//ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশঃ রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, ও ক্রিকেট

ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশঃ রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, ও ক্রিকেট

PHOTO Faisal Akram

অনেকে বলছেন, ইন্ডিয়া যে সীমান্তে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের নাগরিকদের খুন করে আসছে এবং বাংলাদেশের নদীগুলোকে খুন করছে বাঁধ দিয়ে, ক্রিকেট খেলায় ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিম বাংলাদেশ/পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের কাছে হেরে গেলে তার শোধ নেয়া হয়।

বুঝলাম।

অনেকে বলছেন, ১৯৭১এ পাকিস্তান তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালিয়েছিলো ও খুন-ধর্ষণ-অত্যাচারের নরক তৈরি করেছিল, ক্রিকেট খেলায় পাকিস্তান ক্রিকেট টিম ইন্ডিয়া/বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের কাছে হেরে গেলে তার শোধ নেয়া হয়।

আচ্ছা, সেটাও বুঝলাম।

এবার এই রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একটু লেখা যাক, সেই সূত্রে জাতীয়তাবাদের কথাও, লেখার শেষে আবার ক্রিকেটে ফিরে আসবো।

প্রথমেই ইন্ডিয়াকে দেখি। ইন্ডিয়ার অহিন্দু-দলিত নাগরিকরা নানাবিধ নিপীড়ণের শিকার হন। গুজরাতে কী হয়েছিলো সেটা আপনার সবাই জানেন, জানেন নিশ্চয় গরুর গোশত খাওয়ার “অপরাধে” কারা আক্রান্ত হয়, ফিরোজাবাদে ক্ষুধার যন্ত্রণায় খাবার চুরি করার “অপরাধে” যে দুই শিশু ভাইবোনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো তারা কারা সেটাও হয়তো কেউ কেউ জানেন। যেটা অনেকেই জানেন না, সেটা হচ্ছে স্বর্ণমন্দিরে সেনাবাহিনী ঢোকানো অপারেশন ব্লু স্টার সম্পর্কে, ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী তার শিখ দেহরক্ষীদের হাতে আততায়িত হওয়ার পর শিখদের ওপর কি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক নির্যাতন চালানো হয়েছিলো সেটা সম্পর্কে। ইন্ডিয়ায় ক্ষমতার কেন্দ্র তার হিন্দীভাষী অধ্যুষিত প্রদেশগুলো। কাশ্মীর আর সাত বোন অঙ্গরাজ্য, যারা কখনোই ঐতিহাসিকভাবে ইন্ডিয়ার অংশ ছিল না (মুঘল আমলের আগে অখণ্ডভাবে ইন্ডিয়া বলেই কিছু ছিল কিনা সেই প্রশ্ন আপাতত থাক) এবং ব্রিটিশ আমলে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে অস্তিত্বশীল ছিল। সেখানে ইন্ডিয়া কোন ধরণের জাতিগত শোষণনিপীড়ণ চালায় সেটাও সবাই জানেন।

পাকিস্তান কী আলাদা? পাকিস্তানের অন্যায় শুধু ১৯৭১এর গণহত্যাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৭১এর আগে ও পরে, এই রাষ্ট্রের অমুসলমান নাগরিকরা নানাবিধ নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন, বলা দরকার এখনো হয়ে চলেছেন। আবার পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্র হচ্ছে পাঞ্জাব প্রদেশ। ফলে সিন্ধু, বালুচিস্তান, ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নাগরিকরা – ১৯৭১এ স্বাধীনতা অর্জন করার আগ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও বর্তমান বাংলাদেশের নাগরিকরাও – আঞ্চলিক শোষণনিপীড়ণ ও বঞ্চনাবৈষম্যের শিকার হয়েছেন। ১৯৭১এর গণহত্যার অন্যতম অপরাধী টিক্কা খানকে বালুচিস্তানের কসাই বলা হত, কারণ সে, বালুচিস্তানে ঈদের জামাতে কামানে দেগেছিল। মোটকথা, ধর্মীয় ও জাতিগত নিপীড়ণ-বৈষম্যে পরিপূর্ণ পাকিস্তান।

বাংলাদেশের কাহিনী কী? ১৯৭২এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দূর্গা পূজায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় মণ্ডপ ভাঙা দিয়ে অমুসলমান নাগরিকদের ওপর যে নিপীড়ণ শুরু হয়েছিলো তা সাঁথিয়া রামু হয়ে নাসিরনগর পর্যন্ত চলমান আছে। বাংলাদেশ ইন্ডিয়া বা পাকিস্তানের মতো প্রাদেশিক না, তবু সব ক্ষমতায় রাজধানী ঢাকাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে, সামান্য কিছু চট্টগ্রামে। দুইদিন আগেও উত্তরবঙ্গের মানুষ না খেয়ে মরতো। হাওরের মানুষেরা এখনো সুষ্পষ্টভাবেই আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার, যার প্রমাণ পাওয়া গেলো কিছুদিন আগে। উর্দুভাষী অবাঙালিরা কোন দশায় থাকেন সবাই জানে, সবাই জানে পাহাড়িদের সাথে কী হয়। আপনি কি কোনোদিন লোগাং গণহত্যার কথা শুনেছেন?

থাক।

নারী আর শ্রমিকরা দুনিয়ার সব জায়গাতেই শোষণনিপীড়ণ আর বৈষম্যবঞ্চনার শিকার, তাই, তাদের নিয়ে বেশি কথা না বলি।

তবু সংক্ষেপে দুয়েকটি কথা না বললেই নয়।

দিল্লিতে বাসে একটি মেয়েকে গ্যাংরেপ করা হয়েছিল। মেয়েটির নাম নির্ভয়া। নির্ভয়া তাও ন্যায়বিচার পেয়েছে, মাওবাদী-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সালওয়া জুদুমের হাতে যেসব আদিবাসী নারী রেপড হয়েছেন, তারা পায় না।

স্থানটা মনে আসছে না, খুব সম্ভবত করাচিতে। এক হতদরিদ্র ক্রিশ্চান শ্রমিক দম্পতিকে ইটের ভাটায় ফেলে দিয়ে আগুন পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো। যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে তারা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের শিকার, কিন্তু দোহাইটা দেয়া হয়েছিল ইসলামের, বলা হয়েছিল তারা নাকি ব্লাসফেমি করেছে।

ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছিলো। সোহাগি জাহান তনু। তাকে মার্ডার করার আগে রেপ করা হয়েছে, আজ পর্যন্ত এই ঘটনার বিচার হয় নি, সম্ভবত হবেও না কোনোদিন। তাজরিন ফ্যাশনসে শ্রমিকদেরকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো, পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো পরবর্তীতে ট্যাম্পাকোর কারখানায়ও। রানা প্লাজায় ভবন ধবসিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। জীবিত শ্রমিকরা পায় পৃথিবীতে সবচে কম মজুরি, থাকে গাদাগাদি করে ছোট্টো একটা ঘরে, বাঁচে পুলিশ-মাস্তানের সন্ত্রাসের ছায়ায়। তাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকা নিয়ত মৃত্যুর সমান।

এই তিন রাষ্ট্রেরই আরেকটি ‘অপূর্ব’ বৈশিষ্ট্য আছে। দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের অন্য রাষ্ট্রগুলোতেও আছে সেটা। দায়মুক্তি দেয়া রাষ্ট্রীয় খুনী বাহিনীদের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।

১৯৭১এ আলবদর পাকিস্তান রাষ্ট্রের এমন বাহিনী ছিল, এখন বিশেষ বাহিনী আছে কিনা জানি না, তবে সিন্ধু, বালুচিস্তান আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যারা জাতীয় মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছেন তাদেরকে নিয়মিতভাবেই খুন করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। ১৯৭১র পরে স্বাধীন বাংলাদেশে ছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনী, নতুন সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে র‍্যাব গঠন করা হয়েছিলো এক সরকারের আমলে, বহাল তবিয়তে আছে এবং খুন করে যাচ্ছে আরেক সরকারের আমলে। ইন্ডিয়ায় অবশ্য আলাদা বাহিনী লাগে না সাধারণত, যা করার তাদের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোই করে। সাত বোন অঙ্গরাজ্যের একটি মণিপুরে ১৯৭৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত মোট ১৫২৮ জন মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, আফসপা নামের বিশেষ আইন তৈরি করা হয়েছিলো ১৯৫৮তে, যাতে এইসব হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার করা না যায়। ইন্ডিয়ায় এটাকে ‘এনকাউন্টার’ বলে, আর বাংলাদেশে ‘ক্রসফায়ার’। কথিত কাউন্টার ইনসারজেন্সি উপমহাদেশের তিন রাষ্ট্রেই চলছে, চলেছে শ্রীলঙ্কার মতো অন্য উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রেও।

সাফোকেটেড ফিল করলে একটু থামেন, দম নেন।

তো, এখন পর্যন্ত যেসব ঘটনার কথা লিখলাম (অতি সামান্যই লিখেছি আসলে), তার প্রতিটির ক্ষেত্রে শোষকনিপীড়ক/খুনী/ধর্ষক ‘ইন্ডিয়ান/পাকিস্তানি/বাংলাদেশি’, আর শোষিতনিপীড়িত/শিকার/ধর্ষিতাও ‘ইন্ডিয়ান/পাকিস্তানি/বাংলাদেশি’।

ইন্ডিয়া রাষ্ট্র কার প্রতিনিধি – শোষকনিপীড়ক/খুনী/ধর্ষকের নাকি শোষিতনিপীড়িত/শিকার/ধর্ষিতার?

পাকিস্তান রাষ্ট্র কার প্রতিনিধি – শোষকনিপীড়ক/খুনী/ধর্ষকের নাকি শোষিতনিপীড়িত/শিকার/ধর্ষিতার?

বাংলাদেশ রাষ্ট্র কার প্রতিনিধি – শোষকনিপীড়ক/খুনী/ধর্ষকের নাকি শোষিতনিপীড়িত/শিকার/ধর্ষিতার?

কী মনে হয়?

জাতীয় পতাকা একটা কাফনের কাপড় যা শুধু রাষ্ট্রের হাতে খুন হওয়া মানুষের লাশ ঢেকে দেয়ার কাজে আসে।

ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের অন্যায়ের শোধ কিভাবে নেয়া হয় সেটা লেখার শুরুতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের কিছু অন্যায়ের বর্ণনা দেয়া হয়েছে উপরে।

কেউ বলতে পারেন ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম কার কাছে হারলে ত্বকী, বা তনু, বা কল্পনা, বা রমেল, বা চলেশ রিছিল, বা দ্বিজেন টুডু, বা ফারজানার পরিবারের সাথে হওয়ার অন্যায়ের শোধ নেয়া হবে?

ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ- আজকের এই তিন রাষ্ট্রই ১৯৪৭এর আগ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের উপনিবেশ ছিল। ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার, অর্থাৎ ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান ‘আজাদ’ হওয়ার, কয়েক বছর আগে যে ভয়ংকর মন্বন্তর হয়েছিলো তাতে বাংলার প্রায় চল্লিশ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা যায়। সাতচল্লিশে তাই তদানীন্তন কমিউনিস্ট পার্টি একটা শ্লোগান তুলেছিলঃ “লাখো ইনসান ভুখা হ্যাঁয়, ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যাঁয়!” (বাংলা অনুবাদ – “লাখো মানুষ না খেয়ে আছে, এই স্বাধীনতা মিথ্যা স্বাধীনতা!”)।

আপনারা জানেন যুক্তরাজ্যের অন্তর্গত ইংল্যাণ্ড ক্রিকেট খেলে।

ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম যদি ইংল্যাণ্ড ক্রিকেট টিমকে চল্লিশবার হারায় তাহলে কি মন্বন্তরের শোধ নেয়া হবে?

আয়লান কুর্দি পানিতে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল, তোহাইত রোহিঙ্গা কাদায়, ফেলানি খাতুন উল্টো হয়ে ঝুলছিলো একটা কাঁটাতারে।

জাতীয়তাবাদ শিশুদেরকে কী দিতে পারে মৃত্যু ছাড়া?

সে অবশ্য বড়োদেরকে ক্রিকেটকেন্দ্রিক উন্মাদনা দিতে পারে। অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায়। ইন্ডিয়ায়, পাকিস্তানে, বাংলাদেশে।

কৃষন চন্দর যাকে উর্দু ছোটোগল্পের ইমাম আখ্যা দিয়েছিলেন সেই অসাধারণ লেখক সাদত হাসান মান্টো ছিলেন দোলনাসূত্রে ইন্ডিয়ান, কবরসূত্রে পাকিস্তানি, আর রক্তসূত্রে কাশ্মীরী… আমি তাঁকে ভালোবাসি… আমি ভালোবাসি উপমহাদেশকে। কোনো রাষ্ট্রকে নয়। মানুষকে, মানুষকে, মানুষকে।

২০ জুন ২০১৭

Please follow and like us: