//যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশঃ স্বপ্নভঙ্গের সূচনালগ্নের এক ধূসর পাণ্ডুলিপি

যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশঃ স্বপ্নভঙ্গের সূচনালগ্নের এক ধূসর পাণ্ডুলিপি

PHOTO MD ENAMUL HAQUE (USED WITH HIS PERMISSION)

ইংরেজিতে কথা আছেঃ Morning shows the day. অর্থাৎ দিনটি কেমন যাবে সকালেই জানা যায়। একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এই কথাটি প্রযোজ্য। কেমন ছিলো বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রথম বছরগুলো? এই প্রশ্নের জবাব পেতে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন। যা আজ অবধি হয় নি বলেই জানি। তবে গবেষণার জন্য যে ঐতিহাসিক তথ্যউপাত্ত লাগে, তা পাওয়া যাবে সেই সময়ের কিছু সংকলনে, বদরুদ্দীন উমরের যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ তেমনই একটি অতুলনীয় প্রবন্ধ সংকলন।

১৯৭২এর আগস্ট থেকে ১৯৭৪এর জানুয়ারি পর্যন্ত লেখা মোট ৩৪টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে বইটিতে, প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৭৫এ শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহার ‘মুক্তধারা’ থেকে, আফসার ব্রাদার্স ১৯৯৭এর বইমেলা উপলক্ষ্যে নতুন করে একটি সংস্করণ প্রকাশ করে। লেখাকালেই এগুলো প্রকাশিত হয়েছিলো বিভিন্ন সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকায়, পরে, গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়। ১৯৭৫এর মার্চে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণে লেখা মুখবন্ধ অনুসারে, লেখকের উদ্দেশ্য, পাঠকদেরকে “যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের একটা সাধারণ ও সামগ্রিক চিত্রের সাথে পরিচিত হতে সক্ষম” করা।

প্রথম প্রবন্ধটি ১৯৭২র ২০ আগস্টে স্বাধিকারে প্রকাশিত হয়, এর শিরোনাম, বাংলাদেশে মার্কিন অনুপ্রবেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামি লিগ নেতারা স্বাভাবিকভাবেই মুখে মার্কিনবিরোধী কথাবার্তা বলতেন, কিন্তু, ‘খাদ্য সাহায্য’ দেয়ার দোহাই দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ঠিকই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। সরকার দাবি করছিলো সাহায্যটা ‘শর্তহীন’, কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাহায্য কোনোদিন শর্তহীন হয় না এটা সবাই জানে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার অর্থপুষ্ট বিভিন্ন “সাহায্যকারী” আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন স্বার্থ জাতীয়করণকারী কোনো রাষ্ট্রকে ঋণ/সাহায্য দেয় না। যে-সব রাষ্ট্র মার্কিন শিল্প ও অন্যান্য সংস্থাকে বাজেয়াপ্ত করে এবং করলেও ছয় মাসের মধ্যে সেই সিদ্ধান্তকে পুনর্বিবেচনা করে না হিকেনলুপার এমেন্ডমেন্ট অনুযায়ী তাদেরকে মার্কিন সাহায্য দেয়া হয় না। নিজেদের একটি পলিসি মেমোরাণ্ডাম অনুযায়ী বিশ্বব্যাংক এমন কোনো রাষ্ট্রকে সাহায্য দেয় না যে-রাষ্ট্র বিদেশি স্বার্থকে জাতীয়করণ করে। এই কারণেই আওয়ামি লিগ সরকার জাতীয়করণ কর্মসূচী ঘোষণা করে অনেক দেশীয় শিল্প ও ব্যাংক বীমা নিজের হাতে নিয়ে এলেও ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থ, তাদের চা-বাগান (সিলেটের অধিকাংশ চা-বাগানের মালিকই ব্রিটিশ), ব্যাংক বীমা ও পাট-স্বার্থকে ‘পবিত্র’ বিবেচনা করে জাতীয়করণ কর্মসূচির বাইরে রেখেছিলো। উমর দেখিয়েছেন, এভাবেই, মুখে মার্কিনবিরোধী কথা বললেও কার্যত আওয়ামি লিগ সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে সম্পর্ক ঠিকই রাখছিলো।

দ্বিতীয় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিলো আজাদে, ‘গণমুখী’ বক্তৃতা। ইসলামের প্রতি জনগণের অন্ধ আনুগত্যের সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানের শাসকরা কিছু শব্দকে জনপ্রিয় করেছিলো, তারা দাবি করছিলো, সবকিছুকে তারা ‘ইসলামি’ করে তুলবে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের নেতারা ও তাদের নানা স্তরের অনুসারীরা ‘ইসলামিকে’ প্রতিস্থাপিত করেন ‘গণমুখী’ দিয়ে, এবং, তাদের প্রতিটি বক্তৃতায় সবকিছুকে ‘গণমুখী’ করে তোলার সংকল্প ব্যক্ত করতে থাকেন। উমর কৃষিক্ষেত্রে একটা দৃষ্টান্ত দিয়েছেন এই ‘গণমুখী’তার। সরকার ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমি আছে যাঁদের তাঁদের খাজনা মাফ করেছিলো, এতে ভূমিহীন বর্গাচাষী ও কৃষি-শ্রমিকদের কল্যান তো কিছু হয়ই নি, কিন্তু যাঁদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমি আছে তাঁদেরও কোনো উপকার হয় নি। সেই সময়ে বিঘা প্রতি খাজনা ছিলো আড়াই কি তিন টাকার মতো, এই টাকাটা দিতে হয় নাই ঠিকই, কিন্তু বিঘা প্রতি সার লাগতো এক মণ এবং সারের মূল্য শতকরা ১০০ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছিলো। ফলে সবচে বেশি ব্যবহৃত ইউরিয়ার মূল্য ১০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০ টাকা হল, ৩ টাকা খাজনা বাঁচলেও, সারের মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষকের পকেট থেকে যাচ্ছে বিঘা প্রতি পূর্বের তুলনায় অতিরিক্ত ৭ টাকা। এই ছিলো আওয়ামি লিগের ‘গণমুখী’ কৃষির নমুনা। উমর পরিহাস করে লিখেছেন, কিছুই গণমুখী হয় নাই, এটা বললে সেটা মিথ্যাভাষণ হবে। একটা জিনিশ কিন্তু তখন আসলেই গণমুখী হয়েছিলো। সেটা হচ্ছে শোষণ। পাকিস্তানের ‘ইসলামি’ শোষণকে প্রতিস্থাপিত করেছিলো ‘গণমুখী’ শোষণ। উমর শোষণ বলেছেন, আমি অবশ্য এটাকে বুর্জোয়া সেন্সে শোষণও বলবো না, এটা হচ্ছে প্রাইমিটিভ একিউমুলেশন অফ ক্যাপিটাল যা কোনো শিল্প-ভিত্তিক বুর্জোয়া বিকাশের দিকে ধাবিত না হয়ে অগ্রসর হয়েছে লুঠেরাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে।

স্বাধিকারে ১৯৭২এর ৩ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তৃতীয় প্রবন্ধটি থেকে, এর শিরোনাম হচ্ছে আওয়ামী লীগের জাতীয়করণ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে, বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে। “সমাজতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম পদক্ষেপ” হিসেবে আওয়ামি লিগ সরকার শিল্প, ব্যাংক, বীমা সবকিছুকেই জাতীয়করণ করার নীতি ঘোষণা করে যা তুমুল সমর্থন পায় সিপিবি ও ন্যাপ-মোজাফফর উভয়ের কাছ থেকেই। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা থেকে এই সমর্থন এসেছে, যে ধারণা, যে কোনো জাতীয়করণকেই সমাজতন্ত্র হিসেবে দ্যাখে। সমাজতন্ত্রের জন্য শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে হয়, যেই শ্রেণীর মিত্র কৃষক ও মধ্যবিত্ত। সামন্ত আর বুর্জোয়ারা সমাজতন্ত্র করতে পারে না, উমর আওয়ামি লিগকে সামন্ত-বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন, আমি অবশ্য তাঁর সাথে সামান্য ভিন্নমত পোষণ করে আওয়ামি লিগকে ঔপনিবেশিক-সামন্ত শ্রেণীর রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চাই। রওনক জাহান যাদেরকে ‘ভার্নাকুলার এলিট’ বলেছেন, যাদের বুর্জোয়া বিকাশের কোনো কর্মসূচি নেই, ভূমি থেকে আহরিত খাজনা যাদেরকে শিল্প বিকাশের বদলে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধি করার দিকে নিয়ে যায়। উমর দেখিয়েছেন চা-শিল্পের অধিকাংশ মালিক ব্রিটিশ, জাতীয়করণ কর্মসূচির আওতায় এই শিল্প আসে নাই, অথচ সত্যিকার সমাজতন্ত্রের জন্য বিদেশি স্বার্থ অর্থাৎ শিল্প-বাণিজ্য আর্থিক সংস্থাগুলোকে জাতীয়করণ করা অপরিহার্য পদক্ষেপ। মার্কিন শিল্প বাণিজ্যও সরকার জাতীয়করণ করে নাই। ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থ বাংলাদেশে পাকিস্তানের মতোই নিরাপদ থেকেছে। সমাজতান্ত্রিক কিউবায় কিন্তু ঠিক এর উল্টোটা হয়েছিলো, তারা সর্বাগ্রে বিদেশি স্বার্থ জাতীয়করণ করেছিলো। জাতীয়করণ কর্মসূচির দ্বিতীয় সমস্যা ছিলো সরকারের ভূমিনীতি। ২৫ বিঘা পর্যন্ত খাজনা মাফ করার ভেতরে যে ফাঁকিবাজি ছিলো সেটা আগেই দ্যাখানো হয়েছে, কিন্তু সরকার আরেকটা কাজ করেছিলো, পরিবারপ্রতি জমি রাখার অধিকার দিয়েছিলো ১০০ বিঘা পর্যন্ত। বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন বাংলাদেশে জমির পরিমাণ এতো কম যে একটা পরিবারকে ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমি রাখার অধিকার দিলে যে পরিমাণ জমি জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারের হাতে আসবে তাতে ভূমিহীন কৃষকদের কোনো উপকারই হবে না। স্বাধীন শিল্প বিকাশের সারপ্লাস আসে কৃষি থেকে, অথচ জাতীয়করণের ভুয়া কর্মসূচির আড়ালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের উত্তরাধিকার ঔপনিবেশিক-সামন্ত শ্রেণীর স্বার্থে গ্রামাঞ্চলে বর্গাদারি ও মহাজনি প্রথা এভাবে কৌশলে টিকিয়ে রাখলে, সেই সারপ্লাস কোনোদিনও আসবে না এবং স্বাধীনভাবে শিল্প বিকাশও তাই ঘটবে না। ফলে শিল্প-উন্নয়নে সাম্রাজ্যবাদের ওপর ডিপেনডেনসি বজায় থাকবে। বাস্তবে এটাই হয়েছে, সমাজতন্ত্রের নামে একচেটিয়া লুন্ঠনতন্ত্র। সমাজতন্ত্রের কথা অনেকেই বলতে পারে, নাজি জার্মানির এডলফ হিটলারও জাতীয় সমাজতন্ত্রের কথা বলতো, তাই বাস্তব কর্মসূচিই নির্ধারণ করে কে সত্যিকার অর্থেই সমাজতন্ত্র চায় আর কে শব্দটাকে একটা পপুলিস্ট রেটোরিক হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

স্বাধিকারে ১৯৭২এর ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চতুর্থ প্রবন্ধটি এতো বছর পরেও প্রাসঙ্গিকতা হারায় নি, শিরোনাম ভারত-বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িকতা, ভারতবিরোধিতার নামে ভারতের জনগণবিরোধী সাম্প্রদায়িক প্রচারণার ডানপন্থী যে ঝোঁক যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে দেখা দিচ্ছিলো অনেক অসাম্প্রদায়িক বামপন্থীই সেই ঝোঁককে প্রতিহত করতে পারেন নি। বরং যথাযথ কৌশলগত সাবধানতা বজায় না রাখায় ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বামপন্থীদের অসাম্প্রদায়িক সমালোচনাও অনেক ডানপন্থী কর্তৃক ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা জারি থেকেছে। হাজী দানেশ আর কাজী জাফর আহমেদের মতো এই “বামপন্থীরাই” পরে জিয়া ও এরশাদের সাথে হাত মিলিয়েছেন, এবং প্রমাণ করেছেন, তাদের “ভারতবিরোধিতার” নামে ভারতের জনগণবিরোধিতা “অসাবধানতাবশত” ছিলো না।

পঞ্চম প্রবন্ধটি ন্যাপের ভূমিকা নিয়ে লেখা, আমি ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ন্যাপকে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখি না, তাই এই প্রবন্ধটা নিয়ে আলোচনা থেকে বিরত থাকছি। স্বাধিকারে প্রকাশিত ৮ই অক্টোবর ১৯৭২এ প্রকাশিত ষষ্ঠ প্রবন্ধটি চিত্তাকর্ষক, এর শিরোনাম আওয়ামী লীগ সরকারের শ্রমনীতি, এটা এমনই এক ‘সমাজতান্ত্রিক’ সরকার ছিলো, যারা শ্রমিক ধর্মঘটকে বেআইনি ঘোষণা করেছিলো। দুনিয়ার সমস্ত বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে শ্রমিকদের ধর্মঘট করার অধিকার থাকে, অথচ স্বঘোষিত ‘সমাজতান্ত্রিক’ সরকার, শ্রমিকদের কাছ থেকে সেই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিলো। শুধু তাই নয়, এরা ‘ম্যানেজমেন্ট বোর্ড’ ও ‘ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল’ নামে দুটি ব্যবস্থাপনা কমিটি তৈরি করেছিলো, যারা লেবার কোর্টের সাথে শ্রমিকদের দাবিদাওয়া বিবেচনা করবে। এভাবেই, শ্রমিকদের না দেয়া হল ধর্মঘট করার ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, না দেয়া হল হাইকোর্টে আপীল করার সুযোগ। উক্ত কমিটিগুলোতে দুজন করে শ্রমিক প্রতিনিধি থাকলেও তিনজন প্রতিনিধি ছিলো সরকারি কর্মচারী তথা মালিকপক্ষের লোক, আর, লেবার কোর্ট যে চরিত্রগতভাবে পুরোপুরি সরকারি ছিলো এটা তো বলাই বাহুল্য। উমর খেয়াল করেন নি বা লিখতে ভুলে গেছেন, এই ধরনের মালিক-শ্রমিক ‘ঐক্যের’ ধারণাটা ফ্যাশিস্তরা জনপ্রিয় করেছিলো নাজি জার্মানিতে, আওয়ামি লিগে সরকারের মাথায় সম্ভবত সেখান থেকেই এসেছিলো আইডিয়াটা।

পরবর্তী প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় স্বাধিকারেই, ১৯৭২এর ১৫ অক্টোবর, শিরোনাম সংবাদ ও প্রকাশনার স্বাধীনতা। পাকিস্তান আমলে সামরিক শাসক আইয়ুব খান সংবাদপত্রের ওপর পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ জারি রাখার উদ্দেশ্যে প্রেস এণ্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স জারি করেছিলো, বাংলাদেশে, আওয়ামি লিগ সরকার সেটা কার্যকর রাখে। দোহাইও সেই পুরনোই। স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারবিরোধী “বিভ্রান্তি” সৃষ্টি করতে পারে। সরকারটা বদলে গেছে, এমনকি একটা যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্র স্থাপিত হয়েছে, শাসকদের মনস্তত্ত্ব সেই একই রয়ে গেছে। তাই জনমত চেপে ধরার প্রতি এতো আগ্রহ। আওয়ামি লিগের ‘সমাজতন্ত্র’ আইয়ুবের ‘বেসিক ডেমোক্রেসির’ মতোই।

এর পরবর্তী প্রবন্ধ, আওয়ামি লীগ প্রস্তাবিত সংবিধান। বায়াত্তরের সংবিধান নিয়ে অনেক ‘বামপন্থীরও’ মধ্যেও মোহ দেখেছে, সেই মোহ ঝেড়ে ফেলতে, এই প্রবন্ধটা কাজে আসতে পারে। সংবিধানটা সীমাহীনভাবে স্ববিরোধী, ব্যক্তির মধ্যে স্ববিরোধিতা থাকলে সেটা মানবিক দুর্বলতা, কিন্তু একটা রাষ্ট্রের সংবিধানে স্ববিরোধিতা গ্রহণযোগ্য নয়। খসড়া সংবিধানের ১০ ধারায় বলা হয়েছে বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে, অথচ ১৩ ধারায় বলা হয়েছে রাষ্ট্রীয় সমবায় ব্যক্তিগত তিন ধরনের মালিকানাই থাকবে, এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদের কোনো সংকল্প ঘোষিত হয় নাই। অথচ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদের একটি পরিকল্পনা থাকতে হয় যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ঝামেলা আরো আছে। ১৩ ধারায় বলা হয়েছে মালিকানার অধিকার আইন দ্বারা নির্দিষ্ট হবে, ৪২ ধারায় বলা হয়েছে সম্পত্তি অর্জন, রক্ষণ, হস্তান্তর, ও অন্যভাবে বিলিব্যবস্থা করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকবে, কিন্তু আইনের দ্বারা কিভাবে এই অধিকার নির্দিষ্ট করা হবে সে-বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট হতেও পারে, নাও হতে পারে। ১৩ ধারায় আরো বলা হয়েছে, উৎপাদন যন্ত্র ও উৎপাদন ব্যবস্থায় মালিক হবে জনগণ, অথচ ব্যক্তিগত মালিকানার ক্ষেত্রে জনগণ কখনো মালিক হতে পারে না। উমর দ্যাখাচ্ছেন, এখানে জনগণ শব্দটা ব্যবহৃত হচ্ছে রেটোরিক হিসেবে, যেভাবে ১৯৫৬ আর ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে আল্লাহকে সকল সম্পত্তির মালিক ঘোষণা করা হয়েছিলো। বাস্তবে অবশ্য আল্লাহ নয়, আল্লার নামে জনগণের মাথায় কাঠাল ভেঙে খেতো, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীই। ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রতি সংবিধানের এই যে কোমল মনোভাব, এটাই, ইঙ্গ-মার্কিন-জাপানি-জার্মান কর্পোরেশনগুলোকে বাংলাদেশে অবাধে পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ করে দেবে, এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন উমর। ইতিহাস সাক্ষী, তাঁর আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশের জন্য বাংলাদেশের বাজারকে বিবস্ত্র করার যে অভিযোগ আমরা জিয়া আর এরশাদের বিরুদ্ধে তুলি, তার তাত্ত্বিক ভিত্তি, লুকিয়ে আছে বায়াত্তরের এই সংবিধানেই। ৩৫ ধারায় প্রকাশ্য ও নিরপেক্ষ বিচারের অধিকার দেয়া হয়েছে, কিন্তু একইসাথে বলা হয়েছে “জননিরাপত্তা, নৈতিকতা অথবা অন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজনে” প্রকাশ্য বিচারের পরিবর্তে গোপন বিচারের ব্যবস্থা সংসদ করতে পারবে, এই কারণটা “যুক্তিসঙ্গত” কিনা কে নির্ধারণ করবেঃ সংসদ না সরকার? ৩৬, ৩৭, ৩৮ ধারা অনুসারে চলাফেরা ও সমাবেশের যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে সেটাও আবার কেড়ে নেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে “যুক্তিসঙ্গত” কারণের দোহাই দিয়ে। ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে “বন্ধু রাষ্ট্রের” বিরুদ্ধে কিছু বলার স্বাধীনতা কোন ব্যক্তি বা সংবাদপত্রের নেই, এখানে “বন্ধু রাষ্ট্র” বলতে আসলে কোন রাষ্ট্রের কথা বোঝানো হয়েছে, সেটা বলতে গেলে পাঠকপাঠিকার বুদ্ধিমত্তাকে অপমান করা হবে। স্বাধিকারেই পরবর্তীতে এই প্রবন্ধের একটি সম্পূরক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, আওয়ামি লীগের প্রতিশ্রুতি রক্ষা নামে, ১৯৭২এর ১৯ নভেম্বরে। ১৯৭২এর ২৬ অক্টোবর ভোরে সংবিধান পাশ হয়েছিলো। এই সংবিধান আলোচনার সময় প্রথম পাঠ (সাধারণ আলোচনার) চেয়ে দ্বিতীয় পাঠ (ধারাবাহিক আলোচনায়) সময় লেগেছে অনেক কম। অথচ এটা একটা অদ্ভূত ঘটনা, ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন যে-কেউ বুঝবেন, সাধারণ আলোচনার চেয়ে একেকটি ধারা/অনুচ্ছেদ ধরে ধরে ধারাবাহিক আলোচনায় অনেক বেশি সময় লাগার কথা। সেটা হয় নি। উমর পরিবেশটাকে তুলনা করেছেন একটা সার্কাসের সাথে, গণপরিষদ সদস্যরা খসড়া সংবিধান নিয়ে কোনো বিতর্কেই যাননি, এতো তাড়াতাড়ি জাতিকে একটা ‘অসাধারণ’ সংবিধান দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে ধন্যবাদ দিয়ে নিজেদের বক্তৃতা শেষ করেছেন। যেই পদ্ধতিতে আওয়ামি লিগ সরকার দ্রুত সংবিধান দেয়া সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলো, সেই জন্য এই গণপরিষদ নাটকেরও কোনো প্রয়োজন ছিলো না, একটা অর্ডিন্যান্স পাশ করিয়ে নিলেই হতো। সংবিধানের প্রথম খসড়াটি নিয়ে তৎকালীন আওয়ামি লিগ সরকারের আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার কামাল হোসেন ইংল্যাণ্ড আর ইন্ডিয়ায় গেছিলেন, “বিশেষজ্ঞদের” সাথে আলোচনা করতে, কি আলোচনা করেছেন সেটা বলাই বাহুল্য। উমরের প্রবন্ধদুটিরই সীমাবদ্ধতা আছে একটা, তিনি সংবিধানের স্ববিরোধিতা ও গণপরিষদ নাটকের সমালোচনা করলেও, গণপরিষদকে নির্বাচিতই ধরে নিয়েছেন। আসলে শুরু থেকেই স্বৈরাচারী প্রক্রিয়ায় ‘৭০ ও ‘৭১এ পাকিস্তানের ন্যাশনাল এসেম্বলি ও প্রভিন্সিয়াল এসেম্বলির জন্য নির্বাচিত সদস্যদের মাধ্যমে এই সংবিধান প্রণীত হয়েছিলো, এবং এটাই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র গণপরিষদ ছিলো যেখানে এমনকি গণপরিষদের সদস্যদেরও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া হয় নাই।

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ‘শাসনতন্ত্র প্রশ্নে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা’, ‘বাংলাদেশের সংবিধান ও পরবর্তী নির্বাচন’, ‘আইয়ুব খানের অস্ত্রাগার’ এই প্রবন্ধগুলোতে উল্লিখিত বিষয়গুলোই বিভিন্নভাবে এসেছে। ১৯৭২এর ১৭ ডিসেম্বর স্বাধিকারে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা নামের প্রবন্ধটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, এই প্রবন্ধটি, আওয়ামি লিগের নেতাদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে কাজে আসবে আমাদের। এই মনস্তত্ত্ব এতো বছর পরেও অপরিবর্তিতই আছে।

১৯৭৩এর মার্চে ইলেকশন দিয়ে আওয়ামি লিগের নেতারা নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে সারা দেশে বলে বেড়াচ্ছিলেন, “৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে” তাঁরা স্বাধীনতা এনেছেন, তাই এই দেশ কেবলই তাঁদের। এবং যারা স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয় নাই, তারা সবাই দালাল, আওয়ামি লিগের নেতাদের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অর্থ অবশ্য ইন্ডিয়ায় হিজরত করা। তাই তাঁদের চোখে দেশে আটকে পড়া সব মানুষই দালাল ছিলো, অর্থাৎ বাংলাদেশ ছিলো, ছয় কোটি দালালের দেশ। নির্বাচনী প্রচারণায় আরো বলা হচ্ছিলো, যারা আওয়ামি লিগ সরকারের সমালোচনা করছে, এরা সবাই ‘বিদেশি চর।’ পাকিস্তানের শাসকরাও ঠিক একই ভাষায় কথা বলতো। উমর আরো দেখিয়েছেন যে, পাকিস্তানি শাসকদের মতো এরাও কিছু রেটোরিক তৈরি করেছে, ‘ইসলাম’ আর ‘কায়েদে আজমের’ জায়গায় ‘বাঙালি জাতীয়তা’ আর ‘বঙ্গবন্ধু’। উমর এটাকে সাম্রাজ্যকবলিত ও সামন্তপ্রভাবিত রাষ্ট্রে আধা ফ্যাশিবাদ বলছেন, আমি অবশ্য ফ্যাশিবাদই বলবো।

দৈনিক আজাদে ১৯৭২এর ২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত বাঙলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি প্রবন্ধটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে, পরে বিএনপি যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রচার করেছে, বিস্ময়কর হলেও সত্য তার তাত্ত্বিক ভিত্তি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের তৈরি করা। বাংলাদেশের বাঙালিদেরকে একটি স্বতন্ত্র জাতি এবং বাংলাদেশকে একটি জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে যারা মাঠে-ময়দানে রেডিও-টেলিভিশনে চিৎকার করছিলেন, তারা, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সাথে বাংলাদেশের বাঙালিদের ফারাক কি তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন নাই। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের জাতিগত ফারাক নির্দেশ করার জন্য বাংলা ভাষাকে জাতীয়তার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিলো, সেই সূত্রে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও তো জাতিগতভাবে বাঙালিই। কোরিয়ানরা দুইটি ভিন্ন রাষ্ট্র বাস করে মতাদর্শিক-রাজনীতি-অর্থনীতিজনিত ফারাকজনিত কারণে, কিন্তু তাতে, ‘উত্তর কোরিয়ান’ আর ‘দক্ষিণ কোরিয়ান’ নামে দুটি স্বতন্ত্র জাতি তৈরি হয় নাই। জার্মানিও বহুদিন একই কারণে দ্বিখণ্ডিত অবস্থায় ছিলো, কিন্তু, তাতে কি ‘পশ্চিম জার্মান’ আর ‘পূর্ব জার্মান’ নামে দুটি স্বতন্ত্র জাতি তৈরি হয়েছে? অর্থাৎ আর্থিক ফারাক জাতি তৈরি করে না। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে, পাকিস্তানের ২৪ বছরে কি এমন পরিবর্তন আসলো যে তারা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের চেয়ে স্বতন্ত্র একটা জাতিতে পরিণত হলো? পশ্চিমবঙ্গ আর পূর্ববাংলার বাঙালির মধ্যে ফারাক যদি থেকে থাকে, সেটা হচ্ছে, ১৯৪৭এ পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পরে পূর্ববাংলার সমাজের উচ্চ স্তরে সম্প্রদায়গতভাবে হিন্দুদের বদলে মুসলমানদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ১৯৭১এও স্বতন্ত্র জাতির দাবি এই সাম্প্রদায়িক মানসজাতই। অর্থাৎ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা। আওয়ামি লিগ আজকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে, কিন্তু সেটা মুখেই, কার্যত তারাও বিএনপির মতোই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। সেটা তাদের কর্মকাণ্ড থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। উমর এটাকে সমালোচনার দৃষ্টিতে ‘৪০এর লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু সমসময়ে একজন এটাকে প্রশংসার চোখে দেখছিলেন, তিনি হচ্ছেন আবুল মনসুর আহমদ (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর)।

‘বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’, ‘জাতি সমস্যা ও ভাষা আন্দোলন’, ‘আওয়ামি লিগের শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে’, ‘মুদ্রাযন্ত্র ও প্রেস অর্ডিন্যান্স ১৯৭৩’, ‘প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা’, ‘প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ও বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব’ প্রবন্ধগুলোতে উল্লিখিত বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে এসেছে। ‘১৯৪৮ থেকে পশ্চিম এশিয়ায় দু’ ধরনের যুদ্ধ চলছে’ এবং ‘সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয়তাবাদ’ প্রবন্ধ দুটি এই সংকলনের মূল মেজাজের সাথে সামঞ্জন্যপূর্ণ নয়, নতুন কোনো সংস্করণ হলে, বই থেকে এই দুটো প্রবন্ধ বাদ দেয়া উচিত। ‘আওয়ামি লিগ সরকারের শ্রমনীতি’ প্রবন্ধে ‘সমাজতান্ত্রিক’ সরকারের শ্রমিক ধর্মঘট বেআইনি ঘোষণা করার কথা জানা গেছিলো, ‘বাঙলাদেশে শ্রমিক হত্যা’ দৈনিক গণকণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৩এর ৯ ফেব্রুয়ারি, এই সময়কালে আওয়ামি লিগ সরকারের ‘সমাজতন্ত্র’ বাড়বকুণ্ডের আর আর টেক্সটাইল মিলের ২২ জন শ্রমিককে (৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩) খুন করার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। ‘মাধ্যমিক শিক্ষক ধর্মঘট প্রসঙ্গে’, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে’, ’১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের তাৎপর্য’, ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বতঃস্ফূর্ততা’ প্রভৃতি আমার কাছে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ মনে হয়েছে সংকলনটির। ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও স্বীকৃতি’ প্রবন্ধটা চিত্তাকর্ষক, এটা বঙ্গবার্তা প্রকাশ করেছিলো ১৯৭৩এর ১৬ ডিসেম্বরে, কিছু বামপন্থী তাত্ত্বিক- রাজনীতিক বাংলাদেশ নামটি ব্যবহার না করে পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান সম্বোধন করা জারি রেখেছিলেন যার বিভ্রমটি বদরুদ্দীন উমর এই প্রবন্ধে ধরিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবার্তায় প্রকাশিত আরো দুটি প্রবন্ধ হচ্ছে, ‘সংসদীয় বিরোধী দলগুলোর ঐক্য প্রসঙ্গে’ এবং ‘জনগণ গণতান্ত্রিক বিরোধী দলগুলোর ঐক্য কেন চাচ্ছেন’, প্রবন্ধ দুটিতে আওয়ামি লিগ সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্যফ্রন্ট গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অন্য প্রেক্ষিতে আগেই বলেছি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের রাজত্বটা আধা ফ্যাসিবাদী না, পুরোপুরি ফ্যাসিবাদী ছিলো, এই বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যাবে বঙ্গবার্তাতেই প্রকাশিত ‘বাঙলাদেশের নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ ও ‘বাঙলাদেশের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি’ প্রবন্ধ দুটিতে।

“জাতির সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতির স্বার্থে দেশ থেকে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি, মুনাফাখোর, মজুতদার, দুর্নীতিবাজ এবং সকল প্রকার সমাজবিরোধী শক্তিকে উৎখাত করার জন্য” (দৈনিক বাংলা, ০৪.০৯.৭৩) আওয়ামি লিগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ-মোজাফফর ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে ১৯৭৩এর ৩ সেপ্টেম্বর। আওয়ামি লিগের অবশ্য এই জোট গঠনে বিশেষ আগ্রহ ছিলো না, আগ্রহটা ছিলো অপরপক্ষের, অনেক সাধনার পরে তাঁরা পেয়েছিলেন আওয়ামি লিগের মন। আওয়ামি লিগের এই দল দুটিকে দালাল হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বদরুদ্দীন উমর তিনটি বিশেষ সুবিধা শনাক্ত করেছেন। ১. এরা দালালি করে একটা আদর্শবাদের আলখাল্লার আড়ালে, এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে, নিজেদের মাজা শক্ত না হলেও হাত বাড়িয়ে মাজা খাড়া রাখার একটা ব্যবস্থা তাই এদের আছে। ২. দ্বিতীয় সুবিধা প্রথমটি থেকেই উৎসারিত, রসদ যোগাড়ের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে এদের নিজেদেরই আছে, তাই আওয়ামি লিগ বিনা খরচায় এদের কাছে পেতে পারে। ৩. এদের প্রগতিশীলতার লেবাস এবং বাকচাতুর্যের কারণে অনেক সৎ রাজনীতিক কর্মী, ছাত্র, এবং জনগণের ক্ষুদ্র একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়ে এদের সমর্থন করে, যাঁরা বিভ্রান্ত হলেও ব্যক্তিগতভাবে অসৎ নন, এই বিভ্রান্ত অথচ সৎ কর্মীদের সক্রিয় সমর্থন আওয়ামি লিগের নানাবিধ কাজে আসবে। ১৯৭৩এর ১৪ সেপ্টেম্বর গণবাংলায় প্রকাশিত ‘ত্রিদলীয় ঐক্যজোট ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন’ নামক প্রবন্ধটিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আর ন্যাপ-মোজাফফরের জায়গায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আর ওয়ার্কার্স পার্টি পড়লে দ্যাখা যাবে অনেক কিছুই সেই আগের মতোই আছে।

১৯৭৩এর ৮ ডিসেম্বরে বঙ্গবার্তায় প্রকাশিত ‘দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি প্রসঙ্গে’ বদরুদ্দীন উমরের লেখা সেরা প্রবন্ধগুলোর একটি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে আওয়ামি লিগ সরকারের আন্তরিকতার কতোটা অভাব ছিলো সেটা এই ছোট্ট প্রবন্ধে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। উমর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় খেয়াল করেছেন, তৎকালীন সরকার দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের একাংশের প্রতি ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করেছে, অথচ অনেক দেশপ্রেমিক বামপন্থী নেতাকর্মী জেলে আটক থেকেছেন। শুধু তাই নয়, ক্ষমা প্রদর্শন উপলক্ষ্যে বাঙলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের “দেশ গড়ার” কাজে আত্মনিয়োগ করার আহবান জানিয়েছিলেন। এই অসাধারণ প্রবন্ধে উমর আরো জানাচ্ছেন, ১৯৫ জন বাদে ভারতে আটক পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অফিসার আর জওয়ানদের বিনা বিচারে মুক্তিদান করা হয়েছে, এবং আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অচিরেই এই ১৯৫ জনও মুক্তি পেয়ে যাবে। তাঁর এই আশঙ্কা প্রফেসির মতো সত্য হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে আজকে আওয়ামি লিগ সরকারের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব আছে, এটা অনেক সৎ আওয়ামি লিগ সমর্থকও স্বীকার করেন, কিন্তু এই আন্তরিকতার অভাবও যে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে শুরু হওয়া বিচারপ্রক্রিয়ার উত্তরাধিকার এটা তাঁরা স্বীকার করেন না বা হয়তো জানেনই না।

পাকিস্তান থেকে গঠন ও চরিত্রের দিক থেকে আলাদা একটি রাষ্ট্র পাওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপক জনসাধারণ মুক্তিযুদ্ধে ব্রতী হয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সূচনালগ্নেই ভেঙে দিয়েছিলো। এই দায় আওয়ামি লিগ সরকারের ঘাড়েই বর্তায়। বামপন্থীদের কর্তব্য ছিলো ফ্যাশিস্তে রূপান্তরিত আওয়ামি লিগ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা, সেটা করতে না পেরে তাঁরা সমালোচনাযোগ্য ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, কিন্তু সেই কারণে আওয়ামি লিগকে ইতিহাসের দায় থেকে মুক্তি দেয়া যায় না।

ভোরের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া স্নায়বিক যন্ত্রণার ব্যাপার। ব্যক্তির জন্য যেমন সত্য সেটা, সমষ্টির জন্যও। কিন্তু ধ্রুপদী রুশ সাহিত্যের সর্বশেষ মহৎ প্রতিনিধি লিয়েফ তলস্তয় একটি ছোটোগল্পে লিখেছিলেন মানুষ তাঁর স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। এবং বিপ্লবীদের ক্ষেত্রে তো এটা বিশেষভাবেই সত্য, যেমনটা বলেছিলেন চারু মজুমদার, একজন বিপ্লবীর কাজ নিজে স্বপ্ন দ্যাখা এবং অন্যকে স্বপ্ন দ্যাখানো। পাকিস্তানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক ফ্যাশিস্তদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ লড়াই করেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নেই আওয়ামি লিগ সরকার সেই স্বপ্ন ভেঙে দিলেও মানুষ বারবার সেই স্বপ্ন দেখবে, যতোদিন না স্বপ্নকে নিজের করে পাবে। জামায়াত মতাদর্শিকভাবে ‘৭১এই বাতিল হয়ে গেছে, আর বিএনপি বা জাতীয় পার্টির মতো ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা দলের জন্মই হতো না যদি আওয়ামি লিগ যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এরকম ফ্যাশিস্ত রূপ পরিগ্রহ না করতো, তাই গণতন্ত্রের লড়াইয়ে এদের কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নেই। সেই লড়াইয়ের শক্তি জনগণের ভেতর থেকেই তৈরি হবে, কিন্তু সে-জন্য এই রাষ্ট্রের সূচনালগ্নের স্বপ্নভঙ্গ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করতে হবে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ থেকে যা কিছুটা পাওয়া যাবে।

Please follow and like us: