো ও ফিরে পাওয়ার এক অসাধারণ আখ্যান

লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরাঃ হারানো ও ফিরে পাওয়ার এক অসাধারণ আখ্যান

PHOTO NEW LINE CINEMA

উনিশ শতক, কলাম্বিয়া।

ফ্লোরেনতিনো আরিজা টেলিগ্রাম অফিসে অপারেটরের কাজ করে। শহরে নতুন আসা দাজা পরিবার, যাদের আছে খচ্চরের ব্যবসা, সেই পরিবারের মেয়ে ফারমিনা দাজাকে সে ভালোবেসে ফ্যালে। ফারমিনা দাজাও ফ্লোরেনতিনো আরিজাকে সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দেয়। সেকালে ফেসবুক, টুইটার, মেসেঞ্জার, কিছুই ছিল না। শুরু হয় চিঠিচালাচালি, আর ফ্লোরেনতিনো যেহেতু কবি, তাই তার প্রেমপত্র পরিপূর্ণ থাকে স্পর্শকাতরতায়। কিন্তু প্রেম যেহেতু বেশিদিন গোপন থাকে না, ফারমিনার বাবার হাতে তারা ধরা খায়। আর ফারমিনার বাবারা যেহেতু দুনিয়ার সব জায়গাতেই চৌধুরী সাহেব, তাই লোকটা মেয়ের জন্য সম্ভাবনাময় পাত্র খোঁজে, এবং আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল হওয়ার অপরাধে বাতিল করে দেয় বেচারা ফ্লোরেনতিনো আরিজাকে।

ফারমিনার বাবা মেয়েকে নিয়ে শহর ছেড়ে যায়। কিন্তু ফ্লোরেনতিনো ফারমিনার কথা ভুলতে পারে না। শুরু হয় তার উন্মত্ততার সাথে সহাবস্থানের গল্প।

ফারমিনা অসুখে পড়ে, জুভেনাল উরবিনো নামের এক তরুণ ডাক্তারের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে, ফারমিনার পিতাকে মেয়েকে এই সম্ভাবনাময় ডাক্তারের কাছে গছানোর পরিকল্পনা করে। জুভেনাল উরবিনোর আগ্রহের কারণে পরিকল্পনা সফল হয়। ফারমিনাও ক্রমশ তাঁর ফ্লোরেনতিনো অ্যাফেয়ারকে একটা অল্পবয়সোচিত ইল্যুশন হিসেবে নিতে থাকে এবং ডাক্তার সাহেবের সাথে মোটামুটি স্থিতিশীল একটা দাম্পত্য সম্পর্কে যায়।

কিন্তু ফ্লোরেনতিনো ফারমিনাকে ছাড়া আর কাউকে জীবনসঙ্গী করার কথা কল্পনাও করতে পারে না বলে অবিবাহিত থেকে যায়। তবে শুরুতে নিজেকে ফারমিনার জন্য ‘পিউর’ রাখার আবেগসর্বস্ব চিন্তা করলেও একটা সময় গিয়ে সে বিভিন্ন নারীর সাথে যৌনসম্পর্কে যেতে শুরু করে। এবং সে হিসেব রাখে কবে কোনদিন কোন নারীর সাথে সে যৌনতা উপভোগ করছে।

ফ্লোরেনতিনো বাবাকে পায় নি, তাঁর বাবা একমাত্র সন্তানের জন্য কোনো সম্পত্তিও রেখে যায় নি, এক চাচার আর্থিক অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে ফ্লোরেনতিনোর মাই ছেলেকে বড়ো করেছে। সেই চাচার সূত্রেই সে বিভিন্ন চাকুরিতে যায় এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একটা নৌকা কোম্পানির মালিকে পরিণত হয়। এরই মধ্যে বিশ শতকে প্রবেশ করেছে পৃথিবী, বুড়ো হয়ে গেছে পুরনো সময়ের মানুষেরা।

বৃদ্ধ ড. জুভেনাল উরবিনো আম গাছে বসে থাকা পোষা তোতাকে ধরতে গিয়ে পা ফসকে মাটিতে পড়ে যান। আর ওঠেন না। ক্রিশ্চান রীতি অনুসারে সম্পন্ন হয় ফিউনেরাল, ফারমিনা বাড়ি ফিরে আসে, দ্যাখে তার জন্য অপেক্ষা করছে ফ্লোরেনতিনো।

৫১ বছর ৯ মাস ৪ দিন ধরে।

ফ্লোরেনতিনো নিয়মিত আসাযাওয়া শুরু করে ফারমিনার বাড়িতে। দুজনেই সত্তর পেরিয়েছে। জীবনসায়াহ্নে এসে তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়।

ফারমিনা ফ্লোরেনতিনোর সাথে একটা নৌ বিহারে যায়। সে জিজ্ঞেস করে নৌকাটা কতোদিন ধরে চলবে। ফ্লোরেনতিনো বলে, অনন্তকাল।

***

সাহিত্য থেকে সিনেমা বানানো নতুন কিছু না। সাধারণত, এসব ক্ষেত্রে সাহিত্যকর্মটি যতোটা সুখপাঠ্য হয়, সিনেমাটি ঠিক ততোটা সুন্দর হয় না। দি ডা ভিঞ্চি কোডের কথা মনে আসছে, যতোটা বিস্ময় নিয়ে ড্যান ব্রাউন পড়েছিলাম, রন হাওয়ার্ড দেখেছি ঠিক ততোটাই বিরক্তি সহকারে।

লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরা ব্যতিক্রম।

কলাম্বিয়ান কথাসাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে সারা দুনিয়া চেনে যে দুটি উপন্যাস দিয়ে, তার একটি ওয়ান হাণ্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউড, আর অন্যটি লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরা।

স্প্যানিশ জানি না বলে, ইংরেজি ও বাংলা উভয় অনুবাদেই পড়েছি ওয়ান হাণ্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিটিউড, যাঁরা পড়েছেন তাঁরা নিশ্চয়ই জানেন এই উপন্যাসটি পাঠের অনুভূতি আক্ষরিক অর্থেই অনির্বচনীয়। এটি থেকে এখনো সিনেমা বানানো হয় নি, যদি কেউ চেষ্টা করেন, তাঁকে এই কাজটাকে ভয়ংকর কঠিন একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে।

মাইক নিউএল লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরা থেকে একই নামের সিনেমা বানিয়েছেন। উপন্যাসের সমান সৌন্দর্য সৃষ্টি সম্ভব না হয়তো। তবে মাইক কাছাকাছি যেতে পেরেছেন মনে হয়।
এটা তাঁর স্বার্থকতা।

রূপসী বাংলার সবচে বিষাদগ্রস্ত কবি লিখেছিলেন হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে না কেউ, তাহলে আবার কেনো ডেকে আনা পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাকে, যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে। মার্কেজ যেনো তাঁর লাভ ইন দা টাইম অফ কলেরাতে উত্তর খুঁজেছেন এই প্রশ্নেরই। মানুষের অভিজ্ঞতা আসলে লস এন্ড গেইনের, নিজের সত্ত্বাকে হারানোর ও তাকে আবার ফিরে পাওয়ার, কলেরার সময়কালীন ভালোবাসার নায়ক ফ্লোরেনতিনো আরিজার জন্য এই সত্ত্বার মেয়েলি ডাকনামঃ ফারমিনা দাজা।

ইফ ইউ এভার লাভড, ইউ মে ওয়াচ…

Please follow and like us: