//‘আমার মুক্তির গল্প’ : অনুপম দেবাশীষ রায়ের সাক্ষাৎকার

‘আমার মুক্তির গল্প’ : অনুপম দেবাশীষ রায়ের সাক্ষাৎকার

আলোকচিত্র Anupam Debashis Roy

অনুপম দেবাশীষ রায় একজন তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত ভিডিও সিরিজ চরমচিত্র বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মাঝে সাম্প্রতিককালে বেশ সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। অনুপম সাধারণ অর্থনৈতিক মুক্তি, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার, সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের নিরাপত্তা এবং গোষ্ঠীবাদবিরোধিতার মতন বিষয়গুলোকে সামনে রেখে কাজ করেনতিনি থাকেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে তাঁর অর্ধেক সময় কাটে নিউ ইয়র্কে, বাকি অর্ধেক ওয়াশিংটন ডিসিতে। বর্তমানে তিনি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিদ্যা অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মুক্তিবাদী রাজনীতির সাথেও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আছেনরিসার্চ ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করছেন ম্যানহাটন ইন্সটিটিউট নামক একটি থিংক ট্যাংকে, একইসাথে ভারতীয় এলিটদের রাজমানসিকতা নিয়ে গবেষণা চালানোর উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পেও অংশ নিচ্ছেনতাঁর গবেষণা আগ্রহ শাহবাগ আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি

সাক্ষাৎকারগ্রহীতাঃ ইরফানুর রহমান রাফিন

*

ইরফানুর রহমান রাফিনঃ কেমন আছেন অনুপম?

অনুপম দেবাশীষ রায়ঃ ভাল।

রাফিনঃ আপনি বাংলাদেশ ও বিশ্বরাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। এই সচেতনতা আপনার বিভিন্ন কাজে প্রকাশ পায়। এই রাজনীতিবিষয়ক চিন্তাভাবনার শুরুটা কোথা থেকে হল?

অনুপমঃ ছোটোবেলায় আমি আমার মায়ের সাথে বসে বসে টক শো দেখতাম। টক শো দেখতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন পলিটিকাল ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতাম। তো সেখান থেকেই আর কি… সেখান থেকেই একটা সময় মনে হল পলিটিকাল সায়েন্স পড়বো…। কারণ আমার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে, রাজনীতি নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। তো, সেখান থেকেই। টক শো থেকেই বলতে পারেন। মা’র সাথে টক শো দ্যাখা থেকেই।

রাফিনঃ আচ্ছা। টক শো দেখতে দেখতেই রাজনীতির ব্যাপারে প্রথম আগ্রহ জন্মে আপনার, এরপর সিদ্ধান্ত নেন, রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করবেন। টক শো ছাড়া আপনার পরিবার বা পরিবারের বাইরের কোনো ব্যক্তি কি আপনাকে রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলেছেন… অর্থাৎ, কোনো বিশেষ অনুপ্রেরণা?

অনুপমঃ না। ডিবেট করতাম, কথা বলতে ভালো লাগতো। ডিবেট করতে করতে একসময় মনে হইল যে, কথাবার্তা বলে খুব একটা লাভ নাই। কথাগুলাকে কাজে পরিণত করতে হবে বা কমপক্ষে ইনফ্লুয়েন্সে পরিণত করতে হবে।

রাফিনঃ ওকে। আপনি তো রাজনীতি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই পড়াশোনা করছেন। আপনি কোন রাজনৈতিক/অর্থনৈতিক চিন্তকদের দ্বারা প্রভাবিত? দেশে ও বিদেশে? কাদের লেখা ভালো লাগে?

অনুপমঃ আচ্ছা কোন চিন্তকদের দ্বারা আমি প্রভাবিত এটা বলা একটু কঠিন, কারণ আমি এখনো শেখার পর্যায়ে আছি তো, কাজেই প্রভাবের ব্যাপারটা হচ্ছে পরিবর্তনশীল। মানে দ্যাখা যায় যে কারোর প্রভাব থাকে আমার ওপর, কারো লেখা হয়তো ভালো লাগে, কিছুদিন পরে আবার তার ওপর এক ধরণের বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়। তাঁর লেখা, তাঁর কাজ আর ভালো লাগে না। যেমন ধরেন, যখন আমি প্রথম ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইলাম তখন হচ্ছে গিয়ে, কার্ল মার্ক্সের লেখা দ্বারা খুব প্রভাবিত ছিলাম। তো পরবর্তীতে কার্ল মার্ক্সের বিভিন্ন জিনিশের প্রতি আমার… বিশেষ করে তাঁর লেখার ইকোনমিক সাইডগুলিতে… তাঁর ইকোনমিক সলিউশনে আমি অনেক সমস্যা দেখতে পারলাম। তাঁর সোশিওলজিকাল বিভিন্ন ধরণের লিমিটেশন দেখতে পারলাম (যেমন ধরেন দুনিয়ার সকল শ্রেণীর মধ্যবর্তী অন্তর্ঘাতকে উপেক্ষা করে সারা দুনিয়াকে দুইটা ক্লাসে ভাগ করে দেয়া)। এইজন্য একসময় আর কি, আমি একটু ডিজইলিউশনড হয়া গেলাম মার্ক্সের ব্যাপারে। একইভাবে একসময় নোম চমস্কির লেখা দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম। তারপর তার ক্রিটিকের বিভিন্ন ধরণের সমস্যা দেখতে পারলাম। তো আমার মনে হয় যে, আসলে প্রভাবের ব্যাপারে আসলে অই… ডায়ালেক্টিকাল আর কি…। মানে অনেকজনের প্রভাব আসবে প্রভাব যাবে, এগুলা পরিবর্তনশীল। তবে এই মুহূর্তে যদি বলেন কার দ্বারা প্রভাবিত তাহলে, সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ নিয়া একটু কাজ করতেসি। যেহেতু গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক হচ্ছেন গিয়ে আমার প্রফেসর এবং আমি পোস্টকলোনিয়াল স্টাডিজ নিয়ে কাজ করতেসি উনার সুপারভিশনে- সেই চিন্তাধারা দ্বারা আমি এই মুহুর্তে কিছুটা প্রভাবিত আপাতত, বলতে পারেন আসলে। বাট একইভাবে, আমার মার্ক্সের ব্যাপারে যেরকম ডিজইল্যুশন ঘটসিলো, সেরকম আবারও ঘটতে পারে। তবে ইকোনমিকভাবে বলতে পারেন আমি লিবার্টারিয়ানিজম দ্বারা, মানে মুক্তিবাদ দ্বারা, খুবই প্রভাবিত। যেমন ধরেন অ্যাডাম স্মিথ দ্বারা, জন স্টুয়ার্ট মিলের দ্বারা প্রভাবিত। আবার পরবর্তীতে লিবার্টারিয়ানদের মধ্যে যারা ইনফ্লুয়েন্সিয়াল… জন রলস, রবার্ট নজিক… তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত বলতে পারেন।

রাফিনঃ হ্যাঁ। মানুষের চিন্তা তো পরিবর্তনশীল। ভালো বলেছেন। লিবার্টারিয়ানিজম তো একটা দর্শন। বা চাইলে মতবাদও বলতে পারি আমরা। লিবারালিজম বা মার্ক্সিজম যেমন দর্শন বা মতবাদ। তো, লিবার্টারিয়ানিজমের মূলকথা আমাদেরকে একটু সংক্ষেপে বলুন।

অনুপমঃ লিবার্টারিয়ানিজম বা মুক্তিবাদ বুঝতে গেলে আমাদেরকে প্রথমত অথরিটারিয়ানাজিম বুঝতে হবে। মানে অথরিটারিয়ানিজম বা টোটালিটারিয়ানিজম হচ্ছে যখন কিনা একটা সরকারের কাছে, বা একটা সংখ্যালঘু কয়েকজন ক্ষমতাধর মানুষের কাছে, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। যেমন কিনা ধরেন একটা রাজতন্ত্রে, বা… অনেক ধরণের একনায়কতন্ত্রে… যে ধরণের অবস্থা থাকে, সেটাই। তারপরে হচ্ছে, তার ডায়ামেট্রিকালি অপোজড হচ্ছে… মুক্তিবাদ। লিবার্টারিয়ানিজম। যেখানে জনগণ তার মতো করে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্যকে আর কেউ লিমিট করতে পারবে না, আর কেউ সীমাবদ্ধ করতে পারবে না। যতোক্ষণ না পর্যন্ত তার সেই ব্যবহার অন্য কারো স্বাধীনতাকে খর্ব না করে। তবে, এই জিনিশটা দাঁড়ায় এমন যে, ধরেন, যে যেমন ইচ্ছা তেমন ধর্ম পালন করবে। সেটাতে সরকার কোনো ধরণের নাক গলাবে না, রাষ্ট্র নাক গলাবে না। যে যেভাবে যা ইচ্ছা তাই করবে। সবকিছুতেই সে স্বাধীন থাকবে। যতোক্ষণ পর্যন্ত সে আর কারো স্বাধীনতা খর্ব না করতেসে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সে কি করতেসে না করতেসে সেইটা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যাপার। আর এইটার সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকটা হচ্ছে, সে নিজের মতো করে চলবে, রাষ্ট্র সেইখানে নাক গলাবে না। অর্থনীতিকে একা ছেড়ে দেবে। নিজে সে সেখানে কোনো ধরণের বুদ্ধি দেয়ার চিন্তা করবে না। মার্কেটের চেয়ে সরকার বেশি বোঝে এই ধরণের ভাব রাষ্ট্র ধরবে না। তবে নৈরাজ্যবাদীদের সাথে বা অ্যানার্কিস্টদের সাথে মুক্তিবাদীদের বা লিবার্টারিয়ানদের একটা অন্যতম তফাৎ হচ্ছে, আমরা রাষ্ট্রের কিছু কিছু কার্যক্রমে বিশ্বাস করি। কিছু কিছু অবদান রাখা উচিত বলে মনে করি। কমপক্ষে কয়েকটা ক্ষেত্রে। যেমন কিনা অধিকাংশ লিবার্টারিয়ান মনে করে যে রাষ্ট্রের একটা মিলিটারি থাকা উচিত, ফরেন সার্ভিস থাকা উচিত… ডিফেন্স ইন্টারেস্ট সার্ভ করার জন্য। একটা পুলিশ থাকা উচিত। একটা আইন-আদালতের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আর এর বাইরে রাষ্ট্রের আরো একটা দুইটা কাজ করা উচিত বলে অনেক মুক্তিবাদী মনে করেন, অনেকে করেন না। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এডুকেশন, বেসিক হেলথ কেয়ার, ট্রান্সপোর্টেশন, ইনফ্রাস্ট্রাকচারে সরকারের অবদান রাখা উচিত। আর তার বাইরে, এইসব ছোটো ছোটো কিছু কাজের এলাকার বাইরে, আমরা মনে করি সরকার হচ্ছে মুক্তির জন্য একটা হুমকি। সরকার জনগণের স্বাধীনতার জন্য একটা হুমকি। কারণ ক্ষমতা সবসময় ক্ষমতাবানদের হাতেই থাকবে। সরকার সবসময় ক্ষমতাবানদের কথাতেই চলবে। কাজেই সরকারকে যতোটা লিমিট করা যায়, সীমাবদ্ধ করা যায়, ততোই…

রাফিনঃ আপনি বলছেন সরকার সবসময়ই ক্ষমতাবানদের পক্ষেই থাকবে, এ-বক্তব্যে দ্বিমত পোষণের সুযোগ আসলেই নেই। তবে আমি যে-প্রশ্নটা এই পর্যায়ে করতে চাচ্ছি, সেটা হচ্ছে যে, বাজার কি ক্ষমতাহীনদের পক্ষে কাজ করতে পারে? অর্থাৎ বাজারের ব্যাপারে লিবার্টারিয়ানদের মতামত কী?

অনুপমঃ বাজারের ব্যাপারে, মানে ফ্রি মার্কেটের ব্যাপারে লিবার্টারিয়ানদের মতামত হচ্ছে যে, ফ্রি মার্কেট আসলে… ক্ষমতাহীনদের পক্ষে কাজ করতে পারে… যদি কিনা সেই ফ্রি মার্কেটটা আসলেই, সত্যিকারের ফ্রি হয়। যদি সরকার ফ্রি মার্কেটে নাক না গলায়, ক্ষমতাবানদেরকে ক্ষমতাহীনদের চেয়ে বেশি সুযোগ দিচ্ছে না, বা ধরেন ক্ষমতাবানরা সরকারের সাথে যোগসাজশ করে কোনো ধরণের ব্যারিয়ার ক্রিয়েট করতেসে না, মানে মার্কেটে। তো, যদি সেইগুলা না হয়, আর সরকার তার সীমিত কাজটুকুন ঠিকমতন করে-অর্থাৎ বেসিক একটা শিক্ষার ব্যবস্থা করে, রাস্তাঘাট-যোগাযোগব্যবস্থা শক্ত রাখে তাহলে মার্কেটে অবশ্যই এমন সুযোগগুলো থাকবে যেখানে কিনা সাধারণ মানুষ ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করতে পারবে, লোন নিয়ে ছোট ব্যবসাকে বড় করতে পারবে, গ্রামের কৃষক একসময় টাকা জমায়ে একটা ট্রাক কিনে শহরে এনে তার ফসল বেচতে পারবে-এইভাবেই সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নতি ঘটতে পারবে।

তবে এইটুকু বলে রাখি যে, আমরা যে-ধরণের মুক্ত বাজারের কথা বলি সে-ধরণের মুক্ত বাজার পৃথিবীতে খুবই দুর্লভ। কেননা, যেমন বললাম যে, রাষ্ট্রকে সীমাবদ্ধ করা খুবই কঠিন ব্যাপার। রাষ্ট্র যত বড়ো-তার মার্কেটের মাঝে গলানোর জন্যে এভেইলেবল নাকও তত বড়। রাষ্ট্র হুটহাট বড়ো হয়ে যায় কারণ বড়ো রাষ্ট্র অনেকেরই স্বার্থে কাজে আসে। যেমন ধরেন, মানে, সমাজতান্ত্রিক কথাবার্তা বলেই উপরে উঠুক না কেনো আর ফ্যাসিস্ট কথাবার্তা বলে উপরে উঠুক না কেনো, জনগণের নামে কাজ করতেসি বলেই উপরে উঠুক না কেনো আর এলিটের নামে কাজ করতেসি বলেই উপরে উঠুক না কেনো, রাষ্ট্র সবারই ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করার একটা এজেন্সি হয়ে দাঁড়ায় আরকি। রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ আদায় করে নেয়াটা একটা নর্ম পৃথিবীতে। তো, সে জন্য অনেক সময়, মানে, অই জায়গাটায়, ক্ষমতাহীনদের জন্য কাজ করে না বাজার। কিন্তু সেই বাজারটা মুক্ত বাজার না। সেই বাজারটা একটা কন্ট্রোলড বাজার, সীমাবদ্ধ বাজার।

রাফিনঃ অর্থাৎ, আপনারা লিবার্টারিয়ানরা সীমাবদ্ধ বাজারের পক্ষে নন, আপনার এমন একটি মুক্ত বাজার চান যেটা সরকার বা ক্ষমতাবানদেরকে বিশেষ সুবিধা দেবে না?

অনুপমঃ হ্যাঁ।

রাফিনঃ কিন্তু বর্তমানে তো দুনিয়ার সব বাজারই কমবেশি সরকার বা ক্ষমতাবানদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অর্থাৎ, আপনি যেটা বললেন, এগুলো সীমাবদ্ধ বাজার। এখান থেকে সত্যিকারর মুক্ত বাজার কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, অর্থাৎ সরকার বা ক্ষমতাবানদের হাত থেকে বাজারের নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের হাতে আনার প্রক্রিয়াটা কী হবে, এ-ব্যাপারে লিবার্টারিয়ানরা কী বলেন?

অনুপমঃ পরিষ্কার করে রাখি, আমরা চাই না যে বাজারের নিয়ন্ত্রণ সাধারণ মানুষের হাতে যাক (হাসি)। মানে, আমরা চাই যে বাজারের নিয়ন্ত্রণ কারো হাতেই না যাক। বাজারের নিয়ন্ত্রণ বাজারের হাতেই থাকুক। তো… সেইটা করার প্রক্রিয়া হচ্ছে… সরকারকে সীমাবদ্ধ করা! কথায় কথায় মার্কেট ফেইলিয়ার, মার্কেট ফেইলিয়ার বলে চিল্লাফাল্লা না তোলা- ধোঁয়া না তোলা। মানে সরকারের কাছ থেকে, সরকারের যতোটুকু করা দরকার, তার চেয়ে বেশি আশা না করা। দুনিয়ার সবকিছু সরকারকে দিতে না বলা। মানে প্যাটার্নালিস্টিক সরকার যেটাকে আমরা মাঝে মাঝে বলি, যে, পিতৃসম সরকার, যেনো আমরা না চাই। সরকার আমাদেরকে কোলে তুলে খাইয়ে দেবে, আমাদেরকে মানুষ করবে, এমন আশা আমরা যেনো না করি। সরকার আমাদের জন্য কাজ করবে। আমরা সরকারের বাপমা, সরকার আমাদের বাপমা না- এই ধরণের একটা জায়গা থেকে আমাদের ভাবতে শিখতে হবে আর কি। আমাদেরকে… আমাদেরকে আরো অনেক বেশি স্কেপটিকাল হতে হবে রাজনীতিবিদদের প্রতি যারা বলে যে আমরা জনগণের জন্য কাজ করতেসি। মানে আমরা হচ্ছে গিয়ে জনগণকে একটা সুবিধা দিব এইসব বলেটলে তাঁরা যেসব পলিসি ডিজাইন করেন, সেগুলো অধিকাংশ সময় সাধারণ জনগণের জন্য হয় না। অর্থাৎ দেখলে মনে হয় সাধারণ জনগণের জন্য, কিন্তু আল্টিমেটলি দ্যাখা যায় যে সেগুলোতে ক্ষমতাবানদেরই বেশি সুবিধা হয়।

অধিকাংশ প্রো-পুওর ব্যাপারগুলাই, সরকারি ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে করা যায়। যেমন ধরেন ভলেন্টারিজম দিয়ে, এনজিও দিয়ে। আপনি ডোনেট করতে চান, দান করতে চান, গরিবের জীবন উন্নত করতে চান, তো আপনি একটা সংগঠন বানান! আপনি আপনার বন্ধুদের নিয়ে, একটা এনজিও ওপেন করেন। তাহলে জিনিশটা আপনার হাতে থাকবে। ডোনেশনের জন্য মানুষের কাছে যান। যে-মূহূর্তে মানুষ দেখবে আপনি তাদের কাজের কাজ করতেসেন না- টাকা মেরে দিচ্ছেন বা নষ্ট করতেসেন-সে-মুহূর্তে তারা ডোনেট করা বন্ধ করে দেবে। আপনার বদলে আরো বেটার কোন সংগঠনকে ডোনেট করবে। এইভাবে ভলান্টারিজমেরও একটা মার্কেট সৃষ্টি হবে যেখানে কিনা একমাত্র ভালো আর কাজের সংগঠনই টিকে থাকতে পারবে।

কিন্তু আপনি যদি বলেন সরকার গরিবদের খেয়াল রাখবে, তাহলে দেখা যাবে সেই এক সরকারকেই গরিবদের খেয়াল রাখতে হবে। সরকার দেখা যাবে চ্যারিটির উপর একটা মনোপলি সৃষ্টি করে বসে আছে-যেটা কিনা প্রাইভেট অর্গানাইজেশনকে মাঠে নামতে নিরুতসাহিত করবে। আর এইদিকে সরকার গরিবদের খেয়াল রাখবে বলে ট্যাক্স করবে ঠিকই- গরিবদের খেয়াল রাখবে বলে গরিবদের থেকেই ট্যাক্স নিবে, কিন্তু পরে আর সেই টাকা গরিবদের কাছে দিবে না। নিজেরাই খেয়ে দিবে।

তো আমরা এইটাই বলি। সব সমস্যার সমাধান সরকারের কাছে না খোঁজা। সরকারের জন্যে কিছু সমস্যার লিমিটেড রাখা, বাকি সমস্যার সমাধান নিজেরা নিজেরা করা। পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা, বিপ্লবের প্রক্রিয়াটা আসতে হবে সামাজিকভাবে আর মানসিকভাবে। আমাদের মানুষদেরকে বোঝাতে হবে, সরকারকে সমাধানের উৎস হিসেবে না দেখে সরকারকে সমস্যা হিসেবে দ্যাখা। যে আমাদের জীবনের অধিকাংশ সমস্যাই সরকারের তৈরি করা। মানে সরকার যে আসলে ক্ষমতাবানের এজেন্ট, ক্ষমতাহীনের এজেন্ট বানানো সরকারকে যে অসম্ভব, সে জিনিশটা জনগণকে বুঝতে হবে। তখনই তারা অন্যভাবে চিন্তা করতে শুরু করবে। তখন তারা বুঝবে… সরকার… এইটা একটা দানব। আমাদের এই দানবকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এমন একটা জায়গায় যেইখানে এইটাকে আমাদের অ্যাবসলিউটলি দরকার। মানে এইটা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নাই। তার বাইরে যখনই এই দানব বেরোবে তখনই সে আমার জন্য হুমকিস্বরূপ। এইভাবে যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে যখনই দ্যাখা যাবে সরকার অর্থনীতিতে নাক গলাতে চাইছে, তখনই আমাদের সবার একসাথে না না করে উঠতে হবে। আমরা চাই না। আমরা চাই না সরকার এখানে নাক গলাক।

রাফিনঃ আপনি একটা কথা বললেন, বাজারের নিয়ন্ত্রণ সরকার-ক্ষমতাবান বা সাধারণ মানুষ কারো হাতেই না যাক, এটাই চান লিবার্টারিয়ানরা। কিন্তু বাজারের কি নিজস্ব কোন হাত আছে? বাজার কি নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?

অনুপমঃ হ্যাঁ, বাজারের নিজস্ব একটা হাত আছে, যেটাকে আমরা বলি অদৃশ্য হাত। মার্কেট ফোর্সেস বলে কিছু জিনিশ আছে, মার্কেট সিগনাল বলে কিছু ব্যাপার আছে। খুব ওভারসিপ্লিফাই করে বললে সেই পূরানো সাপ্লাই-ডিমান্ড। মানে এইগুলা অটোমেটিক নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। ধরেন, খুব সহজ একটা উদাহরণ দেই, আমি… আমি চাইবো রিকশাওয়ালাকে কম ভাড়া দিতে, রিকশাওয়ালা চাইবে বেশি ভাড়া নিতে, তাই না? তো আমাদের দুজনের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে এখানে একটা মার্কেট প্রাইস দাঁড়া হয়ে যাবে (যেইটাকে আমরা কথ্য ভাষায় ন্যায্য ভাড়াও বলি)। তো, আমি দশটা রিকশা দেখবো, যে সবচে কম ভাড়া চাইবে তার কাছে যাবো। তো, যতোক্ষণ পর্যন্ত আমার কাছে ফ্রি মার্কেটের চয়েসটা আছে, অন্য রিকশাওয়ালার কাছে যাওয়ার সুযোগ আছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত মার্কেটে একটা সাম্যাবস্থার সৃষ্টি হয়ে যাবে। তো, এইখানে সরকারের তো বলার দরকার নাই, না এইখানে রিকশাভাড়া সবসময় পঞ্চাশ টাকা হবে-বলতে গেলে দেখা যাবে রিকশার সারপ্লাস অথবা শর্টেজ হয়ে বসে আছে। এইরকম একটা ব্যাপার আর কি।

রাফিনঃ আচ্ছা, এবার আমরা একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। ২০১১তে দুটি আন্দোলন পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। একটি আরব বসন্ত, আর অন্যটি, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্ট। আপনি এই আন্দোলনগুলো কিভাবে দ্যাখেন এ সম্পর্কে আমাদেরকে সংক্ষেপে কিছু বলুন। এই আন্দোলন দুটিকে সফল আন্দোলন মনে করেন নাকি ব্যর্থ আন্দোলন? সফল মনে করলে, কেনো? ব্যর্থ মনে করলেও, কেনো?

অনুপমঃ দুইটা আন্দোলনের কথা বললেন, একটা হচ্ছে আরব স্প্রিং, আরেকটা অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্ট। আরেকটা আন্দোলনের কথা বলতে ভুলে গেছেন, সেইটা হচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের, সেইটা টি পার্টি মুভমেন্ট (হাসি)। তো, এই তিনটা আন্দোলনেরই কমন দিক হচ্ছে, এই তিনটা আন্দোলনই হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। একটা রাষ্ট্র বেশি ক্ষমতাবান হয়ে গেছিলো, এই আন্দোলনগুলো সেই রাষ্ট্রকে সীমিত করার আন্দোলন। আমার মনে হয় আন্দোলনগুলোর একটা প্রভাব অবশ্যই আছে। টি পার্টির মুভমেন্টে একটা সরকারবিরোধী, বা একটা ট্যাক্সেশনবিরোধী, বা একটা বড়ো সরকারবিরোধী একটা স্ট্রিম তৈরি হয়েছিলো; সেটার একটা ফলাফল তো অবশ্যই আমরা দেখতে পাচ্ছি আমেরিকান নির্বাচনে; ডেমোক্রেটিক পার্টির লোকজন ভয়াবহ মাইর খাইয়া গেছে এই জায়গাটায়। ট্রাম্পের যে বিজয়টা, সেইটাকে, টি পার্টি মুভমেন্টের কৃতিত্ব বলা যাইতে পারে। এই যে, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্টের বক্তব্য ছিল, এই যে টপ যারা বড়লোক, সবচে বড়োলোক যারা, যাদের কাছে অধিকাংশ ওয়েলথ বলে তারা বলতেসে, তাদের কিন্তু একটা ক্যান্ডিডেট ছিলঃ বার্নি স্যান্ডার্স। সে জেনারেল ইলেকশনে আসলে কী হইতো আমরা জানি না, সেইটা আমরা দেখতে পাই নাই। কিন্তু কমপক্ষে আপনি, আপাতদৃষ্টিতে, ব্রডার সেন্সে যদি দ্যাখেন; তাহলে কিন্তু হিলারিও এক পর্যায়ে এই বক্তব্য নিয়াই আগাইসে। যে, না, টপ ওয়ান পার্সেন্টের কাছে সব ওয়েলথ থাকলে হবে না, গরিবের কাছে সম্পদ থাকতে হবে। সেইটা কিন্তু, মানে, আমেরিকার সাধারণ জনগণ কিন্তু সেইটা মনে করে নাই, যে সেইটা তাদের সমস্যার প্রধান কারণ। তারা মনে করসে তাদের সমস্যার প্রধান কারণ সরকারের ওভার-ট্যাক্সেশন, সরকারের বেশি রুলস-রেগুলেশন হ্যান ত্যান, তো সেইদিক থেকে চিন্তা করলে কিন্তু অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট মুভমেন্ট টি পার্টি মুভমেন্টের কাছে কোনঠাসা হয়ে গেছে। আর, এইদিকে, আরব বসন্ত জিনিশটা খুবই কমপ্লেক্স। ধরেন আরব বসন্ত ইজ নট ইভেন ওয়ান থিং। মানে, অনেকগুলা ছোটো ছোটো ভাগ আছে আরব বসন্তের। আরব বসন্ত বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাচ্ছেন এইটাও একটা প্রশ্ন। ফর এগজাম্পল, মিশরের আরব বসন্ত বলেন, সেইটা আসলে খুব একটা লাভ হয় নাই। একজন মিলিটারি স্ট্রংম্যানকে সরিয়ে, মানে একজন স্ট্রংম্যান ডিক্টেটরকে থেকে আরেকজন স্ট্রংম্যান ডিক্টেটরের কাছে তারা গেছে। আর এরপরে আমাদের কেইস বা কেইস দেখতে হবে। তবে… এরপর ধরেন… আরব বসন্তের আগে মিডল ইস্টে এক ধরণের সাম্যাবস্থা বিরাজমান ছিল এই স্ট্রংম্যান ডিক্টেটরদেরদের জন্য। এইগুলা আপনি আরো ভালো বুঝবেন… তাই আমি আর এটা নিয়ে বলতে চাচ্ছি না। তো, তাদের পতন হওয়ার পর, আরেক ধরণের ক্রাইসিস সৃষ্টি হইসে এখানে, একটা পাওয়ার ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হইসে, তাই না? মানে ধরেন সিরিয়ান গৃহযুদ্ধ থেকে আইসিসের উত্থান সবকিছুতেই ধরেন, আপনি আরব বসন্তকে ট্রেস করতে পারেন। তো, নিজস্ব আরব বসন্তের যে আদর্শ ছিল, যে ইচ্ছা ছিল… সেটা মনে হয় না পূরণ হইসে। উল্টা আরো অনেক বেশি ঝামেলা তৈরি হইসে অই মুভমেন্টের থেকে।

রাফিনঃ আইএসের প্রসঙ্গটা যখন কথাপ্রসঙ্গে চলে আসলো তখন এটা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। আইএস বা সমমনা সংগঠনগুলোর যে উত্থান এর পেছনে কী কী ফ্যাক্টর আছে বলে আপনি মনে করেন? যদি সংক্ষেপে বলতেন!

অনুপমঃ সবকিছুর পেছনে অবশ্যই আমেরিকার নাক গলানো, এইটা তো, প্রশ্নাতীত ব্যাপার আর কি। আমেরিকা যে মিডল ইস্টে খালি নাক গলায়, এইটা তো অনেক ধরণের পাওয়ার ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি করে। অনেক ধরণের ডিস্ট্যাবিলাইজেশন সৃষ্টি করেন। যেমন ধরেন ইরাকে ইন্টারভেনশনের কোনো দরকার ছিল না, ইরাকে আল-ক্বায়েদা বলে কিছু ছিল না, ইরাকে অকারণেই তারা একটা ইন্টারভেনশন করসে। সাদ্দাম হোসেন এক ধরণের সাম্যাবস্থা বজায় রাখসিলো, মানে, শিয়া সুন্নী আর কুর্দিদের মধ্যে। তো আমেরিকা সেখানে গিয়ে নাক গলায়ে সাম্যাবস্থাটা নিষ্ক্রিয় করে দেয়ার কারণেই ধরেন এখন হচ্ছে গিয়ে একটা, পাওয়ার ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হইসে। তো আমার কাছে মনে হয়, এইখানে আইডোলজির চেয়ে জিওপলিটিকাল বিষয়গুলাই প্রধান। এই পাওয়ার ভ্যাকুয়ামগুলা সৃষ্টি হইলেই এই ধরণের মৌলবাদী গ্রুপগুলা, তারা একটা সুবিধা নিতে পারে।

ও আচ্ছা, এই সু্যোগে বলে রাখি-আমরা মুক্তিবাদীরা কিন্তু ভয়াবহ যুদ্ধবিরোধী। আমেরিকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলার মাঝে একমাত্র লিবারেটেরিয়ান পার্টিই জোরেশোরে সারাদিন বলে যে আমেরিকার বিদেশে নাক গলানোর দরকার নাই-ফরেন মিলিটারি বেইজ গুটায়ে আনা উচিত-আমেরিকার ওয়ার্ল্ড পুলিশগিরি করার চেষ্টা অযৌক্তিক ইত্যাদি। ডেমোক্রেট হোক-আর রিপাবলিকান হোক-সাহস করে কিন্তু এইসব কথা আমেরিকার মেইনস্ট্রিম পলিটিশিয়ানদের বলার উপায় নাই। মানে ধরেন-বারাক ওবামাও কিন্তু জানাজায় বোমা হামলা করসে! আমরাই খালি বলতে থাকি যে বোমা মারা বন্ধ করো।

রাফিনঃ আমরা সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি, অনুপম। তাই শেষ প্রশ্নটা করতে চাই বাংলাদেশ নিয়েই। ২০১৩র শাহবাগ আন্দোলন, হেফাজতের উত্থান এবং ২০১৪র বিতর্কিত নির্বাচন-পরবর্তী যে-রাজনৈতিক সংকট, এসব নিয়ে সংক্ষেপে যদি কিছু বলতেন।

অনুপমঃ (হাসতে হাসতে) সংক্ষেপে বলবো, এসব নিয়ে সংক্ষেপে কিভাবে বলবো? এই বিষয়ে আমার ষাইট পৃষ্ঠার একটা পেপার আছে, আপনি যদি এখন আমারে বলেন এইটা সংক্ষেপে বলতে! তাহলে তো, কঠিন!

রাফিনঃ একটু চেষ্টা করেন!

অনুপমঃ আচ্ছা। তো, আমি যেটা বলবো সেটা হয়তো খটকা লাগতে পারে অনেকের কাছে। সো আই শুড… তো আমি মনে করি শাহবাগ আন্দোলন একটা ব্যর্থ আন্দোলন ছিল। ব্যর্থ আন্দোলন কেনো ছিল সেই ব্যাখ্যায় না যাই। বাট ব্যর্থ যে ছিল সেটা কিভাবে জানলাম? সেটা হচ্ছে যে, শাহবাগ আন্দোলনের পরবর্তীতে, মানে এর আগে যদি আপনি আমাদের সেক্যুলারিস্ট কমিউনিটি বা সেক্যুলারিস্ট সিভিল সোসাইটি… ধর্মনিরপেক্ষ সুশীল সমাজের প্রভাব দ্যাখেন সরকারের ওপরে, তাহলে সেইটা কিন্তু অনেক কমে গেছে। একেবারে শুণ্যের কোঠায় নেমে আসছে শাহবাগ আন্দোলনের পরবর্তীতে। এমনকি দা টার্ম সুশীল, তাও তো এখন একটা গালি হয়া গেসে। তাই না? এরপরে ধরেন, এই আর কি যে, যেসব ইন্টেলেকচুয়ালের আগে অনেক প্রভাব ছিল। যেমন সুলতানা কামাল। সুলতানা কামালের কি পরিমাণ প্রভাব ছিল, তিনি তো সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন, তাই না? তো সুলতানা কামালকে এখন কি সব বলা হয়, সেটা তো সবাই জানে! তো এই বিষয়গুলা কেনো তৈরি হইসে। এই বিষয়গুলা শাহবাগের প্রভাব হিসেবে তৈরি হইসে। পুরা কমিউনিটিটার একটা নেগেটিভ ইমেজ তৈরি হইসে। শাহবাগ আন্দোলনের কারণে। আর রাজনৈতিক ইসলামিজম আমাদের রাজনীতিতে আবার নতুন করে প্রবেশ করসে। এটা খারাপ না ভালো আমি সেটা বলতে চাচ্ছি না। আমি বলতে চাচ্ছি এটা ঘটসে। হেফাজত একটা পলিটিকাল ফোর্স। এবং আওয়ামি লিগ… এটা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে… এইসব বলে, হেফাজতের কথা শুনেই তারা এখন চলে আর কি। ইন টার্মস অফ লবিং পাওয়ার, মানে সরকারে ইনফ্লুয়েন্স কাদের বেশি, এইটা যদি আপনি দ্যাখেন, দুইটা গ্রুপ আছেঃ সেক্যুলারিস্ট সিভিল সোসাইটি আর ইসলামিস্ট সিভিল সোসাইটি। এই দুইটা গ্রুপের মধ্যে কাদের লবিং পাওয়ার বেশি? অবভিয়াসলি, ইসলামিস্ট সিভিল সোসাইটির মানুষজনের ক্ষমতা এখন অনেক বেশি। সরকারের সাথে তার লবিং পাওয়ার। কিংবা আপনি সুপ্রীম কোর্টের মূর্তি সরানো থেকে শুরু করে আমাদের বইয়ের রদবদল চিন্তা করেন, বা ক্বওমি মাদ্রাসার লেজিটিমাইজেশন প্রত্যেকটাকেই… এগুলোর কোনোটাকেই আমি ভালো বা খারাপ… এইসব নরম্যাটিভ হিসাবে আমি যাচ্ছিই না। আমি বলতে চাচ্ছি যে, ইসলামিস্ট সিভিল সোসাইটির একটা ক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে। যেইটা কিনা ধরেন ২০০১-০৬এর সময় যে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল, যেমন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির যে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল… এইটা কিন্তু পুরা ইসলামিজমকে একটা মার্জিনাল অবস্থায় নিয়ে গেসিল। এইটা কিন্তু এখন আর নাই। এখন বরং হেফাজতের পরবর্তীতে ধর্মনিরপেক্ষ যেই সিভিল সোসাইটিটা, তারাই বরং মার্জিনাল অবস্থায় চলে গেছে। তারা সরকারি নিরাপত্তা পায় না, তারা মরে টরে গেলে সরকার চুপ করায়ে দেয় মানুষজনকে, এই জিনিশটা কিন্তু একটা ক্রাইসিস আর কি। বিশেষ করে বামপন্থী… মানে এদেরকে যদি আমরা বামপন্থী বলি, মানে ব্রডার সেন্সে, ইসলামিস্টদের ডানপন্থী ধরে হিসাব করা বামপন্থী… মানে যদি ধরি যে ধর্মনিরপেক্ষরা বামপন্থী বাংলাদেশের পার্সপেক্টিভে, মানে সেই বামপন্থীদের ক্ষমতা এখন শূণ্যের কোঠায় চলে গেসে। মানে সরকারের কাছে। আওয়ামি লিগ অনেক বেশি ডানপন্থী হয়া গেসে। তাই না? এইটা কিন্তু ধরেন আওয়ামি লিগকে একা দোষ দিয়ে লাভ নেই। সাংস্কৃতিক যে-ব্যাটেলটা, আদর্শিক, আইডোলজিকাল যে-ব্যাটেলটা; সেটার কথা যদি আমরা বলি; তাহলে কিন্তু বামপন্থীরা ডানপন্থীদের কাছে হেরে গেছে। শাহবাগ আন্দোলনের চার বছর পরে। তাই আওয়ামি লিগ এখন ডানপন্থী হয়ে গেছে আর বামপন্থীরা এখন ব্যাকফুটে আছে। তবে আপনি যদি চিন্তা করে দ্যাখেন, তাহলে এইটা, এইটা আওয়ামি লিগের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্ট্রাটেজি; ক্ষমতা রিনিউ করার স্ট্র্যাটেজি না। এর আগে আওয়ামি লিগের ক্ষমতা রিনিউ করার স্ট্র্যাটেজি ছিল সবসময় ধর্মনিরপেক্ষ সিভিল সোসাইটি, বামপন্থী সংগঠন, এরপর ধরেন মোটামুটি উদারবাদীরা, বা কমপক্ষে যারা… কমপক্ষে যারা নন-কনজারভেটিভ তাদের কাছ থেকে আসা সমর্থন। তো আবার নির্বাচনের দিকটা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নির্বাচন আসতেসে। তো আওয়ামি লিগ কোন স্ট্র্যাটেজিতে ক্ষমতা রিনিউ করার চেষ্টা করবে এটা একটা দেখার বিষয়। ক্ষমতা রিনিউ করার সময় তারা ধর্মনিরপেক্ষ সিভিল সোসাইটির কাছে আবার ধর্না দিতে পারে। যদি বিএনপি সফল হয় হেফাজত গোষ্ঠীটাকে, বা ইসলামপন্থীদেরকে আবার নিজেদের করে নিতে। ২০০১-০৬ তারা যেমনটা করসিলো। তখন একটা কঠিন দ্বন্দ্ব হবে আর কি, যে কারা আসলে নির্বাচনে জিতবে। কিন্তু ধরেন বর্তমানে যেমন অবস্থা দাঁড়াইসে, যে আওয়ামি লিগ দ্যাখা গেছে এখন একটা, মানে ধরেন, তারা মোটামুটি ইসলামিস্ট সিভিল সোসাইটির এজেন্সি হয়ে দাঁড়াইসে। তারা যদি সেইভাবে ইলেকশনটা রান করতে চায়, তাহলেও কিন্তু অটোমেটিকালি বামপন্থীদের ভোটটাই পায়। কারণ বামপন্থীরা কারে ভোট দিবে? ধর্মনিরপেক্ষরা কারে ভোট দিবে? তারা তো আর বিএনপিরে ভোট দিতে পারতেসে না… বা জামাতরে… তারা তো দুইদিন আগে তাদের ফাঁসি চাইছে। তাই না? তো অইদিক দিয়ে তাদের ভোট ফ্রি। আর ইসলামিস্টদের ভোট আওয়ামি লিগ যতোগুলা পায় ততোগুলাই বোনাস। স্ট্র্যাটেজি যাই হোক, আমার মনে হয় আওয়ামি লিগ ডানপন্থীই থাকবে। ইসলামপন্থীদের ভোট নেয়ার চেষ্টা করবে যতো, আর ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনের ভোট তো তারা এমনেই পাবে। তো, তারপরেও ইলেকশনের আগে কি হয়, বিএনপি কতোখানি শক্তিশালী হয়ে ওঠে… সেইটা সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারতেসি না। সেই বিষয়গুলা অনেককিছু পরিবর্তন করে দিতে পারে। তো সেগুলা দ্যাখার বিষয়। মজা হবে আর কি, আগামী দিনগুলোতে।

রাফিনঃ আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ, অনুপম।

অনুপমঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

নোটঃ ২০ অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা থেকে রাত ১২টায় ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছে। অনুপম ভয়েস ক্লিপের মাধ্যমে প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়েছেন। সেগুলো ট্রান্সক্রাইব করা হয়েছে, অনুপমকে দ্যাখানো হয়েছে, এরপরই কেবল সাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

Please follow and like us: