//মিয়ানমার, রোহিঙ্গা গণহত্যাটা ধীরেসুস্থে করো / মঙ জারনি

মিয়ানমার, রোহিঙ্গা গণহত্যাটা ধীরেসুস্থে করো / মঙ জারনি

অনুবাদকের নোটঃ ড. মঙ জারনি ফ্রি বার্মা কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস’এ মিয়ানমারবিষয়ক ভিজিটিং ফেলো। মিয়ানমার রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। শুধু রোহিঙ্গাই নয়, কাচিনসহ আরো যে-সব নিপীড়িত জাতি আছে মিয়ানমারে, তাঁদের পক্ষেও নিয়মিত বলেন, ল্যাখেন, রাস্তায় নামেন।  সম্প্রতি মিয়ানমার রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের ওপর আরেকদফা নিপীড়ণ চালানো শুরু করলে এই ব্যাপারে তথাকথিত বিশ্ব নেতাদের যে-ক্ষমাহীন নিরবতা, তাকে কটাক্ষ করে, তিনি এই শ্লেষাত্মক কবিতাটি কিছুদিন আগে ল্যাখেন। আমার চোখে পড়ায় অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নেই। জাতিগতভাবে বার্মিজ ও সম্প্রদায়গতভাবে বৌদ্ধ একজন মানবিক মানুষ যে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সবচে সরব কণ্ঠস্বরগুলোর একটি, সেটা আমার দেশের লোকজনের জানা দরকার।

আলোকচিত্র ট্রানসেন্ড ইন্টারন্যাশনাল

আমার দেশ গণহত্যা চালাচ্ছে
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা।

আমি জানতাম এই দিন আসবে। তাড়াতাড়িই এল।

দাঁড়াও, দাঁড়াও!, রোহিঙ্গাদের তো কোনো অস্তিত্বই নেই।

শিকারদের কোনো অস্তিত্ব কোনোকালেই থাকতো না। তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই।
আর তারা নিজেদের যা দাবি করে, তা হিসেবে তাদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।

ঘাতকদের জন্য, শিকারদের কোনো অস্তিত্ব থাকে না – মানুষ হিসেবে থাকে না।

আমরা গর্বিত মিয়ানমার। তোমাদের চাপ থোড়াই কেয়ার করি আমরা।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে আমরা আমাদের পাশে পেয়েছি।

হ্যাঁ, রাখঢাখ-ছাড়া দায়মুক্তি।

আমাদের সর্বাধিনায়ক বলেন, ১৯৪২এ যা শুরু হয়েছিলো
“শেষ করো সেই অসমাপ্ত কাজ।”
জেনারেল মিন অঙ লাইঙ মাটি চান, মানুষ নয়।

তাই আমরা এখন জবাই করছি এইসব অর্ধভুক্ত জীবগুলিকে,
যারা চেঁচিয়েই যাচ্ছে নিজেদেরকে রোহিঙ্গা রোহিঙ্গা বলে।

ঢেউয়ের পর ঢেউ,
আসে খুনীরা,
আসে অগ্নিসংযোগকারীরা,
আসে ধর্ষকেরা,
আসে সৈন্যরা,
আসে পুলিশেরা,
আসে রাখাইনরা।

তারপর তারা চিরে ফ্যালে মেয়েদের গলা,
ধর্ষণ করে নারীদের, নেহাতই বাচ্চা যাদের অনেকেই
তারা জবাই করে অন্তঃস্বত্তা নারীদেরকে,
মৃত্যুদণ্ড দেয় স্বামীদেরকে
তারা হাঁটতেচলতে অক্ষম বুড়োদেরকেও জ্যান্ত আগুনে পোড়ায়,
শিশুদের প্রাণভিক্ষা দেবে? দেখভাল করবে কে এদের?
আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দাও।

সুতরাং সার্ভাইভারদেরকে বলো।

এক, দুই, বা তিনজন নয়…
হাজারো সার্ভাইভার যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলো,
নৃশংসতার গল্প, অমানবিকতার গল্প

বর্বরতার সব অপরাধ

না, না, আমরা মিয়ানমার তো “আত্মরক্ষা” করছি।

আসলে এর পুরোটাই “জাতীয় নিরাপত্তার” ব্যাপার।
এইসব উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে।
এইসব সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে।

আর পুনরাবৃত্তি করে চলো খুন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, বিতাড়ণ – সহস্রবার
দশকের পর দশক, গতি বাড়িয়েই চলে তারা, তাদের হত্যাযজ্ঞের গতি
ঘাতকেরা গল্প বলে – “অবৈধ অভিবাসী”, “সাম্প্রদায়িক সহিংসতা”, “উপনিবেশিক আমলে অসমাপ্ত কাজ”, “নয়া-বলকান রূপান্তরকালীন ইস্যু”

মিয়ানমারের বয়ান বদলাতেই থাকে
টেনশন নিয়েন না ভাইয়েরা আমার
দুনিয়াটা অচিরেই আসছে।

গণহত্যা আসতেই থাকবে – অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুন্ঠন, গণপলায়ন ইত্যাদি।

দশকের পর দশক ধরে, সত্যি বললে, চারদশক।

জবাই হয়ে যাওয়া মানুষের ঘ্রাণ থেকে বাঁচতে
তারা তাদের নাক চেপে ধরে।

শিশুদের কান্না, ধর্ষিতা মায়েদের চিৎকার, বৃদ্ধদের করজোড়ে প্রাণভিক্ষা চাওয়া
তারা এসবের কিছুই শোনে না।

তারা তাকায়, কিন্তু তারা কোনোকিছু দ্যাখে না
দগ্ধ শিশু, প্রাণহীন পুরুষ, ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রাখাইনের মাটিতে

ক্ষমতায় থাকা নারী আর পুরুষের দল, বিবেক যাদের বিদ্ধ হয় নি এতোটুকু
তারা দাঁড়িয়ে পালন করে এক মিনিট নিরবতা, সরাসরি সম্প্রসারিত অনুষ্ঠানে
নিউইয়র্কে, জেনেভায়, প্যারিসে, ওয়াশিংটনে,

আহ কী দুঃখজনক, বিগত গণহত্যার শিকারেরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে
১০০ বছরে ২০০ মিলিয়ন।

দাঁড়িয়ে যান! আরেকবার বলেন!
নেভার এগেইন!

কিন্তু, রোহিঙ্গাদের বিষয়টা আলাদা, সম্ভাব্য “নিরাপত্তা ঝুঁকি”,

এটা আউশউইৎজ নয়।
এটা রুয়াণ্ডা নয়।
এটা সেব্রেনিসা নয়।

অধিকাংশই ভুয়া খবর, তাই না?

সংযম, বৌদ্ধ নেতাগণ।
বিশ্ব নেতাদের উচিত উপদেশ দেয়া, গণহত্যাটা সীমিত করো
মিয়ানমার গণহত্যার গতি বাড়িয়ে তুলো না
যদি “মুসলিম সন্ত্রাস” চলে আসে।

আস্তে আস্তে গণহত্যা চালিয়ে সম্পন্ন করো তোমাদের অসমাপ্ত কাজ
বলো যা খুশী ইচ্ছে এটাকে, সাম্প্রদায়িকতা বা আত্মরক্ষা।

কিন্তু এটার গতি বাড়িয়ে তুলো না যেনো।
দুই হপ্তায় দুই লক্ষ সত্তর হাজার পালিয়েছে
জাতিসংঘ যে উপেক্ষা করবে, তার জন্য সংখ্যাটা একটু বেশিই!

মূল কবিতা লেখা হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭
বাঙলায় অনুবাদ করা হয়েছে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭
মূল লেখাটা পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুনঃ http://www.maungzarni.net/2017/09/myanmar-moderate-your-genocide.html

Please follow and like us: