//‘ক্ষরিত রক্তের শব্দগুচ্ছ’ : আহমেদুর রশীদ টুটুলের সাক্ষাৎকার

‘ক্ষরিত রক্তের শব্দগুচ্ছ’ : আহমেদুর রশীদ টুটুলের সাক্ষাৎকার

PHOTO ARNE OLAV

আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল একজন বাংলাদেশি প্রকাশক ১৯৭৩এর ২৮ মার্চ তিনি সুনামগঞ্জ জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে উঠেছেন সিলেটে। ১৯৯০এ শুদ্ধস্বর নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন বের করেন। ২০০৪এ একই নামে একটি প্রকাশনী তৈরি করেন। নিজেকে কবিতাকর্মী এবং লিটল ম্যাগাজিন কর্মী হিসাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বাংলাদেশের প্রকাশনাজগতে কিছু দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার কারণেই। ২০১৩তে শুদ্ধস্বর বাংলা একাডেমীর শহিদ মুনির চৌধুরী পুরস্কার লাভ করে। ২০১৫র ৩১ অক্টোবরে মুক্ত চিন্তার লেখকদের বই প্রকাশনার কারণে তার উপর; এবং তাঁর বন্ধু তারেক রহিম ও রণদীপম বসুর ওপর, নারকীয় হামলা হয়। গুরুতর আহত হলেও তিনি শেষপর্যন্ত বেঁচে যান। বর্তমানে নরওয়েতে উদ্বাস্তু জীবন যাপন করছেন টুটুল২০১৬তে নোবেল বিজয়ী নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের স্মৃতিতে প্রদত্ত পুরস্কার পিন্টার ইন্টারন্যাশনাল রাইটার অফ কারেজ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন, একই বছর, অ্যামেরিকান পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন-কর্তৃক (এপিএ) লাভ করেন পাবলিশার অফ দি ইয়ার পুরস্কার২০১৭য় অসলো ফ্রিডম ফোরামে তিনি একটি অনুপ্রেরণামূলক উপস্থাপনা প্রদান করেন

সাক্ষাৎকারগ্রহীতাঃ ইরফানুর রহমান রাফিন

*

ইরফানুর রহমান রাফিনঃ কেমন আছেন, টুটুল ভাই?

আহমেদুর রশীদ টুটুলঃ গতানুগতিকভাবে বললে তো বলতে হয় ভাল আছি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভাল কি আছি? এই প্রশ্নটা এখন আমি নিজেই নিজেকে করি। একদিকে নিরাপত্তাজনিত আতঙ্কটা বোধ করছি না এটা ঠিক। কিন্তু এক প্রবল অসহায়ত্বের সমুদ্রে পরে হাবুডুবু খাচ্ছি যেন। খেই হারিয়ে যাচ্ছে কেবল।

রাফিনঃ আমি বুঝতে পারছি। আশৈশবপরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুভূতিটা যন্ত্রণাদায়ক। নরওয়েতে বাংলাদেশের কোন জিনিশটা সবচে বেশি মিস করেন?

টুটুলঃ আমি মূলত মিস করি বাংলাদেশের আমিকে। আমি যখন নিজেকে খুঁজে পাই না, তখন খুব হতাশ লাগে, মনে হয় চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। দেশের টং দোকানের চায়ের জন্য মন খারাপ লাগে। বন্ধুদের আড্ডার জন্য মন পোড়ে। আমার অফিসের স্মৃতি চোখে ভাসে। কিন্তু এইসব তো সবসময়ই, সবজায়গাতেই, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেলে বিষয়বস্তু এদিকসেদিক করে হয়। কিন্তু নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার ভয়াবহতা এখানে আসার পর থেকে টের পাচ্ছি।

রাফিনঃ নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার ভয়াবহতা… হ্যাঁ, সেটাই। আচ্ছা, টুটুল ভাই, আমরা এখন একটু এগোই। আপনি জন্মসূত্রে সিলেটি?

টুটুলঃ হাহাহা। জন্ম কোথায়, বাড়ি কোথায় – এসব এখন আর আমার কাছে আলাদা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। আমার জন্ম হয়েছিল সুনামগঞ্জ শহরে। তারপর সিলেটে বেড়ে উঠেছি।

রাফিনঃ মহাজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে আসলে কিছুই জরুরী না। আমাদের অস্তিত্ব, আবেগ বা যুক্তি, সবই অর্থহীন। তবুও তো আমরা এসব নিয়ে মাতামাতি করি!

টুটুলঃ ব্যাক্তিগত বোধ থেকে আমি আমাকে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মনে করি না অনেকদিন হলো… নিজেকে বিশ্বনাগরিকই মনে করি।

রাফিনঃ আচ্ছা। তবু আপনার শৈশব কৈশোর, যে ইশকুলে পড়াশোনা করেছেন, এসব নিয়ে আমাদেরকে কিছু বলেন! পাঠকের তো জানার কৌতূহল থাকতে পারে… না?

টুটুলঃ আমার শৈশব-কৈশোর খুব বেশি রঙিন ছিল বলে আমার মনে হয় না। মা-বাবার ছোট সন্তান হওয়ার কারণে একটা আলাদা আহ্লাদ পেয়েছিলাম ঠিক, কিন্তু একা একা বড় হওয়ার কারণে সাথে সাথে একধরনের ইনট্রোভার্টনেস তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। আমার প্রথম স্কুল ছিল সিলেটের লামাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে এক বছর পরেই চলে এসেছিলাম ব্লু বার্ড স্কুলে। তারপর এম সি কলেজ, কিছুদিন জগন্নাথ কলেজ। ইউল্যাবের ছাত্রও ছিলাম কিছুদিন।

রাফিনঃ শিক্ষাজীবনের কোনো বিশেষ স্মৃতি কি মনে পড়ে?

টুটুলঃ স্মৃতি! সে তো পুরো স্কুল জীবনটাই একটা স্মৃতি। তবে দেয়াল পত্রিকা করা আর একবার এক একুশে ফেব্রুয়ারিতে নাটক লিখে সেটা মঞ্চস্থ করেছিলাম- যদিও খুবই সাধারণ ছিল আয়োজন, এই দুইটা ব্যাপার মনে পরে গেলো।

রাফিনঃ এখন একটু অন্যরকম একটা প্রশ্ন করা যাক। আমার কখনো সিলেটে থাকা হয় নি, বেড়াতে গেছি দুয়েকবার, মধ্যবিত্ত বাঙালিরা যেমন যায়! কিন্তু আমার এক বান্ধবী যে সিলেটে থেকেছে, তাঁর কাছে শুনেছি সিলেটের বৃষ্টি নাকি পৃথিবীতে সবচে সুন্দর, এটাকে কি আবেগগত অতিরঞ্জন বলবেন নাকি এতে আসলেই কিছুটা সত্যতা আছে?

টুটুলঃ ওহ! আপনি তো আমার শরীরের সবগুলো রোমকূপ খাড়া করিয়ে দিলেন! সিলেটের বৃষ্টি কী যে অসাধারণ, কত যে ব্যঞ্জনাময়, সুরেলা আর এক ধরনের বিমূর্ত দৃশ্যকল্প তৈরি করে – এর বর্ণনা আসলেই আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব না। আমি ঢাকা আসার পর এই বৃষ্টির জন্য খুব মন খারাপ হতো। খুব ইচ্ছে হতো তিনচার দিনের টানা বৃষ্টির মাঝে একটা টিনের চালের বাসায় নিজের মতো সময় কাটাতে। এক্ষুনি মিস করছি আবার সেই বৃষ্টি।

রাফিনঃ ১৯৯৫এ ঢাকার আগামী প্রকাশনী থেকে আপনার একটা ছোটো কবিতার বই বেরিয়েছিলো, নীল বিষে শিস কাটে ঠোঁট… আপনার কবিতাচর্চায় এই বৃষ্টির কোনো ভূমিকা আছে?

টুটুলঃ হ্যাঁ বইটা বের হয়েছিল। আমার তখন মনে হয়েছিল, আমি বোধ হয় কবিতা থেকে লিটল ম্যাগাজিন থেকে একটু দূরে সরে গিয়েছিলাম। এবং সেই সময়েই আমি একটা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পরেছিলাম। বইটা আসলে প্রেমিকার উৎসাহেই বা প্রেমিকার কাছে নিজের কবি অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে প্রকাশ করেছিলাম। এর পরে আমার আর কোনো বই বের হয়নি। একবার তিনটা পাণ্ডুলিপি গুছিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আর বই করতে ইচ্ছে হলো না। আমার ভেতরে বৃষ্টি-রোদ-অন্ধকার-আলো-মিছিল-মানুষ-কেশ-খোলা পিঠ-মৃত্যু-সঙ্গম সবকিছুই কবিতার দ্যোতনা তৈরি করে। জীবনের প্রতিটা মুহূর্তের মধ্যে কবিতায় থাকতে ভাল লাগে এবং যতক্ষণ থাকতে পারি সে-মুহূর্তগুলো আমি অসাধারণভাবে উপভোগ করি।

রাফিনঃ আপনার বর্ণনাভঙ্গি অসাধারণ। আসলে আমরা এসব নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে পারি, কিন্তু, তাতে সাক্ষাৎকার কখনোই শেষ না হওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। তাই এগোনো যাক।

টুটুলঃ হাহাহা। না না, সেরকম ঝুকি নেয়া ঠিক হবে না।

রাফিনঃ হ্যাঁ, এগোনো যাক। আপনার জন্ম ১৯৭৩এ, অর্থাৎ, আপনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে সে-সময়টায় যখন বাংলাদেশ সামরিক শাসনাধীন ছিল। তো, আশির দশকের সামরিকতন্ত্রী বাংলাদেশের সাথে নব্বই-পরবর্তী ‘গণতান্ত্রিক’ বাংলাদেশের ফারাকটা কোন জায়গায় দেখতে পান (যদি আদৌ কোনো ফারাক থাকে আর কি!)?

টুটুলঃ আমার এখন মাঝে মধ্যে মনে হয় কিছু গান-কবিতা-প্রতিবাদের মধ্যে থেকেও আশির দশক একটা স্থবির দশক ছিল। সামরিক শাসন আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন(যদিও এই জিনিসটা জাতি হিসাবে বোধ হয় আমরা ঐতিহাসিকভাবেই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি)- একটা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর ভিত্তিমূলে ঘুনপোকা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। রাজনীতির নিয়ন্ত্রন রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে চলে গিয়েছিলো(এখনও বাইরে থেকেই রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়)। তারপর নব্বইতে আমাদের আবেগ আবার নতুন করে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখলেও পরিণতি তো আপনার -আমার চোখের সামনেই বিরাজমান। নব্বইর গণআন্দোলনের পর আমরা দেখলাম গণতান্ত্রিক শাসনের পোষাকে সেই পুরনো একদলীয় শোষণের পুনরাবৃত্তি। এবং যতই সময় যেতে লাগলো সেই পরিণতি আরও ভয়াবহ থেকে ভয়াবহতর হয়ে গেলো। তো এসবের নেতিবাচক প্রভাব তো সমাজে পড়েছে। মানুষের মনস্তত্ত্বে পড়েছে। এটা আজ খুব সত্যি যে বাংলাদেশ গণতন্ত্র থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। তো পোষাকি ফারাকের বাইরে আর কোনো ফারাক আসলে তৈরি হয়নি।

রাফিনঃ হ্যাঁ, নূর হোসেনরা যে কিসের জন্য জীবন দিলেন, ভাবলে ভীষণ বিষণ্ণ লাগে আমার। আচ্ছা, আপনি সিলেট থেকে ঢাকায় কবে আসলেন? শুদ্ধস্বরের শুরুটা কিভাবে?

টুটুলঃ নূর হোসেনরা জীবন দিলো এবং বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যটা শেষ হয়ে গেলো। যেনোতেনোভাবে অর্থবিত্তের অধিকারী হওয়ার এক বাছবিচারহীন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলো। আমি ঢাকা আসি ৯২র শেষ দিকে। ঢাকায় স্থানান্তর হওয়াটা কোনো পরিকল্পিত ব্যাপার ছিলো না আমার। এক ধরনের পারিবারিক চাপে পরেই আমাকে আসতে হয়েছিলো। লিটল ম্যাগাজিন শুদ্ধস্বর প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ৯০র ডিসেম্বরে, এরশাদ পতনের পর। বই পড়ার একটা অভ্যাস হয়ে গেছিল। অভ্যাসটা নিজের মতো করে পথ করে নিতে নিতে মগজের ভেতর পোকা ঢুকিয়ে দিয়েছিল লিটল ম্যাগাজিন বের করার। একদিন সাইকেল চালাতে চালাতে শুদ্ধস্বর নামটা মাথায় গেঁথে গেলো।

রাফিনঃ শুরুর দিকে শুদ্ধস্বর ছোটো কাগজে কারা লিখতেন? কোনো বিশেষ স্মৃতি? সেই সূচনাকালীন সময়ের?

টুটুলঃ নিজেরা নিজেরাই। বন্ধু বান্ধব যারা লিখতাম সেইসময় তারাই। কিছু লেখক খুঁজে বের করেছিলামও। এদের কেউ কেউ পরবর্তীতে অনেক শক্তিশালী লেখক হিসাবে আবির্ভুত হয়েছেন। বেশির ভাগই এখনও শিল্পের প্রতি, মানুষের অধিকারের প্রতি কমিটেড আছেন। আমাদের গ্রুপটা কোনো ক্লোজড গ্রুপ ছিল না, ওপেন গ্রুপ ছিল। তবে লেখা লেখা হয়ে উঠলেই গ্রুপে এড করা হতো। দারুণ একটা সময় ছিল আমাদের। একাডেমিক লাইফকে বুড়া আঙুল দেখিয়ে দুনিয়ার তাবৎ বিষয়আশয়ের খোঁজখবর রাখতাম আমরা। পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন পেতাম না, পেলেও পরে আর টাকা দিতো না কেউ। দুইটা সংখ্যার জন্য সখের ক্যামেরা বিক্রি করতে হয়েছিল।

রাফিনঃ আচ্ছা… শুদ্ধস্বর প্রকাশনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো কবে?

টুটুলঃ অনেক পরে। ২০০৪ সালে। শুদ্ধস্বর গ্রুপের দুইজন লেখক যখন বই প্রকাশের জন্য প্রকাশকদের দরোজা থেকে ফিরে আসেন তখনই সিদ্ধান্ত নেই প্রকাশনা শুরু করার। শুরুটা খুব এমেচারিলি হয়েছিলো। তারপর আপনি তো জানেনই শুদ্ধস্বর থেকে তরুণদের বইই সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়েছিল।

রাফিনঃ হ্যাঁ। নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকে শুদ্ধস্বর থেকে যেসব বই বেরিয়েছিলো, তার মধ্যে কোনোটার কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে? হয় না এমন… সেটাকে ঘিরে কোনো স্মৃতি?

টুটুলঃ অনেক বইয়ের কথাই মনে পরে। মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, কবিতা, অনুবাদ, সংকলন -এরকম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বই বেরিয়েছিলো এই সময়ে। অভিজিৎ রায়ের সমকামিতা বইটি এই সময়েই প্রকাশিত হয়েছিলো। রুশ উপন্যাস সঞ্চয়ন, আইনস্টাইনের সহজপাঠ, অণুজীবের পৃথিবী, অরুন্ধতী রায়ের সাক্ষাৎকার, কমলকুমার চরিতম আরও অনেক অনেক বই। অনেক বই নিয়ে লেখকদের সাথে দুই-তিন বছর ধরেও আলোচনা হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০১৫র অক্টোবর পর্যন্ত পর্বের পুরোটাই তো এখন একটা স্মৃতির ফ্রেমে আটকে গেছে।

রাফিনঃ অভিজিৎ রায়ের সমকামিতাঃ একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান শুদ্ধস্বর থেকে বেরিয়েছিলো ২০০৯এ। অভিজিৎ রায় ও রায়হান আবীর যৌথভাবে অবিশ্বাসের দর্শন লিখেছিলেন, এটাও শুদ্ধস্বর থেকে বেরোয়, ২০১১তে। ২০১১তে অনন্ত বিজয় দাশ ও সৈকত চৌধুরীর যৌথভাবে লেখা পার্থিব বইটিও শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত হয়। এই বইগুলোর কোনোটির বিষয় সমকামিতা, কোনোটির অবিশ্বাস। এই টপিকগুলো আমাদের সমাজে আজ অবধি ট্যাবু। অর্থাৎ প্রথাবিরোধী বিষয়। বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতায় এসব বিষয়ে লেখা বই প্রকাশ করার সাহস আর দশজন প্রকাশক হয়তো করতেন না, কিন্তু আপনি করেছেন, যাঁরা মুক্ত চিন্তা করেন তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক সান্নিধ্যই কি আপনাকে এই সাহস যুগিয়েছিলো?

টুটুলঃ সেটাই। অসাধারণ সেইসব মানুষদের সান্নিধ্য আর নিজের পাঠ-বোধ-কমিটমেন্ট এগুলোই আমাকে প্রথাবিরোধী বই প্রকাশে অনুপ্রাণিত করেছে। আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন ‘১৫র ঘটনার আগে আরও কিছু প্রকাশক এগিয়ে এসেছিলেন প্রথাবিরোধী বই প্রকাশে। কিন্তু দীপন হত্যাকাণ্ডের পর তো আর সেই সাহস দেখানোর জায়গাটা থাকলো না।

রাফিনঃ হ্যাঁ, লেখকরা সেলফ-সেন্সরশিপ আরোপ করেছেন, আর প্রকাশকরাও অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গেছেন। বাংলা একাডেমিও মাঝখানে প্রতিক্রিয়াশীলদের সাথে আপোস করেছে। শ্রাবণের রবীন ভাই বলতে গেলে এককভাবে প্রতিবাদ করে গেছেন, তিনি তো আর কারো তেমন সমর্থন পেলেন না এই প্রতিবাদে, মানে প্রকাশকদের কাছ থেকে।

টুটুলঃ প্রতিবাদ শব্দটাই তো আক্ষরিক অর্থে বদলে গেছে বাংলাদেশে। আমাদের রাজনীতির নীতিহীনতার বহিঃপ্রকাশ এই পরিস্থিতি। মানুষের ভেতরে প্রতিবাদ করার মানসিকতা নাই, প্রতিবাদ করলে সেই প্রতিবাদে কান দেয়ার কেউ নাই এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো প্রতিবাদ মানুষকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংকটের মধ্যে ফেলে দেয়। তার উপর আছে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুবিধাবাদিতার দাপট। প্রকাশকরাও এর বাইরে নন,  লেখকরাও নন। একটা জাতির শক্তির জায়গাটা কোথায় আর থাকলো বলেন!

রাফিনঃ ২০১৩-১৫র সেই অন্ধকার সময়টায় এমন কেউ তো ছিলেন না বাংলাদেশে, যিনি মুক্ত চিন্তা করেন ও লেখালিখির সাথে যুক্ত, অথচ পরিবারপরিজন থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব পর্যন্ত সকলের পরামর্শ পান নি রাস্তায় একটু সতর্ক হয়ে হাঁটার বা কলমে রাশ টানার?

টুটুলঃ সে তো খুব বাস্তব সত্য, নির্মম সত্য। সতর্ক হয়েও তো রক্ষা পাওয়া গেলো না। ২০১৫র পুরোটা আমি নিজে সবকিছু থেকে অনিয়মিত ছিলাম। ব্যবসা-কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা তো করতে পারলাম না। কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে পরিস্থিতি এখনো তেমন বদলায়নি। আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা মানুষের সংখ্যা তো কম নয়। এই আতংকের রাশ কে টানবে?

রাফিনঃ পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায় নি এটা খুবই সত্য। কিন্তু আতঙ্ক বিশেষ থেকে সাধারণের দিকে গেছে। মানে শুরু শুরুতে সবাই ভেবেছিলো শুধু মুক্ত চিন্তার ব্লগার বা প্রকাশকরাই আক্রান্ত হবে। কিন্তু হোলি আর্টিজানে বিদেশি নাগরিকদের আক্রান্ত হওয়া, দেশের বিভিন্ন জায়গায় অমুসলিমদের ওপর রাষ্ট্রীয় মদদে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, শিয়া মসজিদে হামলা ইত্যাদি আতঙ্কটাকে বলতে গেলে সাধারণ একটা রূপ দিয়েছে। এখন যেমন জিহাদি রাজনীতির, প্রচলিত ভাষায় যাকে জঙ্গিবাদ বলা হয়, বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও পাবলিক অ্যাওয়ারনেস তৈরি হয়েছে। এটা একেবারেই ছিল না, এমনকি ২০১৫তেও। তবে অনেকেই এখনো আন্ডারগ্রাউন্ডে আছেন, অনেকে দেশ ছেড়েছেন, মুক্ত চিন্তা চর্চার যে সম্ভাবনা একটু একটু করে তৈরি হচ্ছিলো সেটাকে বলতে গেলে গলা টিপে মারা হয়েছে।

টুটুলঃ মুক্তচিন্তার ব্লগার- লেখকরা এখনও এক নাম্বার টার্গেটই আছেন। আপাতত কোনো ঘটনা ঘটছে না দেখে নিরাপত্তা এসে গেছে- এটা ভাবার কোনো সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশে এই মৌলবাদকরণের জন্য দায়ি যতটা মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি, ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক চেতনা তার চেয়ে কম দায়ি নয়। এই যে পারস্পরিক যোগসাজশ, ঐক্য -এই জটিল ও দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতায় মুক্তবুদ্ধির, গণতান্ত্রিক চেতনার জায়গা আর থাকে কোথায়?

রাফিনঃ কোথাও থাকে না! একটু পেছনের দিকে যাওয়া যাক টুটুল ভাই। ২০১৩র শাহবাগ আন্দোলন, এবং এর বিরোধিতায় হেফাজতে ইসলামের উত্থান, এই পুরো বিষয়টাকে আপনি ঠিক কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

টুটুলঃ দেখা গেছে সামরিক শাসনাধীন রাষ্ট্রের মানসিক ও আচরণজনিত পরিবর্তন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও দুর্বৃত্ততা ছাত্র আন্দোলনকে তৃণমূলের সাথে সম্পর্কহীন করে ফেলে। বাংলাদেশের মতো একটা অর্থনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসর সমাজে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং প্রগতিশীল ধ্যান ধারনা, চেতনার বিকাশে রাজনৈতিক দলগুলো বিকল্প শিক্ষা মাধ্যম হিসাবে কাজ করে। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নব্বুইয়ের পরবর্তি সময়ে তৈরি হয় প্রবল শূণ্যতার। গ্লাস্তনস্ত-পেরোস্ত্রইকার প্রভাবে ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমরা লক্ষ্য করি প্রগতিশীল রাজনীতিবিদরা নিজেরা আস্থার সংকটে পরেন এবং দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। এই শূণ্যতা ও পরিবর্তনের সুযোগ পুরোপুরি ভাবে কাজে লাগিয়েছিল মৌলবাদী রাজনীতি। সমাজের সর্বস্তরে শেকড় গেড়ে বসার সুযোগটা তারা নিতে পেরেছে। তৃণমূল পর্যন্ত তারা তাদের রাজনৈতিক স্কুলের সম্প্রসারণ ঘটাতে পেরেছে। অন্যদিকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বা আন্দোলন ক্রমেই শহরের কিছু বৃত্তাবদ্ধ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পরে। এই সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপ প্রগতিকামী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে একই সাথে হতাশা ও আকাঙ্খার জন্ম দিয়েছিলো। এই হতাশা ও আকাঙ্খার বিস্ফোরণ আমরা লক্ষ্য করি শাহবাগ আন্দোলনের সময়। যদিও শাহবাগ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল কিছু নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে। এবং সেই দাবি আদায়ে সফলও হয়েছিল শাহবাগ। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষদের একাত্মতা, বিশেষ করে তরুণদের একাত্মতা -এই প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে আরও বড় স্বপ্নের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ( আমি বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের চার মূলনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসাবে গণ্য করি) একটা স্মার্ট প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন ছিল সেটা। পাশাপাশি হেফাজতের উত্থানটাও লক্ষনীয়। তৃণমূলের সাথে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাই কিন্তু হেফাজতকে সুযোগ করে দিয়েছে এই চরম উত্থানের। তো এইটাকে আমরা প্রেক্ষাপট হিসাবে রেখে পরবর্তীতে আমরা প্রত্যক্ষ করি ক্ষমতার রাজনীতির(ক্ষমতার মানে তো এখানে দুর্নীতি করার একচেটিয়া অধিকার) চাল -পাল্টা চালের খেলা। আশ্চর্য বিষয় ক্ষমতাসীনরা এই প্ল্যাটফর্মকে ক্ষমতার জন্য হুমকি হিসাবে বিবেচনা শুরু করলেন। কাদের পরামর্শে করলেন সেটা নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে (আমি এখানে গল্পের বর্ণনা দিতে আগ্রহী না)। তো পরিণতিটা কিন্তু আদতে ভাল হলো না। আসলে সময় তো এখন আর আগের মতো নাই। রাষ্ট্রের ভূমিকা এখন অনেক বেশি কঠোর ও নিষ্ঠুর হয়ে গেছে(মাঝে মধ্যে আমার কাছে এই ব্যাপারগুলোকে প্রাচীনকালের রাজাবাদশাদের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মতো মনে হয়)। আমার মনে হয় এই ঘটনা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ থেকে আরও একটু বেশি দূরে ঠেলে দিলো। আবার দেখেন, হেফাজত এখন সরকারের অনেক কাছাকাছি অবস্থান করছে। হেফাজতের অনেক দাবির সাথে সরকারীদল সরাসরি একমত পোষণ করছেন, হেফাজতকে নানান ধরনের সুবিধাদি দিচ্ছেন। অনেকে বলেন এটা নাকি ডির‍্যাডিকাইলাইজড করার প্রক্রিয়া। আমার অবশ্য তা মনে হয় না। শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে না পারলে ডির‍্যাডিকালাইজেশন সম্ভব না। অবশ্য টেক্সট বই নিয়ে যে ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে সেখানে প্রত্যাশার জায়গাগুলো কেবলই মুখ থুবরে পরে।

রাফিনঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের একটা নেতিবাচক প্রভাব এই দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির ওপর তো পড়েছেই, বিশেষত, যারা মস্কোপন্থী বলে পরিচিত ছিলেন তাঁদের ওপর। আরেকটা ঘটনা কিন্তু সমান্তরালেই ঘটেছে, টুটুল ভাই। মস্কোপন্থী বামদের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলার পাশাপাশিই আমরা এনজিওকেন্দ্রিক সিভিল সোসাইটির একটা উত্থান দেখেছি বাংলাদেশে, যাঁদের একাংশ ১/১১-র সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন, এঁদেরকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

টুটুলঃ পশ্চিমা দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে যে সহযোগীতা দিয়ে থাকে এনজিও কার্যক্রম তারই একটা অংশ। এটা তো সত্য যে, বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক অর্থনৈতিক মানসিকতার পরিবর্তনে এনজিওগুলো একটা বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। নারীর ক্ষমতায়নেও এনজিওর ভূমিকা অনেক। এটাও সত্য বাংলাদেশে শক্তিশালী আমলা এবং রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি এনজিও কর্তারাও (এদের বেশিরভাগই বাম ঘরানার প্রাক্তন রাজনৈতিক কর্মী) একটা প্যারালাল নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সমাধান তারা অনেক সময় যেভাবে চেয়েছেন, যেমন ১/১১র পরোক্ষ সামরিক শাসন – সেটা তো একটা জাতির জন্য, দেশের জন্য ভাল ফলাফল বয়ে আনে না। এতে মানুষের মৌলিক অধিকার যেমন রহিত হয় তেমনি মানুষের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশও বিঘ্নিত হয়। আর গণতন্ত্রের স্বপ্ন -সে তো সুদূর থেকে আরও সুদূরে সরে যায়। তবে আমি নিশ্চিত নই এনজিও কর্তাদের এহেন কার্যক্রমে তাদের ডোনার দেশগুলোর সমর্থন থাকে কি না।

রাফিনঃ আমার মনে হয় ডোনার দেশগুলোর সমর্থন থাকে। আপনি একটা ভালো পয়েন্ট বলেছেন, এনজিও কর্তাদের বেশিরভাগই বাম ঘরানার প্রাক্তন রাজনৈতিক কর্মী। আপনার কি মনে হয়, যারা একসময় সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতেন ও দ্যাখাতেন, তাঁরা এনজিও কার্যক্রমের দিকে ঝুঁকলেন কেনো?

টুটুলঃ প্রথমত এটা তো অবশ্যই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কাজ করার সুযোগ পেয়ে ঝুঁকেছেন। তাছাড়া তাদের ক্রিয়েটিভ চিন্তাভাবনার বাস্তবায়ন করার স্বপ্নও তাদেরকে এনজিও কার্যক্রমের দিকে আগ্রহি করে তুলেছিলো। প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক হতাশার জায়গাটাকে পরোক্ষভাবে নতুন একটা প্রত্যাশার প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নও হয়ত কারো কারো ছিলো।

রাফিনঃ তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, আপনি বলতে চাইছেন, বাম রাজনীতিতে সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা বাস্তবায়ন করার সুযোগ ছিলো না?

টুটুলঃ না আমি সেটা বলতে চাইছি না। সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা বাস্তবায়ন করার সুযোগ তো বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদের হয়নি। অর্থাৎ তারা কখনো ক্ষমতায় ছিল না। তবে আমার ধারণা বামরা ক্ষমতায় গেলে উন্নয়ন বিষয়ে প্রচলিত ধারনাটা একটু পাল্টাতো। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে গঠনমূলক পৃষ্ঠপোষকতা বাড়তো। দেশের মানুষের মানসিক পরিগঠনের ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিতো।

রাফিনঃ আমি অবশ্য বলতে চাচ্ছিলাম বাংলাদেশের বাম রাজনীতির যে সাংগঠনিক চর্চা সেখানে সৃষ্টিশীলতার পরিসর কতোটুকু ছিল বা আছে…। যা-হোক, প্রসঙ্গান্তরে যাই! বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে মুক্ত চিন্তা চর্চা চলছে, এটাকে যদি একটা আন্দোলন হিসেবে দ্যাখেন, তাহলে এর আভ্যন্তরীণ দুর্বলতা হিসেবে কী কী শনাক্ত করবেন?

টুটুলঃ বাংলাদেশের কোনো রাজনীতিতেই সাংগঠনিক চর্চার মধ্যে সৃষ্টিশীলতার খুব ভাল পরিসর আছে বলে আমার মনে হয় না। এই না থাকার কারণ (বৃহত্তর অর্থে) নিয়ে অধ্যাপক তপন রায়চৌধুরীর সাথে একবার আলাপ করার খুব ইচ্ছা ছিল। মুক্ত চিন্তা বা মুক্তবুদ্ধি চর্চা এই প্রান্তীয় ব-দ্বীপে সময়ে সময়ে নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। এসবের নানান ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। আবার খুব নিরবে নিজে নিজে কেউ কেউ নিজেকে বিযুক্ত করেছেন প্রচলিত সমাজ-সংস্কার-ধারনা থেকে। যেমন আরজ আলী মাতুব্বর। তবে আপনি যে আন্দোলনের কথা বলেছেন, আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি -সেটা হলো ব্লগকেন্দ্রিক মুক্ত চিন্তা আন্দোলন। আসলে চিন্তার স্বাধীনতা নিজেই একটা সাংঘাতিক শক্তি। মানুষ যখন নিজের চারপাশের সকল বদ্ধমূল ধারনা, প্রচলিত চিন্তার, কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবতে পারে পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় শক্তি আর কিছু হতে পারে না। তবে পরিশীলন বলে একটা ব্যাপার আছে, যেটা মানুষ তার স্বাধীন চিন্তা দিয়েই বের করে এনেছে। তো স্বাধীন চিন্তার প্রকাশে, উপস্থাপনে এই পরিশীলন ব্যাপারটাকে আমাদের সবারই মাথায় রাখা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এবং লেখালেখির জন্য আরেকটা প্রয়োজনীয় ব্যাপার খুব জরুরি বলে আমি মনে করি সেটা হলো কমন সেন্স। আমি সেলফ-সেন্সরশিপে আস্থা রাখি না তবে কমন সেন্স আমার কাছে খুব জরুরী বলে মনে হয়।

রাফিনঃ হ্যাঁ, পরিশীলন আর কাণ্ডজ্ঞান, দুটোই খুব জরুরী। বাংলাদেশে বিশেষত ২০১৩ থেকে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির যে নব উত্থান ঘটেছে সেটাকে অন্তত বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রতিহত করার পন্থা কী? তরুণ মুক্ত চিন্তকদের প্রতি কোনো পরামর্শ…?

টুটুলঃ প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি প্রতিহত করার দায়িত্ব তো এককভাবে তরুণ মুক্ত চিন্তকদের হতে পারে না। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে রাজনীতিবিদের। এবং অবশ্যই রাষ্ট্রের। মুক্ত চিন্তকদেরকে আমি লেখক হিসাবেই বিবেচনা করি। আমি প্রত্যাশা করবো তারা যৌক্তিক ও গঠনমূলক লেখা বা সমালোচনা লিখবেন। এমনভাবে লিখবেন যাতে পাঠক প্রতিক্রিয়াশীল ধ্যানধারনার অসারতা, যুক্তিহীনতা, অপ্রাসঙ্গিকতা বুঝতে পারে এবং নিজের চিন্তাকে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ পায়। এছাড়া মুক্ত চিন্তা আন্দোলনকারীদের সাধারণ মানুষের সাথে সংশ্লিষ্টতা বাড়ানো প্রয়োজন। বুদ্ধিবৃত্তিক মোটিভেশন তৃণমূল পর্যায়ে করা প্রয়োজন।

রাফিনঃ শেষ প্রশ্নটা করতে চাই রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। ২০১৪র বিতর্কিত নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এটা তো দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণের, বিশেষত তরুণদের, কী করার আছে বলে আপনি মনে করেন?

টুটুলঃ দেখেন, অনেক ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একধরনের বিরাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গেছে। আপনি-আমি-জনগণ এমনকি রাজনীতিবিদরা পর্যন্ত জাতীয় সংসদকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে মনে করেন না। তরুণরা রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ। এই ব্যাপারটা ভাল ঠেকে না। এইটা দেশের মানুষের সাথে মানুষের শ্রেণি বৈষম্যের সংকটকে প্রবল করে তুলে। মানে সাধারণ হতদরিদ্র মানুষদের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার প্রক্রিয়ায় এখনকার অধিকাংশ তরুণরা যুক্ত নন। তরুণরা সাধারণভাবে এখন রাজনীতিমুক্ত গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখে! তবে এটা তো সত্য, এই পরিস্থিতি যে তৈরি হল, এর রাজনীতিবিদরাই দায়ি। এই মেন্টাল গ্যাপ ছাড়া বাংলাদেশের তরুণরা অবশ্য এখন অনেক স্মার্ট, অনেক যুগোপযোগী। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষরাও জীবন সংগ্রামের সর্বোচ্চ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এসবই আশার স্বপ্ন দেখায়। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তন আমি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রত্যাশা করি। মৌলবাদ প্রতিহত করা, দুর্নীতি বন্ধ করা, নারীর ক্ষমতায়ন, নারী নির্যাতন বন্ধ করা এসব কিছুর জন্য দরকার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেয়া, সংস্কৃতিমনষ্ক করে গড়ে তোলার প্রেক্ষাপট তৈরি করা। আমি মনে করি দালানকোঠা- ব্রিজ-ক্যান্টনমেন্ট- ফ্লাইওভারের চেয়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে বেশি বিনিয়োগ করা দরকার। তবে এটি কোনোমতেই সম্ভব হবে না যতক্ষণ না রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষয়গুলোর জন্য কমিটেড না হবে। তো তরুণরা যদি আরও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় (অর্থ বা আত্মীয়তার খুঁটির জোরে নয়) স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহন করে তাহলে আশা করা যায় ভবিষ্যতে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু তার আগে বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধাটা সবচেয়ে জরুরী।

রাফিনঃ আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

টুটুলঃ আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

নোটঃ ২৮ অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে ২৯ অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকারদাতা নরওয়েতে ছিলেন আর সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ছিলেন বাংলাদেশে। প্রকাশের আগে সাক্ষাৎকারদাতাসহযোগে প্রয়োজনীয় সম্পাদনা করা হয়েছে।

Please follow and like us: