উৎসর্গ

আলোকচিত্র সাদমান সাকিব রহমান

সব বেচাবিক্রি শেষে হাট খালি হয়ে গেছে। এখন অনেক রাত। ইব্রাহিম ছাড়া এই হাটে আর কেউ নেই।
 
ইব্রাহিম অনেক কষ্ট করে একটা গরু পেলেছিলো। বাপ যেমন কষ্ট করে তার ছেলে পালে। ইব্রাহিমের দুই ছেলে, বড়োটা ইসমাইল, মরে গেছে। সেবার নিউমোনিয়া হল। টাকা ছিলো না চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার। তাই মরে গেছে। ইব্রাহিমও আস্তে আস্তে ইসমাইলের শোক ভুলে গেছিলো, এই গরুটা দেখলে, তার মনে হতো ইসমাইল যেনো ফিরে এসেছে।

সে যত্ন করে গরুটাকে প্রতিদিন গোসল করাতো। গা ডলে ডলে। বাপ যেমন তার ছোট্টো ছেলেকে গোসল করায়। তারপর ঘাস খাওয়াতো। ভূষি খাওয়াতো। আর মাঝেমধ্যে মনখারাপ হলে গলা জড়িয়ে বসে থাকতো। আর ফিসফিস করে বলতো, “ইসমাইল, বাজান আমার!”

কিন্তু অভাব, তীব্র অভাব, ইব্রাহিমের ছোট্ট সংসারে। তার আর একটা ছেলেই বেচে আছে, ইসহাক। ইব্রাহিম আর তার বৌ ভেবে কুল পাচ্ছে না, তারা নিজেরা ভাত খেতে ভাত পায় না, কিভাবে গরু পালবে আর ইসহাককে কিভাবে বড়ো করবে।

তারপর একদিন খোদা স্বপ্নে দ্যাখা দিলেন ইব্রাহিমকে। তিনি ইব্রাহিমকে বললেন দারিদ্র্য ঠেকানোর একটাই উপায়। গরুটাকে বেচে দেয়া। তাহলে কিছু টাকা আসবে, তাতে কদিন যাবে। এর ভেতরে অন্য কোনো কাজ জুটে যাবে, তিনি জুটিয়ে দেবেন, ইব্রাহিমের সংসারে আর কোনো অভাব থাকবে না। কিন্তু গরু না বেচলে ইসহাকের অসুখ হবে। সেও ইসমাইলের মতো মরে যাবে বিনা চিকিৎসায়।

ইব্রাহিমের বৌ বললো, গরুর জন্য মায়া করে কোনো লাভ নাই, আসছে কোরবানির ঈদে গরুটাকে বেচে দাও তুমি। ইব্রাহিম একবার বৌয়ের দিকে চায়, আরেকবার ইসহাকের দিকে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তটা নেয়। ঈদের দিন সে গরুটাকে হাটে নিয়ে যায়, তারপর বেচে দেয়, সবচে বেশি দাম হাঁকানো এক ক্রেতার কাছে।
 
ইব্রাহিম এখন একা অন্ধকারে বসে বসে কাঁদছে। সে জানে না এই ঈদে খোদা পৃথিবীতে একটা মাত্র মানুষের কোরবানি কবুল করেছেন। সেটা ইসমাইলের পিতার।

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *